গত কয়েক সপ্তাহে দেশের দুটি প্রান্তে দুটি পৃথক ঘটনা আমাদের সামাজিক বিবেককে নাড়া দিয়েছে। ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে এক নারীকে তাঁর সন্তানকে জিম্মি করে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে মামলার প্রধান আসামির বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। এর কিছুদিন আগে পাবনা সদরে দশ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বহুতল ভবন জুমার নামাজের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গুঁড়িয়ে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় উত্তেজিত জনতা।
দুটি ঘটনাতেই অপরাধের প্রকৃতি এতটাই নৃশংস যে জনরোষ সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়—কিন্তু সেই ক্ষোভ যেভাবে সহিংসতায় রূপান্তরিত হচ্ছে, তা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের জন্যই এক গুরুতর সতর্কবার্তা।
এই দুই ঘটনার মধ্যে একটি অভিন্ন সূত্র স্পষ্ট। উভয় ক্ষেত্রেই এলাকাবাসী পুলিশি ব্যবস্থার ধীরগতি বা বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার প্রতি অনাস্থা থেকেই নিজেরা ‘বিচারক’ হয়ে উঠেছেন। পাবনার ঘটনায় এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে ক্রমাগত ঘটতে থাকা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যমান বিচার না হওয়াই তাঁদের ক্ষোভের মূল কারণ। ময়মনসিংহেও ঘটনার পরদিন মামলা হওয়ার পর স্থানীয়রা বৈঠক করে নিজেরাই প্রতিক্রিয়া জানানোর সিদ্ধান্ত নেন। এ থেকে বোঝা যায়, প্রচলিত বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কতটা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।
তবে এই আস্থাহীনতা যতই যৌক্তিক কারণে জন্ম নিক না কেন, গণপিটুনি বা সম্পত্তি ধ্বংসের মধ্য দিয়ে তার প্রকাশ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। প্রথমত, এতে প্রকৃত অপরাধীর পাশাপাশি নিরপরাধ পরিবারের সদস্যদের—বিশেষত নারী ও শিশুদের—জীবন ও সম্পত্তি বিপন্ন হয়। দ্বিতীয়ত, বাড়িঘর ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা তদন্তকাজে ব্যবহারযোগ্য আলামত নষ্ট করে দিতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত প্রকৃত বিচারপ্রক্রিয়াকেই দুর্বল করে। তৃতীয়ত, এ ধরনের উন্মত্ততা একবার স্বাভাবিক হয়ে উঠলে তা যেকোনো অভিযোগের ভিত্তিতে যে কারও বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে, যা সামাজিক বিশৃঙ্খলার নতুন দরজা খুলে দেয়।
পাবনার ঘটনায় পুলিশ সুপারের সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগের বিস্তারিত জনসমক্ষে আসার পরও ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও গ্রামবাসীর সংখ্যাধিক্যের কারণে বাধা দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানানো হয়েছে। এটি স্পষ্ট করে দেয়, শুধু ঘটনাস্থলে পুলিশ রাখাই যথেষ্ট নয়—জনরোষ সামলাতে হলে তার আগেই আস্থা তৈরির কাজ করতে হবে, যা কেবল দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচারের মধ্য দিয়েই সম্ভব।
আমরা মনে করি, এই প্রবণতা রোধে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া অতীব জরুরি। ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর মামলাগুলোর জন্য নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন করার ব্যবস্থা কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে, যেমনটি আইনে ইতোমধ্যে নির্ধারিত আছে। মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় জনগণকে নিয়মিত ও স্বচ্ছভাবে অবহিত করার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে গুজব বা অনিশ্চয়তা থেকে জন্ম নেওয়া ক্ষোভ প্রশমিত করা যায়।
অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরপরই সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়াতে হবে, বিশেষত যেসব ক্ষেত্রে জনরোষ সৃষ্টির আশঙ্কা প্রবল। বাড়িঘর ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দ্রুত বিচার নিশ্চিতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা মোবাইল কোর্টের আওতা সম্প্রসারণ নিয়ে নীতিনির্ধারকদের অবিলম্বে ভাবতে হবে।
জনরোষ প্রশমনের একমাত্র টেকসই পথ প্রতিশোধ নয়, বরং দৃশ্যমান ও দ্রুত ন্যায়বিচার। রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের এই আশ্বাস দিতে ব্যর্থ হয় যে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হবে, তাহলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই সময় এসেছে বিচারব্যবস্থার গতি ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর দিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার। নয়তো এ রকম ঘটনা বারবার ঘটতেই থাকবে। যার ফলাফল এক অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাবে।
কেকে/ এমএস