রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬,
১১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: সেনাবাহিনীর পদোন্নতিতে মেধা, যোগ্যতা ও সততাই হবে প্রধান বিবেচনা: প্রধানমন্ত্রী      ইরানে নতুন করে হামলা না করার নির্দেশ ট্রাম্পের      ‘সেনাসদর নির্বাচনি পর্ষদ-২০২৬’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী      এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হতে পারে ৩০ জুলাই      আজ বঙ্গভবন ছাড়তে পারেন মো. সাহাবুদ্দিন      ফের আগ্রাসী বিএসএফ      খুনখারাবিতে ইমেজ সংকটে বিএনপি      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
২০২৬ বিশ্বকাপ : আসল বিজয়ী ফিলিস্তিন
হামিদ দাবাশি
প্রকাশ: রোববার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ১১:৪১ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তেজনা যখন বিশ্বজুড়ে তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়েই দখলীকৃত ফিলিস্তিন ও লেবাননজুড়ে ইসরায়েল তাদের অব্যাহত হত্যাযজ্ঞ ও ভূমি দখল চালিয়ে যাচ্ছিল। এমনকি তারা আমেরিকার উন্মাদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও ইরানের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছিল। তবে এই গণহত্যাকারী জায়নবাদীরা কিন্তু বিশ্বকাপের কোলাহল থেকে একদম বিচ্ছিন্ন ছিল না। এর মাঝেই তারা সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার নাম ও সুনামকে কলঙ্কিত করতে সক্ষম হয়। 

আজ থেকে বিশ বছর আগে, ২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপ চলাকালীন আমি লেবাননে ছিলাম। বৈরুত ছাড়ার মাত্র কয়েক দিন পরই ইসরায়েল আবারও লেবাননে আগ্রাসন চালায়। আমরা ফিলিস্তিনি ও লেবাননি বন্ধুদের সঙ্গে শরণার্থী শিবিরে বসে বিশ্বকাপের কিছু ম্যাচ দেখেছিলাম। আমরা ২ জুলাই বৈরুত ছেড়ে আসি, ৯ জুলাই বিশ্বকাপ শেষ হয়, আর ১২ জুলাইয়ের মধ্যেই ইসরায়েল লেবাননে বোমাবর্ষণ শুরু করে। আসলে ডিফেন্সলেস বা নিরপরাধ মানুষের ওপর বোমা ফেলাটাই যেন তাদের জাতীয় খেলা!

ঠিক তেমনি এক সংকটময় পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপও শেষ হলো। সংক্ষুব্ধ এই বিশ্বে ফুটবলের মতো একটি সুন্দর কিন্তু শোষিত খেলাকে ঘিরে কিছু ভাবনার এটাই উপযুক্ত সময়।

সুন্দর খেলা, কুৎসিত পৃথিবী

বিশ্বের তাবৎ পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতা আর মোড়লগিরিতে ভরা এই পৃথিবীতে ফুটবল মানুষের কাছে এত আকর্ষণীয়, কারণ এটি অন্তত মাঠে সবাইকে সমান সুযোগ বা একটি সমতার সমীকরণে নিয়ে আসে। বিখ্যাত লেখক এদুয়ার্দো গালেয়ানো তার ‘সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’ বইয়ে ফুটবলের একটি চমৎকার ও করুণ বাস্তবতা তুলে ধরেছিলেন : ‘ফুটবলের ইতিহাস হলো সৌন্দর্য থেকে বাধ্যবাধকতায় রূপ নেওয়ার এক করুণ যাত্রা। খেলাটি যখন ব্যবসায় পরিণত হলো, তখন তার আত্মা বা আনন্দের মূল শিকড়টা উপড়ে ফেলা হলো।’

তবুও এই কুৎসিত পৃথিবীতে সুন্দর খেলাই মাঝেমধ্যে আলো ছড়ায়। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা, আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি যখন ইসরায়েলি প্রচারণায় সহায়তার অভিযোগে অভিযুক্ত, তখনো খেলাটির সৌন্দর্য একেবারে হারিয়ে যায়নি। আর্জেন্টিনার কিছু সমর্থকের উগ্র বর্ণবাদী আচরণ ইসরায়েলের প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদকেই যেন প্রতিফলিত করছিল। কিন্তু যে দক্ষিণ আমেরিকান দেশটি ডিয়েগো ম্যারাডোনা বা আলফ্রেডো ডি স্টেফানোর মতো ফুটবল জাদুকর এবং এনরিক ডুসেল বা ওয়াল্টার মিগনিয়োলোর মতো বিশ্বমানের দার্শনিকদের জন্ম দিয়েছে- সেই আর্জেন্টিনার ভাবমূর্তি তাদের জায়নবাদী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ার মিলেইয়ের মতো এক ভাড়ের কারণে তো ধূসর হয়ে যেতে পারে না!

এই বিশ্বকাপে বৈশ্বিক সমর্থকদের মাঝে একটি অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা গেছে- ইন্টারনেটে অনেকেই আর্জেন্টিনার বদলে ইংল্যান্ডের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার বিতর্কিত জয়ের পর সমগ্র ফিফা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে। এই পরিস্থিতিতে মেসি এবং মিসরের অধিনায়ক মোহাম্মদ সালাহের বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে সামনে আসে। এটি প্রমাণ করে, ফিলিস্তিনের ন্যায়সঙ্গত দাবি যারা ধারণ করে তারা মহিমান্বিত হয়, আর যারা ব্যর্থ হয় তারা কীভাবে কলঙ্কিত হয়। মিসরীয়, মরোক্কান কিংবা ফিলিস্তিনি সমর্থকরা মিসরের সেই কঠিন দিনগুলোতেও অপরিসীম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিল। একই সঙ্গে চরম মানবিকতার রূপও দেখা গেছে- যখন মেক্সিকান সমর্থকরা ইরানি জাতীয় ফুটবল দলের হোটেলের বাইরে জড়ো হয়ে গান গেয়ে উঠছিল : ‘ইরান, ভাই আমার, তুমি এখন মেক্সিকান।’

ইরান প্রথম রাউন্ডে বাদ পড়ার পর আমার ছোট মেয়ে হতাশা নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বাবা, এখন আমরা কী করব?’ আমি উত্তর দিয়েছিলাম, ‘কিছু না বাবা, এখন আমরা বাকি নিপীড়িত আর বঞ্চিতদের সমর্থন করব। আফ্রিকার আর লাতিন আমেরিকার তো এখনো অনেক দল বাকি আছে।’ প্রথম রাউন্ডে বাদ পড়লেও মিসর ও বেলজিয়ামের মতো কঠিন দলগুলোর বিরুদ্ধে ইরান বীরত্বের সঙ্গেই লড়াই করেছিল; কেবল দুর্ভাগ্য আর বৈরী পরিবেশের কারণেই তারা আটকে যায়।

বলের দখল এবং ফুটবলের ‘সাম্রাজ্যবাদী’ দর্শন

ফুটবলের রাজনীতি ও ফিফার দুর্নীতির কারণে জাতীয় দলগুলোর সেই সহজ-সরল আবেগ এখন অনেকটাই চাপা পড়েছে। এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে ইউরোপে বিপুল অভিবাসনের ফলে ইউরোপীয় দলগুলোর চেহারা আমূল বদলে গেছে। ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করলেও তার বাবা-মা ক্যামেরুন ও আলজেরিয়ার অভিবাসী। একইভাবে আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু খেলোয়াড় ইউরোপের বড় বড় ক্লাবে খেলছেন- সালাহ নিজেই ৯ বছর লিভারপুলে খেলেছেন।

ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যকার ম্যাচে আমরা সবাই স্পেনকেই সমর্থন করেছি। কারণ গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে স্পেনের নীতিগত ও শক্ত অবস্থান ছিল, আর ছিল ১৭ বছরের বিস্ময় বালক লামিনে ইয়ামালের বল পায়ে জাদুকরী পারফরম্যান্স দেখার আনন্দ। এ থেকে আমেরিকান দল এবং তাদের তথাকথিত ‘সকার’ সংস্কৃতির দিকে নজর দেওয়া যাক। ‘সকার’ যে আসলে আমেরিকানদের খেলা নয় এবং কোনোদিন হবেও না- তা তাদের একটি বহুল প্রচলিত শব্দব্যান্ড থেকেই স্পষ্ট; আর তা হলো ‘সকার মম’। একজন সকার মম হলেন সেই ধনী শহরতলীর মা, যিনি এসইউভি গাড়ি চালিয়ে এগারোজন বাচ্চা আর গাদা গাদা বল নিয়ে পার্কের সাজানো সবুজ মাঠে যান।

এর সঙ্গে আমাদের শৈশবের ফুটবল খেলার তুলনা করুন, যা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সাধারণ শিশুর গল্পের মতোই। একটা ছোট প্লাস্টিকের বল কেনার জন্য আমাদের এক পয়সা করে চাঁদা তুলতে হতো। বলটি আমাদের পায়ে থাকা অবস্থায় আমরা তা আঁকড়ে রাখতাম, তবে কেবল সতীর্থকে পাস দেওয়ার জন্যই তা হাতছাড়া করতাম।

ফুটবলে ‘বল নিজের দখলে রাখার’ মনস্তত্ত্বটা ভীষণ শক্তিশালী। কারণ এখানে গোলকিপার ছাড়া কেউ হাত দিয়ে বল স্পর্শ করতে পারে না; শুধুমাত্র পা দিয়েই বল ড্রিবল করে নিয়ে যেতে হয়। এই নিয়মটাই মানুষকে শেয়ার করার বা সতীর্থের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার একটি সামাজ্যবাদী বা সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা দেয়- যেখানে সাময়িকভাবে বল নিজের দখলে রাখা এবং ভালোবাসার খাতিরে তা অন্যের দিকে বাড়িয়ে দেওয়াই মূল কথা। ফুটবল তাই প্রকৃতিগতভাবেই একটি সাম্যবাদী খেলা, আর এটিই সম্ভবত মূল কারণ কেন আমেরিকানরা এই খেলায় খুব একটা ভালো করতে পারে না। তাদের ‘আমেরিকান ফুটবল’ খেলা হয় পুরোটাই হাত দিয়ে, যেখানে বলের আকারটাই এমন যা তা আঁকড়ে ধরে একক দখলে রাখাকে উৎসাহিত করে।

এক ঐতিহাসিক ব্যাটন বদল

মেসি বা এমবাপ্পের মতো কোটিপতি ফুটবলারদের ক্ষেত্রে এই কথাগুলো হয়তো কাব্যিক মনে হতে পারে, কিন্তু বলের প্রতি এই ভালোবাসার মানসিকতা তাদের ইউরোপীয় ক্লাবে যোগ দেওয়ার অনেক আগেই তৈরি হয়ে যায়।

আর্জেন্টিনা ও স্পেনের ফাইনাল ম্যাচটি কেবল দুটি দেশের লড়াই ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল ফিলিস্তিনের বিজয়ে সগর্বে ফিলিস্তিনি পতাকা ওড়ানো তরুণ ইয়ামাল এবং ইসরায়েলি সংশ্লিষ্টতায় মøান হওয়া প্রবীণ মেসির এক প্রতীকী মুখোমুখি অবস্থান।

আর্জেন্টিনা সরকার যখন ইসরায়েলের মতো উপনিবেশবাদী শক্তির সঙ্গে হাত মেলায়, তখন ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে তাদের ঐতিহাসিক দাবিটাও অর্থহীন ও ফাঁপা শোনায়। অন্যদিকে স্পেন দাঁড়িয়েছিল নৈতিকতার জায়গায়- আয়ারল্যান্ডের পাশাপাশি তারাও ছিল ফিলিস্তিনের পক্ষে সোচ্চার থাকা অন্যতম ইউরোপীয় দেশ, যে দেশের অভিনেতা হাবিয়ার বারদেমের মতো ব্যক্তিত্বরা ফিলিস্তিনিদের পক্ষে বিশ্বমঞ্চে আওয়াজ তুলেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ লগ্নে এসে দেখা গেল- এক প্রবীণ সিংহ তার ব্যাটনটি তুলে দিল সেই তরুণ সিংহের হাতে, যাকে তিনি একসময় কোলে নিয়ে স্নান করিয়েছিলেন। মাঠে স্পেনের এই জয় কেবল একটি দলের জয় নয়; এটি ছিল ফিলিস্তিন, লেবানন কিংবা ইরানের সেই সব শহীদ শিশুর জয়- যারা হয়তো আর কোনোদিন এই সুন্দর খেলাটির সাক্ষী হতে পারল না। 

লেখক : নিউইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে ইরানি স্টাডিজ ও তুলনামূলক সাহিত্যের ‘হাগোপ কেভোরকিয়ান’ প্রফেসর হিসেবে কর্মরত। 

মিডলইস্ট আই থেকে অনুবাদ করেছেন- ফরহাদ নাইয়া

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close