রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬,
১১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের      সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন আইন অনুযায়ী সব সুবিধা পাবেন       সেনাবাহিনীর পদোন্নতিতে মেধা, যোগ্যতা ও সততাই হবে প্রধান বিবেচনা: প্রধানমন্ত্রী      ইরানে নতুন করে হামলা না করার নির্দেশ ট্রাম্পের      ‘সেনাসদর নির্বাচনি পর্ষদ-২০২৬’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী      এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হতে পারে ৩০ জুলাই      আজ বঙ্গভবন ছাড়তে পারেন মো. সাহাবুদ্দিন      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
উদ্ভাবনই গড়বে বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের ভবিষ্যৎ
ড. শহীদুল ইসলাম
প্রকাশ: রোববার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ১১:৫৩ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প গত দুই দশকে যে পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে গেছে, তা দেশের শিল্প ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একসময় স্থানীয় বাজারে সীমিত কিছু খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আজ শতশত পণ্য নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করছে। বিস্কুট, নুড্লস, দুগ্ধজাত পণ্য, পানীয়, আইসক্রিম, বেকারি পণ্য, মসলা, সস, ফ্রোজেন ফুড এবং বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুত খাবার এখন দেশের খাদ্যশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এ সাফল্যের মধ্যেও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসছে বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প কি শুধু উৎপাদনে দক্ষ, নাকি নতুন পণ্য উদ্ভাবনেও সক্ষম?

বিশ্বব্যাপী খাদ্যশিল্পের প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু উৎপাদন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। কে দ্রুত নতুন পণ্য বাজারে আনতে পারছে, কে ভোক্তার ভবিষ্যৎ চাহিদা আগে বুঝতে পারছে, কে নতুন উপাদান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভিন্নধর্মী পণ্য তৈরি করতে পারছে এসব বিষয় এখন শিল্পের সাফল্য নির্ধারণ করছে। এ বাস্তবতায় খাদ্য পণ্য উন্নয়ন বা ফুড প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ক্রমশ একটি কৌশলগত সক্ষমতায় পরিণত হচ্ছে। 

খাদ্য পণ্য উন্নয়ন বলতে সাধারণভাবে একটি নতুন খাদ্যপণ্য তৈরি করা অথবা বিদ্যমান কোনো পণিকে আরও উন্নত করা বোঝায়। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি জটিল ও বহু স্তরবিশিষ্ট প্রক্রিয়া। একটি পণ্য বাজারে আসার আগে ভোক্তার চাহিদা বিশ্লেষণ, বাজার গবেষণা, রেসিপি বা ফর্মুলেশন তৈরি, উপাদান নির্বাচন, উৎপাদন প্রযুক্তি নির্ধারণ, পুষ্টিমান বিশ্লেষণ, স্বাদ পরীক্ষা, শেলফ লাইফ মূল্যায়ন, প্যাকেজিং উন্নয়ন এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের প্রস্তুতির মতো অসংখ্য ধাপ অতিক্রম করতে হয়। উন্নত বিশ্বের খাদ্য কোম্পানিগুলো একটি নতুন পণ্য বাজারে আনার আগে কখনো কখনো শতশত পরীক্ষামূলক সংস্করণ তৈরি করে।

বাংলাদেশেও খাদ্য পণ্য উন্নয়নের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। দেশের বড় খাদ্য কোম্পানিগুলো এখন নিজস্ব গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ পরিচালনা করছে। খাদ্য প্রযুক্তিবিদ, পুষ্টিবিদ, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, কেমিস্ট, মান নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ এবং বিপণন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে নতুন পণ্য উন্নয়ন দল গড়ে উঠছে। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে যে ভবিষ্যতের বাজারে শুধু উৎপাদন ক্ষমতা দিয়ে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব হবে না।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। খাদ্য পণ্য উন্নয়ন এবং খাদ্য উদ্ভাবন এক বিষয় নয়। একটি নতুন বিস্কুট বাজারে আনা পণ্য উন্নয়ন হতে পারে, কিন্তু যদি সেই বিস্কুটে স্থানীয় কৃষিজ উপাদান ব্যবহার করে উচ্চ ফাইবার, উচ্চ প্রোটিন বা স্বাস্থ্যগত সুবিধা যোগ করা হয়, তবে সেটি উদ্ভাবনের পর্যায়ে পড়ে। অর্থাৎ পণ্য উন্নয়ন বাজারের প্রয়োজন মেটায়, আর উদ্ভাবন বাজারকে পরিবর্তন করে।

বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প বর্তমানে মূলত পণ্য উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে। মৌলিক উদ্ভাবনের সংখ্যা এখনো সীমিত। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারে সফল পণ্যের স্থানীয় সংস্করণ তৈরি করছে অথবা বিদ্যমান খাদ্যপণ্য স্বাদ, প্যাকেজিং ও গুণগত মান উন্নত করছে। এটি খারাপ নয়, বরং শিল্প বিকাশের একটি স্বাভাবিক ধাপ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হলে উদ্ভাবনের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

বর্তমানে দেশের খাদ্যশিল্পে সবচেয়ে বেশি নতুন পণ্য উন্নয়ন হচ্ছে স্ন্যাকস, বিস্কুট, পানীয়, আইসক্রিম, বেকারি এবং প্রস্তুত খাবার খাতে। শহুরে জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং কর্মব্যস্ততা বৃদ্ধির ফলে কনভিনিয়েন্স ফুড বা সহজে প্রস্তুত ও খাওয়া যায় এমন পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তাদের একটি নতুন শ্রেণি তৈরি হচ্ছে, যারা কম চিনি, বেশি প্রোটিন, বেশি ফাইবার এবং পুষ্টিগুণসম্পন্ন পণ্য খুঁজছে।

বাংলাদেশের বড় খাদ্য কোম্পানিগুলো এ পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা নতুন নতুন স্বাদের পানীয়, উন্নত মানের বিস্কুট, স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যপণ্য বাজারে আনছে। তবে এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে এ পণ্যগুলোর প্রযুক্তি ও ফর্মুলেশন কোথা থেকে আসে?

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প এখনো অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি প্রযুক্তি ও জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই বিদেশি উপাদান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি অথবা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ফর্মুলেশন, রেসিপি এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া সংগ্রহ করে। পানীয়, দুগ্ধজাত পণ্য, কনফেকশনারি এবং বেকারি পণ্যের ক্ষেত্রে এটি খুবই সাধারণ চিত্র।

বড় কোম্পানিগুলোর নিজস্ব গবেষণা দল থাকলেও তারাও আন্তর্জাতিক উপাদান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। ফ্লেভার, এনজাইম, স্ট্যাবিলাইজার, ইমালসিফায়ার এবং অন্যান্য বিশেষায়িত উপাদান সরবরাহকারী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নতুন পণ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পে স্থানীয় গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তির একটি মিশ্র মডেল দেখা যায়।

এখানে একটি বাস্তব প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ কি চিরকাল বিদেশি ফর্মুলেশন এবং প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করবে, নাকি নিজস্ব খাদ্য উদ্ভাবন ব্যবস্থা গড়ে তুলবে?

এ প্রশ্নের উত্তরই আগামী দশকে দেশের খাদ্যশিল্পের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে।

বর্তমানে বিশ্বের খাদ্যশিল্প একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। বিকল্প প্রোটিন, মাইক্রোঅ্যালগি, স্পিরুলিনা, প্রিসিশন ফারমেন্টেশন, ফাংশনাল ফুড, ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুষ্টি এবং কৃষিজ বর্জ্য থেকে মূল্য সংযোজিত উপাদান তৈরির মতো ক্ষেত্রগুলো দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার খাদ্য কোম্পানিগুলো এখন শুধু খাদ্য উৎপাদন করছে না; তারা নতুন খাদ্য উপাদান তৈরি করছে, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছে এবং খাদ্য ব্যবস্থাকে পুনর্নির্মাণ করছে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ সম্ভবত এখানেই। দেশের কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত এমন অনেক সম্পদ রয়েছে, যেগুলোকে নতুনভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। ধানের কুঁড়া, চালের উপজাত, ফল ও সবজির বর্জ্য, কাঁঠাল, আম, দেশীয় ফল, স্পিরুলিনা এবং অন্যান্য কৃষিজ সম্পদ থেকে উচ্চমূল্যের খাদ্য উপাদান তৈরি করা সম্ভব।

বিশ্বব্যাপী ফাইবার সমৃদ্ধ খাদ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ওজন নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস প্রতিরোধ এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য ভোক্তারা এখন বেশি ফাইবারযুক্ত খাদ্যের দিকে ঝুঁকছেন। একইভাবে উচ্চ প্রোটিন খাদ্যের বাজারও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প যদি স্থানীয় উপাদান ব্যবহার করে এসব চাহিদা পূরণ করতে পারে, তাহলে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও সুযোগ তৈরি হবে।

স্পিরুলিনা এর একটি উদাহরণ। বাংলাদেশে প্রায় চার দশক আগে স্পিরুলিনা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছিল। কিন্তু এটি এখনো বৃহৎ শিল্পে পরিণত হয়নি। অথচ বিশ্ব এখন স্পিরুলিনা থেকে প্রোটিন, প্রাকৃতিক রং এবং বিশেষায়িত খাদ্য উপাদান তৈরি করছে। একইভাবে কৃষিজ বর্জ্য থেকে ফাইবার ও প্রোটিন উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।

আগামী দিনের আরেকটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে। উন্নত বিশ্বের খাদ্য কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে অও ব্যবহার করে নতুন পণ্যের ফর্মুলেশন তৈরি, উপাদান বিশ্লেষণ, ভোক্তা প্রবণতা মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রক ঝুঁকি শনাক্ত করার কাজ করছে। ভবিষ্যতে খাদ্য পণ্য উন্নয়ন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত, সাশ্রয়ী এবং তথ্যনির্ভর হবে। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে এ পরিবর্তনের অংশ হবে।

তবে এর জন্য শুধু প্রযুক্তি নয়, একটি শক্তিশালী উদ্ভাবন পরিবেশ প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, খাদ্য কোম্পানি এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তিকে দ্রুত শিল্পে রূপান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন খাদ্য প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা স্টার্টআপ এবং উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে হবে। বাংলাদেশের খাদ্যশিল্প আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। 

একদিকে রয়েছে প্রচলিত উৎপাদননির্ভর ব্যবসায়িক মডেল, অন্যদিকে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং জ্ঞানভিত্তিক শিল্প অর্থনীতির সম্ভাবনা। ভবিষ্যতের সফল খাদ্য কোম্পানি হবে সেই প্রতিষ্ঠান, যারা শুধু পণ্য উৎপাদন করবে না; বরং নতুন পণ্য উদ্ভাবন করবে, নতুন উপাদান তৈরি করবে এবং ভোক্তার আগামী দিনের চাহিদা বুঝে বাজারকে নেতৃত্ব দেবে।

খাদ্যপণ্য উন্নয়ন তাই আর শুধু একটি কারিগরি বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা, রপ্তানি সক্ষমতা এবং শিল্পায়নের নতুন অধ্যায়ের ভিত্তি।
  
লেখক : খাদ্য বিজ্ঞানী, বার্মিংহাম ইউকে

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close