চাহিদা মাত্র এক টন, কিন্তু সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৭শত টনেরও বেশি সার! আর এই অতিরিক্ত বিপুল পরিমাণ সার স্থানীয় কৃষকদের কোনো উপকারে না এসে সীমান্ত দিয়ে চলে যাচ্ছে মিয়ানমারে, যার বিনিময়ে দেশে ঢুকছে মরণনেশা ইয়াবা। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার সীমান্ত ইউনিয়ন পালংখালীতে গড়ে ওঠা এই ‘সারের বদলে ইয়াবা’ আদান-প্রদানের নেপথ্যে এক শক্তিশালী অসাধু সিন্ডিকেট সক্রিয় বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, পালংখালী ইউনিয়নে কৃষিকাজের ধরন দেশের অন্য এলাকার মতো নয়। এখানে মূলত দুই মৌসুমে চাষাবাদ হয়। বর্ষাকালে ঘেরে চিংড়ি চাষ শেষ হলে তারপর মূল ধান বা অন্যান্য ফসলের আবাদ শুরু হয়, আর তখনই সারের আসল প্রয়োজন দেখা দেয়। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্প গড়ে ওঠার পর থেকে পালংখালীতে শুষ্ক মৌসুমে মূল চাষাবাদ বলতে গেলে অনেকটাই বন্ধ। বর্তমানে নামমাত্র যে ছোটখাটো চাষাবাদ হয়, তাতে অল্প কিছু সার দিলেই কাজ চলে যায়। তাছাড়া এই ইউনিয়নে এখনো সারের মূল মৌসুম শুরুই হয়নি।
হিসাব অনুযায়ী, পুরো ইউনিয়নের জন্য বর্তমানে সর্বোচ্চ এক টন সারই যথেষ্ট। অথচ বাস্তবে ঘটেছে ঠিক তার উল্টো চিত্র। চাহিদা মাত্র এক টন থাকা সত্ত্বেও এই ইউনিয়নের নামে সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৭০০ টনেরও বেশি সার!
চাহিদার অতিরিক্ত এই বিপুল পরিমাণ সার নিয়ে এক ভয়াবহ চোরাচালানের তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। পালংখালীর সীমান্ত এলাকার একাধিক বাসিন্দা এবং বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই সারের বড় একটি অংশই সীমান্ত পার করে মিয়ানমারে পাচার করা হচ্ছে। ওপারে ইউরিয়া সারের তীব্র সংকট ও চড়া দাম থাকায় দেশীয় চোরাকারবারিরা এই সুযোগটি নিচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে সার পাচার করে মিয়ানমারে পাঠানো হচ্ছে, আর কোনো টাকা-পয়সা ছাড়া সারের বদলেই মিয়ানমার থেকে দেশে নিয়ে আসা হচ্ছে প্রাণঘাতী ইয়াবা। সহজ কথায়, সারের বদলেই ঢুকছে ইয়াবা এই অলিখিত পণ্য বিনিময় চুক্তিতেই চলছে সীমান্ত পারের ভয়াবহ চোরাচালান।
এ বিষয়ে উখিয়ার স্থানীয় সাংবাদিক মিজবাহ আজাদ বলেন, মিয়ানমারে বাংলাদেশি সার পাচার হওয়া এবং তার বিনিময়ে সীমান্ত দিয়ে দেশে ইয়াবা আসা এটা এখন উখিয়া-পালংখালী সীমান্তে প্রায় ‘ওপেন সিক্রেট’ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সবাই দেখেও না দেখার ভান করছে। এছাড়া চারদিকে আমরা তথ্য পাচ্ছি যে কৃষি কর্মকর্তার নীরব সম্মতেই এই সারগুলো পাচার হচ্ছে।
একই সুর ফুটে উঠেছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃকৃন্দের বক্তব্যেও। উখিয়া উপজেলা কৃষক দলের এক নেতা সারের এই অবৈধ পাচারের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে দাবি করেন, ‘মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে এই বিশাল পরিমাণ সারের চালান মূলত রামুসহ বিভিন্ন উপজেলা হয়ে উখিয়ায় প্রবেশ করানো হয়। তবে আমাদের কৃষক দলের নেতাকর্মীরাও সীমান্ত দিয়ে সার পাচার বন্ধ করার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।’
সার পাচারের এই ভয়াবহ চিত্রের সত্যতা মিলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক তথ্য থেকেও। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত উখিয়ার বিভিন্ন সীমান্তে ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে অভিযান চালিয়ে পাচারের সময় ২০টি মামলায় অন্তত ৩৮৩ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, বিপুল পরিমাণ সার প্রতিনিয়তই হাতবদল হয়ে সীমান্তের ওপারে চলে যাচ্ছে।
মৌসুমের আগেই এবং চাহিদা ছাড়া বিপুল পরিমাণ এই সরকারি সার কোথায় হারিয়ে গেল তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও সারের ডিলারদের ওপর কৃষি কর্মকর্তা কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের তদারকি না থাকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা।
বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন, কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুল মান্নান। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘যেখানে সর্বোচ্চ এক টন সার হলেই চলে, সেখানে ৭০০ টনের বেশি বরাদ্দ সার বাস্তবে গেল কোথায়? এর কোনো স্পষ্ট জবাব কি স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আছে?’
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, ‘সীমান্ত দিয়ে সার পাচারকারীদের শনাক্ত করতে কোনো অণুবীক্ষণ বা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না। ভেতরের অসাধু দুর্নীতিবাজরাই এই পাচারকারী চক্রকে আড়াল ও সুরক্ষা দিতে যথেষ্ট।’
ডিলারদের অনিয়ম ও সীমান্ত পাচার নিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষি অফিসের এক কর্মকর্তা প্রতিবেদককে সারের এই গোলমালের নেপথ্য কথা জানান।তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে সার পাচারের একাধিক স্পষ্ট তথ্য আমাদের হাতে এলেও রাজনৈতিক চাপ এবং স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের বাধার কারণে আমরা সরাসরি গিয়ে সার উদ্ধার করতে পারিনি। তবে সম্প্রতি সাংবাদিক ভাইয়েরা গণমাধ্যমে এ নিয়ে ধারাবাহিক লেখালেখি শুরু করার পর থেকে আমরা কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা অনেক বেশি কঠোর ও সজাগ হয়েছি।’
কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জব্দ তালিকা, জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর উদ্বেগ এবং অনুসন্ধানের তথ্য মিলিয়ে স্পষ্ট যে, পালংখালীতে চাহিদাহীন সারের বিশাল বরাদ্দের নেপথ্যে এক আন্তর্জাতিক কালোবাজারি ও মাদকের ভয়াবহ সিন্ডিকেট সক্রিয়। এই অনিয়মে জড়িত সারের ডিলার, পাচারকারী এবং আড়ালের প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সচেতন কৃষক ও এলাকাবাসী।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে উখিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশি্স সরকারের হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত বার্তা পাঠানো হলেও প্রতিবেদনটি লিখার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও তার কোনো মন্তব্য বা সাড়া পাওয়া যায়নি।
কেকে/ এমএস