কয়েক দিনের টানা তীব্র গরম, ভ্যাপসা আবহাওয়া ও প্রচণ্ড রোদের পর কিশোরগঞ্জে নেমেছে স্বস্তির বৃষ্টি। এতে একদিকে যেমন তীব্র গরমের অস্বস্তি থেকে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে বৃষ্টিতে স্বস্তি ফিরেছে কৃষকদের মধ্যেও।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টা ১৫ মিনিটের দিকে কিশোরগঞ্জ শহর ও আশপাশের এলাকায় হঠাৎ আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় দমকা হাওয়া। মুহূর্তেই বদলে যায় শহরের আবহাওয়া। চারদিকে মেঘলা পরিবেশ তৈরি হওয়ার পর শুরু হয় বৃষ্টি। বৃষ্টির সঙ্গে ঠান্ডা বাতাস থাকায় অল্প সময়ের মধ্যেই শহরের উত্তপ্ত পরিবেশ অনেকটা শীতল হয়ে আসে।
গত কয়েক দিন ধরে কিশোরগঞ্জে দিনের বেশির ভাগ সময়ই ছিল প্রচণ্ড গরম ও ভ্যাপসা আবহাওয়া। সকাল থেকেই সূর্যের তীব্রতা বাড়তে থাকায় দুপুরের দিকে মানুষের স্বাভাবিক চলাচলও ব্যাহত হচ্ছিল। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে ছিলেন রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিকসহ খেটে খাওয়া মানুষ। তীব্র রোদের মধ্যে জীবিকার প্রয়োজনে তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাইরে থাকতে হচ্ছিল।
এর মধ্যে বৃহস্পতিবার দুপুরের বৃষ্টি যেন জনজীবনে স্বস্তির পরশ নিয়ে আসে। বৃষ্টির সময় শহরের বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী মানুষকে দ্রুত আশ্রয় নিতে দেখা যায়। কেউ দোকানের সামনে, কেউ ভবনের নিচে, আবার কেউ গাছতলায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি থেকে বাঁচার চেষ্টা করেন। আবার অনেককে বৃষ্টিতে ভিজে স্বস্তি প্রকাশ করতেও দেখা যায়। বৃষ্টির পর সড়কের উত্তপ্ত পরিবেশ অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসে।
শহরের বাসিন্দারা বলছেন, কয়েক দিনের গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল জনজীবন। দিনের বেলায় রাস্তায় বের হলে তীব্র রোদ ও ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা তৈরি হচ্ছিল। বিশেষ করে দুপুরের সময় বাইরে বের হওয়া ছিল বেশ কষ্টকর। বৃহস্পতিবারের বৃষ্টিতে সেই অস্বস্তি অনেকটাই কমেছে। বৃষ্টির পর বাতাসে শীতলতা অনুভূত হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে মানুষের মধ্যে।
শুধু শহরাঞ্চল নয়, এই বৃষ্টিতে স্বস্তি এসেছে গ্রামীণ জনপদেও। কৃষকদের জন্য বৃষ্টিটি বিশেষভাবে স্বস্তিদায়ক হয়েছে। কয়েক দিনের তীব্র গরমে অনেক জমির মাটি শুকিয়ে যাচ্ছিল। কিছু জমিতে ফসলের প্রয়োজন মেটাতে সেচ দিতে হচ্ছিল কৃষকদের। এতে বাড়ছিল উৎপাদন খরচ। সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় জমিতে প্রাকৃতিকভাবে পানি পৌঁছানোর পাশাপাশি মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ফিরে আসবে বলে মনে করছেন তারা।
সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের ভূবিরচর গ্রামের কৃষক সাফি উদ্দিন বলেন, “কয়েক দিন ধরে প্রচণ্ড গরমে জমির মাটি শুকিয়ে যাচ্ছিল। আজকের বৃষ্টিতে জমিতে আর্দ্রতা ফিরবে। ধানসহ অন্যান্য ফসলের জন্য এই বৃষ্টি বেশ উপকারে আসবে। বৃষ্টি হওয়ায় আমরা কৃষকরাও স্বস্তি পেয়েছি।”
একই এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, “তীব্র গরমে জমির মাটিতে পানির প্রয়োজন ছিল। আজকের বৃষ্টিতে সেই চাহিদা কিছুটা পূরণ হবে। সময়মতো এমন বৃষ্টি কৃষির জন্য ভালো। আশা করছি, ফসলের ফলনেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
কৃষকেরা জানান, কৃষিকাজ অনেকটাই আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। অতিরিক্ত গরম ও বৃষ্টির ঘাটতি হলে জমিতে সেচ দিতে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়। বিশেষ করে আমন ধানের জমিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ধরে রাখতে সময়মতো বৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ। তাই বৃহস্পতিবারের বৃষ্টিতে সেচের ওপর চাপ কিছুটা কমার পাশাপাশি জমির মাটির আর্দ্রতা স্বাভাবিক থাকবে বলে আশা করছেন তারা।
তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাওয়া শ্রমজীবী মানুষও বৃষ্টিতে স্বস্তির কথা জানিয়েছেন। দিনমজুর আব্দুল হালিম বলেন, “কয়েক দিন ধরে রোদের মধ্যে কাজ করতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। দুপুরে বৃষ্টি আর ঠান্ডা বাতাসে গরমটা অনেকটাই কমেছে। এখন কাজে বের হলেও আগের মতো গরম লাগছে না।”
রিকশাচালক মো. রফিক বলেন, “গরমের কারণে রিকশা চালাতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল। বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তা ঠান্ডা হয়েছে, বাতাসও বেড়েছে। এতে আমাদের মতো শ্রমজীবী মানুষের কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।”
জেলা শহরের স্থানীয় বাসিন্দা মো. জাকির হোসেন বলেন, “কয়েক দিন ধরে অসহনীয় গরম ছিল। দুপুরের বৃষ্টির পর পরিবেশ অনেকটা ঠান্ডা হয়েছে। বৃষ্টি মানুষের মধ্যে যেমন স্বস্তি এনেছে, তেমনি প্রকৃতিতেও প্রাণ ফিরেছে।”
নিকলী আবহাওয়া অফিসের বেলুন মেকার মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন বলেন, “আজ দুপুরে কিশোরগঞ্জে ২২ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমের শেষ সময় হওয়ায় এখন আর ভারী কোনো বৃষ্টি নেই। তবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হালকা ধরনের বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানের এই বৃষ্টি কৃষির জন্য অত্যন্ত উপকারী। বৃষ্টির পানি মাটির আর্দ্রতা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিজমির জন্য উপকার করবে।”
কেকে/ এমএস