ইসরায়েলের হাইফা বন্দরকে কেন্দ্র করে গঠিত ‘ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোর’ (আইমেক) গাজা যুদ্ধ এবং ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। এর জবাবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক ও ইরাক ইসরায়েলকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে বিকল্প স্থল ও সমুদ্র পথ গড়ে তোলার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
চলতি বছরের জুনে সৌদি আরব ও তুরস্কের পরিবহনমন্ত্রীরা একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছেন। লক্ষ্য-অটোমান আমলের ঐতিহ্যবাহী ‘হিজাজ রেলওয়ে’ পুনরুজ্জীবিত করা। জর্ডান ও সিরিয়া হয়ে সৌদি-তুরস্ককে সংযুক্তকারী এই করিডরটি করা হচ্ছে একদম দেখেশুনে, পরিকল্পনা করে এবং ইসরায়েলকে এড়িয়ে। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) বসে নেই। তারাও ভাবছে নতুন বাণিজ্য পথ নিয়ে, যা সিরীয় উপকূল থেকে ইরাক হয়ে সরাসরি তাদের উপসাগরীয় বন্দর পর্যন্ত প্রসারিত হবে। জুলাই মাসে ইউএইর দুবাই ভিত্তিক সংস্থা ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ ফুজাইরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ৫০ বছরের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর উদ্দেশ্য ইউএই-এর আরব সাগর উপকূলে দুটি টার্মিনাল (যার মধ্যে ‘আল-রুঘাইলাত’ কনটেইনার পোর্ট অন্যতম) তৈরি করা- যাতে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার না করেই সরাসরি পণ্য খালাস ও পরিবহন করা যায়।
এই দুটি উদ্যোগই কিন্তু ‘আইমেক’-কে সরাসরি টেক্কা দিচ্ছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে ঘোষিত এই প্রজেক্টটির মূল ভিত্তিই ছিল ইসরায়েলের হাইফা বন্দরকে ইউরোপের প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলা-যার মাত্র চার সপ্তাহ পর গাজায় যুদ্ধ শুরু হয়। এর উদ্ভাবক বা সমর্থকরা এখনো একে ‘সাময়িক স্থগিত’ বলছেন ঠিকই, তবে আইমেকের বিকল্প হিসেবে বাস্তব ক্ষেত্রে যা গড়ে উঠছে তা আঞ্চলিক বিন্যাসের এক নতুন সমীকরণ নির্দেশ করে। আর এ নতুন ব্যবস্থার সহজ সমীকরণ হলো; বাণিজ্য হবে সবাইকে নিয়ে, শুধু বাদ থাকবে ইসরায়েল।
রাজনৈতিক ও সামরিক ধাক্কা
যুক্তরাষ্ট্র মূলত চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’কে (বিআরআই) জবাব দিতেই আইমেকের পরিকল্পনা করেছিল। ভারতীয় পণ্য সমুদ্রপথে ইউএই আসবে, সেখান থেকে রেলে সৌদি ও জর্ডান পেরিয়ে হাইফা হয়ে যাবে ইউরোপে-এটিই ছিল ছক। এ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ছিল উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ। কিন্তু গাজা যুদ্ধ এক কিলোমিটার রেললাইন বসানোর আগেই জর্ডান অংশের কাজ থামিয়ে দেয়। আর সৌদি আরব পরিষ্কার জানিয়ে দেয়-ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি না দিলে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা অসম্ভব। রাজনৈতিকভাবে প্রজেক্টটি সেখানেই থমকে যায়।
এরপর ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ এ প্রকল্পের অবকাঠামোগত বাস্তবায়ন ও থেমে যায়। ইসরায়েলি বন্দর ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চলতে থাকে। তা ছাড়া ক্ষমতার আকারের প্রশ্নও ছিল। যুদ্ধের আগে হাইফা বন্দর বছরে প্রায় ১৫ লাখ কনটেইনার সামলাত-যা এ প্রজেক্টের উদ্যোক্তাদের ঢাকঢোল পেটানোর তুলনায় কিছুই নয়। পুরো উপসাগরীয় বাণিজ্যকে ইসরায়েলের সঙ্গে বাঁধা মানেই ছিল-অপ্রতুল ক্ষমতার ও সার্বক্ষণিক যুদ্ধে লিপ্ত একটি রাষ্ট্রের ওপর বাণিজ্যিক নির্ভরতা তৈরি করা। ফলে উপসাগরীয় পরাশক্তিগুলো তাদের পুরোনো অভ্যন্তরীণ মতভেদের ভিত্তিতেই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
সৌদি আরব গত এক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চাচ্ছে এবং এ আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন করতে তারা নানা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তাদের এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তারা চলতি বছরের মার্চে ‘সৌদি আরব রেলওয়েজ’ ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটারের একটি বিশেষ ফ্রেইট করিডোর চালু করে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে এ পথটি তৈরি করা হয়, যা সৌদি আরবের পূর্ব উপকূলীয় বন্দরগুলোকে জর্ডান সীমান্তের সঙ্গে যুক্ত করেছে। পাশাপাশি তাদের পেট্রোলাইন ক্রুড পাইপলাইন রয়েছে, যার মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে রেকর্ড ৭ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি তেল রপ্তানি করা সম্ভব হয়েছে। সৌদির দর্শন স্পষ্ট : যদি পর্যাপ্ত বাণিজ্য ও জ্বালানি তাদের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে যায়, তবে ইসরায়েল বা ইরান কেউই তাদের কোণঠাসা করতে পারবে না।
অপরদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কৌশল ভিন্ন। তারা সৌদি বা ইসরায়েল কাউকেই তোয়াক্কা না করে একাধিক রাষ্ট্রের উপকূল ছুঁয়ে ভিন্ন ভিন্ন পথ তৈরির চেষ্টা করছে ‘এডি পোর্টস গ্রুপ’ ইতোমধ্যেই তাদের খালিফা বন্দরকে ইরাকের উম্ম কাসরের সঙ্গে যুক্ত করেছে, যা সরাসরি যুক্ত হচ্ছে ইরাকের ১৭ বিলিয়ন ডলারের ‘ডেভেলপমেন্ট রোড’-এর সঙ্গে। ফলে পণ্য সৌদি বা ইসরায়েল না ছুঁয়েই ইরাক ও তুরস্ক হয়ে সোজা ইউরোপে পৌঁছে যাবে। ইউএই একইসঙ্গে তাদের হাবশান-ফুজাইরা পাইপলাইন প্রসারিত করছে, যাতে হরমুজ প্রণালি এড়িয়েই ওমান উপসাগরে তেল পৌঁছানো যায় (যা ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে)। কিন্তু দেশ দুটির এ প্রচেষ্টা যতই নিখুঁত হোক না কেন, এ বিকল্প করিডরগুলোকে শেষ পর্যন্ত দুটি বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে-
পরিবহনের পরিমাণ
স্থলপথ কখনোই সমুদ্রপথের বিকল্প হতে পারে না। বিশ্ব বাণিজ্যের লাখো কোটি টন মালামালের বোঝা টানে সমুদ্র। একটি কনটেইনার জাহাজে সর্বোচ্চ ২৪ হাজার কনটেইনার ধরে। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত স্থলপথ ‘চায়না রেলওয়ে এক্সপ্রেস’ ২০২৪ সালের পুরো বছরে যেখানে মাত্র ২০ লাখ কনটেইনার পরিবহন করেছে, সেখানে একাই দুবাইয়ের ‘জেবেল আলী’ বন্দর ২০২৪ সালে ১ কোটি৫৫ লাখ কনটেইনার সামলেছে। সমুদ্রপথ নিরাপদ ও খোলা থাকলে বাণিজ্য স্বাভাবিকভাবেই আবার সমুদ্রেই ফিরে আসবে।
ইরান ও ইসরায়েলি সামরিক বাস্তবতা
হরমুজ প্রণালি সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো উপসাগরে তেল উৎপাদন দৈনিক ২০ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে একলাফে ৭.৫ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছিল। এ সংকটের সময় ইউএই এবং সৌদি উভয়কেই তাদের রণকৌশল বদলাতে হয়েছে। তেল সরবরাহ পুনর্প্রতিষ্ঠা এবং নিজেদের টিকিয়ে রাখতে রিয়াদ যেমন ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে জোর দিয়েছে, ইউএইকেও পরোক্ষ সমঝোতার পথ বেছে নিতে হয়েছে।
অন্যদিকে, বাণিজ্য পথ থেকে ইসরায়েলকে বাদ দেওয়া মানেই কিন্তু তাদের সামরিক প্রভাব শেষ হয়ে যাওয়া নয়। এ করিডর নির্মাতাদের কাছে যা নেই, ইসরায়েলের ঠিক সেটাই আছে-যে কোনো রুট বা প্রজেক্ট তাদের অপছন্দ হলে তা গুঁড়িয়ে দেওয়ার তীব্র সামরিক ক্ষমতা। যে রুট তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের শক্তিশালী করে বা তাদের বাদ দেয়, তাকে তারা স্বাভাবিকভাবেই হুমকি মনে করবে।
ইরান যুদ্ধের সময়ই যেমনটা দেখা গেছে, ইউএই-কে রক্ষা করতে খোদ ইসরায়েলকেই তাদের ‘আইরন ডোম’ মিসাইল ডিফেন্স ব্যাটারি এবং সৈন্য পাঠাতে হয়েছে। অর্থাৎ, যে রাষ্ট্রটি ইসরায়েলকে পাশ কাটিয়ে পথ তৈরি করতে চাইছে, ইরানের হামলা থেকে বাঁচতে শেষ পর্যন্ত সেই ইসরায়েলি ব্যবস্থার ওপরই তাকে নির্ভর করতে হচ্ছে। অঙ্কারা, কায়রো, রিয়াদ বা আবুধাবি যতই নতুন করিডরের নকশা আঁকুক না কেন-যতক্ষণ না তারা ইসরায়েলের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এ পথগুলোকে উন্মুক্ত ও সুরক্ষিত রাখতে পারছে, ততক্ষণ তারা শুধু মানচিত্রই এঁকে যাবে-কৌশলগত বিজয় গড়তে পারবে না।
লেখক : মিডল ইস্ট আইয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক
মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ করেছেন ফরহাদ নাইয়া
কেকে/এমএ