জনবল কাঠামো অনুসারে একজন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ছাড়াও ১১ জন উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা থাকার কথা। কিন্তু আছেন মাত্র একজন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা। ছয়টি অফিস সহায়ক পদ থাকলেও একজন হিসাব সহকারী ছাড়া অফিসে করণিক পদে আর কেউ নেই। এমনকি পিয়নও নেই। ফলে ১ হাজার ৪০০ শিক্ষক ও প্রায় ৫৫ হাজার শিক্ষার্থীকে দেখার কেউ নেই।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা সীমিত। তিন থেকে চারজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে একজন সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হলেও এতে পাঠদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে।
শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজে সময় দিতে হচ্ছে। ফলে শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক করা হলে অন্য শিক্ষকরা তার নির্দেশনা মানতে অনীহা দেখান। এতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে, যা শিক্ষা কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শ্যামগ্রাম দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ডালিয়া সুলতানা বলেন, ‘‘আমাদের বিদ্যালয়ে ২০২১ সাল থেকে প্রধান শিক্ষক নেই। ২০২৫ সালে আমি ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব গ্রহণ করি। প্রশাসনিক কাজ সামলাতে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অভিভাবকদের মধ্যেও এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।’’
আটিয়ারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল খালেক বলেন, ‘‘উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ১১ জন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা থাকার কথা। সেখানে একজন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা দিয়ে সমগ্র নবীনগরের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। অফিসের কার্যক্রমেও অনেক সমস্যা। যেখানে ছয় থেকে সাতটি অফিস সহায়ক পদ আছে, সেখানে একজনের পক্ষে সবকিছু সামাল দেওয়া খুবই কষ্টকর। আমরা শিক্ষকরা অফিসিয়াল কাজের জন্য অনেক দুর্ভোগ পোহাচ্ছি। কোনো অফিসিয়াল কাজে এসে দুই, তিন বা চার ঘণ্টা বসে থেকেও কখনো কখনো শুনতে হয়, আরেক দিন আসতে হবে। আমি ৩৮ বছর যাবৎ শিক্ষকতা করে আসছি। আমার জানা মতে, এমন দুর্ভোগ শিক্ষা অফিসে কোনো সময় হয়নি।’’
গোসাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছাম্মৎ তাসলিমা জাহান জানান, ‘‘আমাদের অফিসে দীর্ঘদিন ধরে স্টাফ সংকট রয়েছে। সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য। প্রশাসনিক কাজ করতে ঝামেলা পোহাতে হয়। সঠিকভাবে কাজ করা যায় না। স্যার ভিজিটে থাকেন। অফিসে অপেক্ষা করতে হয়। অভাব-অভিযোগও ঠিকমতো উপস্থাপন করতে পারি না।’’
প্রাথমিক শিক্ষক নেতা ও আলিয়াবাদ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম সবুজ বলেন, ‘‘প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক স্তম্ভ। প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার মান ধরে রাখতে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়বে। আমি চাই, সব বিদ্যালয়ে দ্রুত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হোক।’’
শ্যামগ্রাম (দ.) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাবেক চেয়ারম্যান মো. রোস্তম আহাম্মদ বলেন, ‘‘২০২১ সাল থেকে বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। এতে শিক্ষার মান নাজুক হয়ে পড়েছে। দ্রুত নিয়োগ না দিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’’
অফিসের হিসাব সহকারী আবু হানিফ বলেন, ‘‘২০১২ সালে এখানে যোগদান করার সময় আমরা চারজন ছিলাম। তখন শিক্ষক সংখ্যাও কম ছিল। ৫০০ থেকে ৬০০ শিক্ষক ছিল। আইটি-ভিত্তিক এত কাজও ছিল না। চারজনে সুন্দরভাবে অফিস পরিচালনা করেছি। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে তিনজন অবসরে চলে যাওয়ার পর আমরা দুজন প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ছিলাম। ২০২৪ সাল পর্যন্ত দুজনে অফিস চালিয়েছি। অফিসপ্রধান ইউডি কাম অ্যাকাউন্ট্যান্ট বদলি হয়ে কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে চলে যান। এরপর থেকে দুই বছর ধরে আমি একাই আছি।’’
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা উম্মে সালমা বলেন, ‘‘প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণের জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। প্রতি মাসে হালনাগাদ তথ্য পাঠানো হচ্ছে। পদোন্নতির জন্য যোগ্য শিক্ষকদের তালিকাও ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে। আশা করি, দ্রুতই শূন্য পদগুলো পূরণ করা সম্ভব হবে।’’
শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া জরুরি। তা না হলে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।