নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় প্রথমবারের মতো সরকারি হাসপাতালে অ্যান্টি স্নেক ভেনম (সর্পদংশন-বিরোধী বিষনাশক) প্রয়োগ করে বিষধর সাপের কামড়ে আক্রান্ত এক শিশুর প্রাণ রক্ষা করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো এ ধরনের চিকিৎসার ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জানা যায়, শনিবার (২৬ জুলাই) সন্ধ্যা ৭টার দিকে উপজেলার সোনাদিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফিরোজ উদ্দিনের ছেলে রাহাত (৮) মাগরিবের নামাজ পড়তে যাওয়ার পথে বিষধর সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়। প্রথমে স্থানীয় কয়েকজন কবিরাজের শরণাপন্ন হলেও তার অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। পরে রাত ১২টার দিকে তাকে হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
দায়িত্বরত মেডিকেল অফিসার ডা. রবিউল হোসেন নিলয় বলেন, ‘রোগীকে হাসপাতালে আনার পর শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিষধর সাপের দংশনের একাধিক লক্ষণ শনাক্ত করি। রোগীর মধ্যে ঘাড় ভেঙে পড়া (ব্রোকেন নেক সাইন), চোখের পাতা ঝুলে পড়া (পটোসিস) এবং অচেতনতার মতো উপসর্গ দেখা যায়। এছাড়া ২০ মিনিট ক্লট অবজারভেশন টেস্ট (২০ মিনিট ক্লট অবজারভেশন টেস্ট) করে বিষক্রিয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হই। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ও আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তার (আরএমও) সঙ্গে পরামর্শ করি। তাদের সার্বিক তত্ত্বাবধান এবং শিশুটির বাবার সম্মতিক্রমে হাসপাতালে প্রথমবারের মতো অ্যান্টি স্নেক ভেনম (সর্পদংশন-বিরোধী বিষনাশক) প্রয়োগ করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘চিকিৎসা শুরুর পর ধীরে ধীরে শিশুটির অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। বর্তমানে সে আশঙ্কামুক্ত ও সুস্থ রয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা-সরঞ্জাম বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে আরও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
শিশুটির বাবা ফিরোজ উদ্দিন বলেন, ‘আমার ছেলে মাগরিবের নামাজ পড়তে যাওয়ার পথে সাপে কামড় দেয়। তার চিৎকার শুনে আমরা ছুটে যাই। প্রথমে স্থানীয় কয়েকজন কবিরাজের শরণাপন্ন হয়েছিলাম, কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসি। ছেলের অবস্থা দেখে মনে হয়েছিল, হয়তো আর বাঁচবে না। ডাক্তাররা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর একটি ইনজেকশন দেন। এখন আমার ছেলে অনেকটাই সুস্থ। হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’
হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মানসী রানী সরকার বলেন, ‘এটি হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অ্যান্টি স্নেক ভেনম প্রয়োগের ঘটনা। চিকিৎসক, নার্স, স্যাকমো, স্টোরকিপার, ওয়ার্ডবয় ও আয়াসহ সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। ভবিষ্যতেও এ ধরনের জরুরি চিকিৎসাসেবা আরও দক্ষতার সঙ্গে চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
উল্লেখ্য, হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক, নার্স ও শয্যাসংকটের কারণে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব, জনবলসংকট এবং সীমিত চিকিৎসাসুবিধার কারণে অনেক জটিল রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাতিয়ার বাইরে রেফার করতে হয়। তবে এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রথমবারের মতো অ্যান্টি স্নেক ভেনম প্রয়োগ করে বিষধর সাপের দংশনে আক্রান্ত এক শিশুর সফল চিকিৎসা স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবায় একটি ব্যতিক্রমী ও আশাব্যঞ্জক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের আশা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, জনবল ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা হলে ভবিষ্যতে সর্পদংশনে আক্রান্ত রোগীদের অধিকাংশের চিকিৎসাই হাতিয়াতেই দেওয়া সম্ভব হবে।
কেকে/এলএ