শরীরের কোনো অস্বস্তি, শিশুর হঠাৎ অসুস্থতা বা কোনো উপসর্গের কারণ জানতে এখন অনেকেই চিকিৎসকের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করছেন। তবে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ব্যক্তিগত তথ্য এআই প্ল্যাটফর্মে দেওয়ার আগে গোপনীয়তা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং পরামর্শের নির্ভুলতা সম্পর্কে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্যনীতি বিষয়ক সংস্থা কেএফএফের মার্চ মাসের এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়ে এআইয়ের সাহায্য নিয়েছেন। একই সময়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এআই প্ল্যাটফর্ম চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেন দেশটির ৪৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক।
ওপেনএআই জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি সপ্তাহে ৩০ কোটির বেশি মানুষ স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর জানতে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করেন।
বর্তমানে বিভিন্ন এআই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের চিকিৎসা নথি, পরীক্ষার ফলাফল, চিকিৎসকের মন্তব্য, ঘুমের তথ্য, খাদ্যাভ্যাস এবং দৈনন্দিন শারীরিক কার্যক্রমের তথ্য বিশ্লেষণের সুযোগ দিচ্ছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা, সম্ভাব্য কারণ বিশ্লেষণ এবং খাদ্যাভ্যাস বা জীবনযাপনসংক্রান্ত পরামর্শও দিতে পারে এআই।
সম্প্রতি ওপেনএআই জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীরা আরও বিস্তৃতভাবে চিকিৎসা নথি আপলোড করে চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে নিজেদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ, পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসকের সঙ্গে আরও তথ্যভিত্তিক আলোচনা করতে পারবেন।
তবে কেএফএফের জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষ স্বাস্থ্য তথ্য এআই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শেয়ার করার ক্ষেত্রে গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জরিপে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রশ্ন করা ব্যবহারকারীদের ৪১ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা নিজেদের চিকিৎসা তথ্য এআই প্ল্যাটফর্মে জমা দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে কেউ চাইলে স্বাস্থ্য তথ্য এআইয়ে দিতে পারেন। তবে তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, কতদিন রাখা হবে এবং কী কাজে ব্যবহার করা হবে—এসব বিষয় আগে ভালোভাবে জেনে নেওয়া উচিত।
স্বাস্থ্য তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও কম নয়। হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের রোগীর তথ্য সুরক্ষায় কঠোর নীতি ও আইন মানতে হলেও এআই প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের আইনি কাঠামোর আওতায় পড়ে না। যদিও অ্যানথ্রপিক, মাইক্রোসফট, পারপ্লেক্সিটি ও ওপেনএআই জানিয়েছে, ব্যবহারকারীর তথ্য এনক্রিপ্টেড থাকে এবং স্বাস্থ্য তথ্য এআই মডেল প্রশিক্ষণ বা বিজ্ঞাপনের কাজে ব্যবহার করা হয় না।
তবে চিকিৎসা নৈতিকতা বিশেষজ্ঞ আর্ট ক্যাপলানের মতে, আরও শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা ছাড়া ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য তথ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তিনি ২০২৩ সালে জেনেটিক পরীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান ২৩অ্যান্ডমির তথ্য ফাঁসের ঘটনার উদাহরণ দেন, যেখানে প্রায় ৭০ লাখ গ্রাহকের ব্যক্তিগত ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ হয়ে যায়।
এআইয়ের নির্ভুলতা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে এআই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল চিকিৎসা পরামর্শ দিতে পারে অথবা জরুরি পরিস্থিতির ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হতে পারে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, চ্যাটজিপিটির পুরোনো সংস্করণ ক্যানসার চিকিৎসাসংক্রান্ত এক-তৃতীয়াংশের বেশি প্রশ্নে অনুপযুক্ত পরামর্শ দিয়েছিল।
যদিও ওপেনএআই বলছে, তাদের সর্বশেষ মডেলগুলো নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে এবং শত শত চিকিৎসকের মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, নতুন সংস্করণগুলো অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সমমানের বিশ্লেষণ দিতে সক্ষম।
তবুও বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, এআইকে চিকিৎসকের বিকল্প নয়, বরং সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। গুরুতর অসুস্থতা বা জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যার ক্ষেত্রে এআইয়ের পরামর্শের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
স্বাস্থ্য বিষয়ে এআই ব্যবহার করলে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য তথ্য দেওয়ার আগে গোপনীয়তা নীতি ভালোভাবে পড়ুন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করবেন না। এআইয়ের দেওয়া তথ্যের উৎস বা প্রমাণ জানতে চান। একই প্রশ্ন ভিন্নভাবে করে উত্তর মিলিয়ে দেখুন। গুরুতর শারীরিক সমস্যা বা জরুরি অবস্থায় এআইয়ের বদলে সরাসরি চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এআইয়ের পরামর্শকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, সহায়ক তথ্য হিসেবে বিবেচনা করুন।
কেকে/ এমএস