সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬,
১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: অনুসন্ধানে অবহেলার মাশুল দিচ্ছে দেশ      আমি মানুষ হত্যা করতে চাই না : ট্রাম্প      নতুন নীতিমালায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম চালু      মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানি করতে চায় বাংলাদেশ      ঢাবিতে ভর্তি আবেদন ১১ নভেম্বর থেকে, পরীক্ষা শুরু ৫ ডিসেম্বর      সব বেসরকারি দাখিল-আলিম মাদ্রাসার অ্যাডহক কমিটি বাতিল      ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ল ৭০ টাকা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
ঢাকা-দিল্লি কূটনীতির নতুন সমীকরণ
জুবাইয়া বিন্তে কবির
প্রকাশ: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৯ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

কূটনীতির আঙিনায় কখনো কখনো একটি সাদা কাগজের আমন্ত্রণপত্র হয়ে ওঠে ইতিহাসের নিঃশব্দ সাক্ষী। সেই কাগজে লেখা থাকে না কেবল স্থান-কাল-অতিথির নাম; সেখানে লুকিয়ে থাকে পরিবর্তিত সময়ের স্বীকৃতি, জনগণের জাগ্রত চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা এবং দুই প্রতিবেশীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কের নতুন সমীকরণ। আজ যখন নরেন্দ্র মোদীর পক্ষ থেকে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নামে সেই আমন্ত্রণ এসেছে, তখন তা কেবল একটি কূটনৈতিক শিষ্টাচার নয় এটি জুলাইয়ের রক্তাক্ত প্রভাতের পর জেগে ওঠা এক নতুন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রতীক। 

একজন গবেষক এবং বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নারী হিসেবে আমি গভীর আবেগে অনুভব করি এই মুহূর্তটি আমাদের জাতীয় আত্মবিশ্বাসের নতুন ভোর। যে তারেক রহমান নির্বাসনের দীর্ঘ রাত পেরিয়ে মাতৃভূমির বুকে ফিরে এসে জনগণের ভোটে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন, আজ তিনি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সার্বভৌম মর্যাদা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এ আমন্ত্রণ সেই মর্যাদারই প্রতিধ্বনি। তবু ইতিহাস আমাদের শেখায় আমন্ত্রণপত্রের কাগজ যতই মসৃণ হোক, সম্পর্কের ভিত্তি হতে হয় আরও গভীর। 

শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশ আর পুরোনো বাংলাদেশ নয়। এখানে জনগণ এখন ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রকে সম্মান চায়; দল নয়, সমতাকে চায়; আনুগতিকতা নয়, আত্মমর্যাদাকে চায়। ব্রিকসের এ মঞ্চ তাই কেবল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার নয় এটি ঢাকা-দিল্লির নতুন সমীকরণের সেই পরীক্ষার ক্ষেত্র, যেখানে সমতা, সম্মান ও জনগণের আস্থার ভাষাই হবে একমাত্র ভাষা। এ প্রতিবেদন সেই সম্ভাবনা ও প্রত্যাশারই আলেখ্য যেখানে আমন্ত্রণপত্রের নিঃশব্দ অক্ষরগুলো হয়ে উঠেছে এক নতুন ইতিহাসের প্রথম পঙ্ক্তি।

দক্ষিণ এশিয়ার দাবার ছকে বাংলাদেশের গুরুত্ব : আজকের বিশ্বে বাংলাদেশ আর কেবল একটি ভৌগোলিক রাষ্ট্র নয়; এটি ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ এবং ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়। ফলে ব্রিকস সম্মেলনের এ আমন্ত্রণের গুরুত্ব কেবল দ্বিপক্ষীয় নয়; বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।

জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা : জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা কেবল সরকার পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বদলে গেছে রাষ্ট্র, জনগণ এবং পররাষ্ট্রনীতির মানসিকতাও। জনগণ এখন এমন একটি বৈদেশিক সম্পর্ক প্রত্যাশা করে, যেখানে কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্র বিশেষ ব্যক্তি বা দলের নয়, বরং বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেবে। এ নতুন বাস্তবতা উপেক্ষা করে ভবিষ্যতের ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক কল্পনা করা কঠিন।

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে এ আমন্ত্রণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি পরিবর্তিত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দিল্লি এখন বুঝতে শুরু করেছে যে, ঢাকার রাজনৈতিক দৃশ্যপট চিরতরে বদলে গেছে।

আমন্ত্রণপত্রে ‘প্রধানমন্ত্রী’ না বলে ‘বিমসটেকের চেয়ার’ হিসেবে সম্বোধনের বিষয়টি বাংলাদেশে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল এ বিষয়ে সরাসরি জবাব এড়িয়ে গেলেও, এটি প্রমাণ করে যে, দিল্লির কাছে এখনো পুরোনো মানসিকতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া সহজ নয়। তবুও আমন্ত্রণটি নিজেই এক ইতিবাচক সংকেত।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে আমন্ত্রণপত্রের ভাষা নিয়ে সরাসরি ব্যাখ্যা না এলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান স্পষ্ট করেছেন যে, সরকার এ আমন্ত্রণ পর্যালোচনা করছে। তিনি বলেছেন, পারস্পরিক স্বার্থ ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে। অস্বস্তিকর বিষয়গুলো নিরসন ছাড়া স্থায়ী বন্ধুত্ব সম্ভব নয়, এ অবস্থান বিএনপি সরকারের নীতিগত দৃঢ়তার প্রতিফলন। একটি বিষয় স্পষ্ট দিল্লি সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে আগ্রহী এবং ব্রিকসকে সেই সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছে। একই সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, আমন্ত্রণটি সরকার পর্যালোচনা করছে এবং সম্পর্ককে পারস্পরিক স্বার্থ ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার নীতিতে অটল রয়েছে।

সম্পর্কের ভিত্তি হোক জনগণের আস্থা : আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের প্রকৃত শক্তি কোনো ব্যক্তি, কোনো দল কিংবা সাময়িক রাজনৈতিক সমীকরণে নয়; বরং দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক আস্থা, সম্মান এবং সমমর্যাদার ওপর নির্ভরশীল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, জনগণের অনুভূতিকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই ভবিষ্যতের ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক যদি সত্যিই নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে চায়, তবে সেটিকে হতে হবে স্বচ্ছ, মর্যাদাপূর্ণ এবং জনগণকেন্দ্রিক।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাসে সহযোগিতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিতর্ক ও অবিশ্বাসেরও নানা অধ্যায়। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই সম্পর্ক এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশে নেতৃত্বের পরিবর্তনের ফলে দিল্লিকেও তার কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনা করতে হচ্ছে। দুই দেশের সম্পর্ক যদি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে হয়, তবে তা কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক শক্তিকে কেন্দ্র করে নয়; বরং জনগণের প্রত্যাশা, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এবং পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে। কূটনীতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো স্থায়ী বন্ধু বা প্রতিপক্ষ নয়, স্থায়ী হয় কেবল জাতীয় স্বার্থ। সেই বাস্তবতাই আজ ঢাকা ও দিল্লি উভয়কেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় মর্যাদা কোনো কূটনৈতিক দর-কষাকষির বিষয় হতে পারে না। সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং বিচারিক সহযোগিতার মতো বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন আজও দুই দেশের সম্পর্ককে অস্বস্তিকর করে রেখেছে। বন্ধুত্বের প্রকৃত অর্থ একতরফা সুবিধা নয়; বরং পারস্পরিক ন্যায়, আস্থা এবং সমতার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান। বাংলাদেশের জনগণ আজ এমন এক প্রতিবেশী সম্পর্ক দেখতে চায়, যেখানে ছোট-বড় রাষ্ট্রের বিভাজন নয়, বরং সমমর্যাদার নীতি কার্যকর হবে।

ব্রিকস : বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত : বিশ্ব অর্থনীতির শক্তির ভারসাম্য দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় জি-৭ ছিল বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক; কিন্তু বর্তমানে ব্রিকস বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর অন্যতম শক্তিশালী জোটে পরিণত হয়েছে। নতুন উন্নয়ন ব্যাংক, বিকল্প আর্থিক সহযোগিতা, বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার নতুন ধারণা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের জন্য ব্রিকসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা শুধু কূটনৈতিক নয়; এটি বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি :
 
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য বরাবরই ছিল ভারসাম্য রক্ষা। চীন বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী, যুক্তরাষ্ট্র বৃহত্তম রপ্তানি বাজারগুলোর একটি এবং ভারত নিকটতম প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার। এ তিন শক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে কোনো একপক্ষের প্রতি অন্ধ ঝুঁকে পড়া বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং প্রয়োজন এমন একটি বাস্তববাদী কূটনীতি, যেখানে জাতীয় স্বার্থ হবে একমাত্র মানদণ্ড। জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশ নায়ক তারেক রহমানের সরকারের সামনে এটিই সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা সব পক্ষের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।

প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নতুন সম্ভাবনার জন্ম দেয়। বর্তমান সময়ও তার ব্যতিক্রম নয়। যদি বাংলাদেশ ও ভারত পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর করে নতুন আস্থার ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে, তবে শুধু দুই দেশই নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়াই এর সুফল পাবে। প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের সামনে এখন এমন একটি সুযোগ এসেছে, যেখানে তিনি বাংলাদেশের মর্যাদা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাকে একসূত্রে গাঁথতে পারেন। একইভাবে ভারতেরও উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, নতুন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভাষা হবে সম্মান, সমতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভাষা। কেবল তাহলেই এই আমন্ত্রণ একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সৌজন্যের গণ্ডি পেরিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার নতুন সহযোগিতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কখনোই কেবল শাসকগোষ্ঠীর ইচ্ছার প্রতিফলন হতে পারে না; এটি হতে হবে জনগণের আকাক্সক্ষা, জাতীয় স্বার্থ এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সমন্বিত প্রকাশ। বাংলাদেশের মানুষ আজ এমন একটি বৈদেশিক সম্পর্ক চায়, যেখানে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু আত্মসমর্পণ থাকবে না; সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু নির্ভরশীলতা থাকবে না; সংলাপ থাকবে, কিন্তু আত্মমর্যাদার বিনিময়ে কোনো আপস থাকবে না। ভারত যদি সত্যিই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বন্ধু হতে চায়, তবে তাকে বাংলাদেশের জনগণের এ নতুন মানসিকতাকে সম্মান জানাতে হবে। কারণ, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক তখনই স্থায়ী হয়, যখন তার ভিত্তি জনগণের আস্থা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।

 ব্রিকস সম্মেলন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের সুযোগ নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনীতি বহুমেরুকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। নতুন বাণিজ্য করিডোর, জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং উন্নয়ন অর্থায়নের মতো বিষয়ে ব্রিকসের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উচিত আবেগ নয়, দূরদর্শী রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তা দিয়ে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করা। কারণ, ভবিষ্যতের বিশ্বে টিকে থাকবে সেই রাষ্ট্র, যে নিজের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বহুমুখী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারবে।

সমতার ভিত্তিতে নতুন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক : 

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পারস্পরিক সম্মান এবং বাস্তববাদী কূটনীতির ওপর। ইতিহাসের নানা জটিলতা সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে সংস্কৃতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং জনগণের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। কিন্তু এই সম্পর্কের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হলে উভয় পক্ষকেই অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। বাংলাদেশ যেমন একটি শক্তিশালী, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যেতে চায়, তেমনি ভারতেরও উচিত এ বাস্তবতাকে আন্তরিকভাবে স্বীকার করা। সমতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্কই ভবিষ্যতের দক্ষিণ এশিয়াকে আরও স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ করতে পারে।

জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি : 

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্র তখনই সফল হয়, যখন অভ্যন্তরীণভাবে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পররাষ্ট্রনীতি দলীয় প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। সীমান্ত নিরাপত্তা, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য বণ্টন, আঞ্চলিক বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির মতো বিষয়গুলোতে দৃঢ়, সুসংহত ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থানই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মান আদায় করতে হলে প্রথমেই নিজেদের অবস্থানকে সুস্পষ্ট, সুসংগঠিত এবং রাষ্ট্রকেন্দ্রিক করতে হবে।

নরেন্দ্র মোদীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানকে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা। তবে একটি আমন্ত্রণপত্র কখনোই সম্পর্কের চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; এটি কেবল একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন আন্তরিকতা, আস্থা, সমমর্যাদা এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি। আজকের বাংলাদেশ আর অতীতের বাংলাদেশ নয়। জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একটি নতুন জাতীয় চেতনা, নতুন আত্মবিশ্বাস এবং নতুন রাষ্ট্রীয় মনস্তত্ত্বের উন্মেষ ঘটেছে। এ বাস্তবতাকে সম্মান করেই ভবিষ্যতের ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নির্মিত হতে হবে। 

আমি বিশ্বাস করি, প্রতিবেশী হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সুসম্পর্ক শুধু দুই দেশের জন্য নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। কিন্তু সেই সম্পর্ক অবশ্যই হবে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক সম্মান, ন্যায়সঙ্গত সহযোগিতা এবং জনগণের আকাক্সক্ষার ভিত্তিতে। 

ইতিহাসের শিক্ষা হলো কূটনীতিতে স্থায়ী হয় না কোনো ব্যক্তি, কোনো সরকার বা কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ; স্থায়ী হয় জনগণের স্বার্থ এবং রাষ্ট্রের মর্যাদা। সেই উপলব্ধি থেকেই নতুন এ কূটনৈতিক অধ্যায়কে এগিয়ে নিতে হবে। তাহলেই ব্রিকসের এই আমন্ত্রণ ভবিষ্যতে কেবল একটি প্রোটোকল নয়, বরং বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে।

লেখক :  কলামিস্ট

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close