কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের ফুলছড়ি রেঞ্জে ‘হাতি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ’ বিষয়ক তিন দিনব্যাপী এক প্রশিক্ষণ কর্মশালা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে প্রশিক্ষণ কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য বন্যপ্রাণী ও বন রক্ষা হলেও সেখানে বহুল আলোচিত বন মামলার এক আসামিকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করায় স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
বনবিভাগ আয়োজিত ওই তিন দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো। এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ফুলছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আব্দুল কুদ্দুসসহ রেঞ্জের আওতাধীন বিভিন্ন বিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে একটি ছবিতে দেখা যায়, বনবিভাগের মামলার আসামি—খুটাখালী ইউনিয়নের বশির ড্রাইভারের ছেলে মোহাম্মদ আলী লিটনের হাতে বন কর্মকর্তারা সম্মাননা ও ভাতা (খাম) তুলে দিচ্ছেন। লিটনের বিরুদ্ধে বনের জায়গা দখল ও বন আইনে একাধিক মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও বনবিভাগের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে তার উপস্থিতি এবং প্রকাশ্যে কর্মকর্তাদের হাত থেকে সম্মাননা পাওয়ার দৃশ্য সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দা, বন বিভাগের নথি, থানায় দায়ের হওয়া মামলা এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে দেওয়া অভিযোগপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে মুরগির খামার, ফলের বাগানসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তুলছে। একই সঙ্গে স্ক্যাভেটর ও ড্রেজার বসিয়ে বনের ভেতর ও আশপাশের এলাকা থেকে বালি-মাটি উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
তবে তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন অভিযুক্ত লিটন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খুটাখালী ইউনিয়নের নরপাড়ি, গোদারপাড়ি, হরিখোলা ও কচুতলিয়া এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমির বিস্তীর্ণ অংশ জবরদখল করা হয়েছে। বনভূমিতে স্বাভাবিকভাবে জন্ম নেওয়া গাছপালা কেটে জমি সমতল করে সেখানে মুরগির খামার, ফলের বাগান এবং অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এতে একদিকে বন উজাড় হচ্ছে, অন্যদিকে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বন দখলের পাশাপাশি খুটাখালী ছড়া, খাল ও বসতভিটার আশপাশে দিন-রাত ড্রেজার ও স্ক্যাভেটর চালিয়ে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। এর ফলে ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে বসতবাড়ি, কৃষিজমি এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা।
প্রতিবেদকের হাতে আসা বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে মোহাম্মদ আলী লিটন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে একাধিক বন মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে হরিখোলা এলাকায় সংরক্ষিত বনে অবৈধভাবে প্রবেশ, বনভূমির আকৃতি পরিবর্তন, বালি উত্তোলন ও মাটি পাচারের অভিযোগে মোহাম্মদ আলী লিটন (৩৫) ও তার ভাই মো. ইব্রাহিমকে (৩২) আসামি করা হয়। গোদারপাড়ি এলাকায় বনভূমি পরিষ্কার করে জবরদখল, মাটি কেটে সমতল করা এবং মুরগির খামার নির্মাণের অভিযোগ আনা হয় একই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে। বনের জমি সমতল করে চাষাবাদের অভিযোগে মোহাম্মদ আলী লিটন, মো. ইব্রাহিম ও ইকবালকে আরও একটি মামলায় আসামি করা হয়।
এ ছাড়া কচুতলিয়া এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছ কেটে ফলের বাগান তৈরির মাধ্যমে বনভূমি দখলের অভিযোগে মোহাম্মদ আলী লিটন ও জালাল ড্রাইভারের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।
শুধু বন আইনের মামলাই নয়, গত ২৩ জুলাই চকরিয়া থানায় দায়ের হওয়া মামলায়ও মোহাম্মদ আলী লিটনসহ ৮ থেকে ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। মামলায় উল্লেখ করা হয়, জঙ্গল খুটাখালী মৌজায় জবরদখল করা বরই বাগানসংলগ্ন এলাকায় প্রবেশকে কেন্দ্র করে এক আইনজীবীর পরিবারের সদস্যদের ওপর সশস্ত্র হামলা, একটি বাছুর কুপিয়ে হত্যা এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
এদিকে গত ২৪ জুলাই খুটাখালী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে অভিযোগ করেন, মোহাম্মদ আলী লিটনের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি চক্র ড্রেজার ও স্ক্যাভেটর ব্যবহার করে মানুষের বসতভিটা ও খতিয়ানভুক্ত জমি থেকে জোরপূর্বক বালি ও মাটি উত্তোলন করছে।
এলাকাবাসীর একাংশের অভিযোগ, বন ধ্বংস ও বনের জমি দখলের পেছনে অসাধু বন কর্মকর্তাদের পরোক্ষ মদদ রয়েছে। তাদের দাবি, লিটনের মতো চিহ্নিত ব্যক্তিদের ব্যবহার করে বনের জমি থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, পাহাড় কাটা ও বনভূমির জায়গা কেনাবেচার কাজ চালানো হয়, যার একটি বড় অংশের সুবিধা যায় অসাধু কর্মকর্তাদের পকেটে।
খুটাখালী এলাকার বাসিন্দা আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইয়াসমিন আক্তার হ্যাপি এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বনের জমিতে অবৈধ খামারবাড়ি নির্মাণ, বালু উত্তোলনসহ এমন কোনো কাজ নেই, যা লিটন করে না। তার বিরুদ্ধে একাধিক বন মামলা চলমান থাকার পরও তাকে বনবিভাগের অফিশিয়াল ও গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে অতিথি বা প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়ে পুরস্কৃত করাটা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে ফুলছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আব্দুল কুদ্দুস জানান, অপরাধীদের সঠিক পথে ফেরানো এবং বন্যপ্রাণী রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “যেহেতু তারা এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাই তাদের সচেতন করতেই প্রশিক্ষণে আনা হয়েছিল।”
এ বিষয়ে বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো বলেন, ‘যদি তিনি বন মামলার আসামি হয়ে থাকেন, তবে সেটি আমার জানার বিষয় নয়। কারণ, এ কর্মসূচির আয়োজন করেছে স্থানীয় কমিটি। তবে তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন রয়েছে।’
তবে এই বিতর্কিত বিষয়ের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মারুফ হোসেনের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন ও বাসিন্দারা এ ঘটনার সঠিক তদন্ত দাবি করে বন রক্ষায় অপরাধীদের প্রশ্রয় না দিয়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
কেকে/ এমএস