চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এবার আন্ডারওয়্যারের ভেতর বিশেষভাবে তৈরি ক্যাপসুলে লুকিয়ে আনা প্রায় এক কোটি টাকার স্বর্ণ ধরা পড়ল। একজন ভারতীয় নাগরিক আটকও হন। এই ঘটনা নতুন কিছু নয়—গত এক দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও সীমান্ত দিয়ে কয়েকশ কেজি স্বর্ণ জব্দ হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই একই চিত্র দেখা যায়: ধরা পড়েন কেবল বহনকারী, যাকে বলা হয় ‘চুনোপুঁটি’; আর প্রকৃত অর্থদাতা, সংগঠক ও সিন্ডিকেটের হোতারা—যাদের বলা হয় ‘রাঘববোয়াল’—থেকে যান আইনের নাগালের বাইরে। এই পুনরাবৃত্তি আমাদের ভাবিয়ে তোলে, রাষ্ট্রের নজরদারি ব্যবস্থা আসলে কতটা কার্যকর, নাকি তা কেবল প্রতীকী শাস্তির মহড়ায় পরিণত হয়েছে।
স্বর্ণ চোরাচালান একটি সংগঠিত, বহুস্তরীয় ও আন্তর্জাতিক অপরাধ-অর্থনীতির অংশ। বিদেশে অবস্থানকারী অর্থদাতা, স্থানীয় সংগ্রহকারী এজেন্ট, ক্যারিয়ার, বিমানবন্দরের বাইরের রিসিভিং নেটওয়ার্ক, অবৈধ গলনচক্র এবং হুন্ডি সিন্ডিকেট—এই পুরো শৃঙ্খলে যিনি সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে থাকেন, বিমানবন্দরে ধরা পড়েন তিনিই। আইনি কাঠামোও এই বাস্তবতাকে প্রশ্রয় দেয়—আটক ব্যক্তিকেই সাধারণত প্রধান আসামি করা হয়, আর প্রকৃত হোতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুবই বিরল। ক্যারিয়াররা প্রায়ই জানেনও না, তাঁদের প্রকৃত নিয়োগকর্তা কে। এনক্রিপটেড যোগাযোগ ও মধ্যস্থতাকারীর আড়ালে গোটা অপারেশন পরিচালিত হয়। ফলে তদন্ত থেমে যায় সবচেয়ে দুর্বল সূত্রেই, আর অপরাধের মূল শিকড় অক্ষত থেকে যায়।
এই ব্যর্থতার দায় কেবল কাস্টমস বা গোয়েন্দা সংস্থার ওপর চাপিয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু বাস্তবতা আরও গভীর। দেশে স্বর্ণের উচ্চ চাহিদা, বৈধ আমদানিতে তুলনামূলক বেশি শুল্ক-কর, দুর্বল সীমান্ত তদারকি এবং হুন্ডির মাধ্যমে সহজ অর্থ স্থানান্তর—এসব মিলিয়ে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক স্বর্ণ পাচার চক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুটে। এর ফল কেবল রাজস্ব ক্ষতি নয়। বৈধ স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন, হুন্ডি লেনদেন বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে, মানি লন্ডারিংয়ের পরিসর বিস্তৃত হয় এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই অবৈধ অর্থনীতি মাদক ও অস্ত্রপাচারের মতো অন্যান্য আন্তঃদেশীয় অপরাধের অর্থায়নের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়তে পারে।
প্রশ্ন হলো, কেবল স্ক্যানার বসিয়ে বা তল্লাশি বাড়িয়ে কি এই সমস্যার সমাধান সম্ভব? বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা বলছে, না। যতক্ষণ পর্যন্ত তদন্ত বিমানবন্দরে ধরা পড়া ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
এই বাস্তবতায় আমরা মনে করি, নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো অবিলম্বে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। প্রতিটি জব্দ চালানের ক্ষেত্রে বাহকের পাশাপাশি অর্থদাতা, গ্রহণকারী ও মধ্যস্থতাকারীদের আর্থিক ও যোগাযোগসূত্র অনুসন্ধান করে মামলার পরিধি বিস্তৃত করতে হবে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারতসহ উৎস দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত ও তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথ তদন্তের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। হুন্ডি নেটওয়ার্ক ভাঙতে ব্যাংকিং চ্যানেলে অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্তকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। বৈধ স্বর্ণ আমদানিতে শুল্ক-কর কাঠামো পুনর্বিবেচনা করে অবৈধ পথে আমদানির প্রণোদনা কমাতে হবে। বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে শুধু প্রযুক্তিনির্ভর তল্লাশি নয়, ঝুঁকিভিত্তিক গোয়েন্দা-নির্ভর পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি চালু করতে হবে, যাতে বাহক শনাক্তের পাশাপাশি পুরো নেটওয়ার্কও শনাক্ত করা সম্ভব হয়। আইন সংশোধন করে কেবল বাহক নয়, প্রমাণিত অর্থদাতা ও সংগঠকদের জন্য কঠোরতর ও সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে।
স্বর্ণ চোরাচালান কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়—এটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও দায়বদ্ধতার ঘাটতির প্রতিফলন। যতদিন কেবল ‘চুনোপুঁটি’ ধরা পড়া উদযাপনের বিষয় হয়ে থাকবে আর ‘রাঘববোয়াল’ থেকে যাবে প্রশ্নাতীত, ততদিন এই চক্র থামবে না। রাষ্ট্রের প্রকৃত সদিচ্ছার পরীক্ষা এখানেই—বাহকের বাইরে গিয়ে নেটওয়ার্কের মূল শিকড়ে পৌঁছাতে পারা।
কেকে/ এমএস