মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬,
২০ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: বুধবার জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী      জ্বালানি সংকট নিরসনে তিন নির্দেশনা      আবারও পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় বাংলাদেশ      সরকারকের চাপে ফেলতে নানা মহলের তৎপরতা      হরমুজে ইরানকে জাহাজ থেকে ফি আদায় করতে দেবো না: ট্রাম্প      সমালোচনার মুখে পিছু হটল বিদ্যুৎ বিভাগ      গুমে শাস্তি যাবজ্জীবন, মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
গ্যাস সংকটের পুনরাবৃত্তি কেন?
ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৩ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় জ্বালানি খাতের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। শিল্পায়ন, নগরায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা, কৃষি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন—সব ক্ষেত্রেই প্রাকৃতিক গ্যাস একটি প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। তাই গ্যাস সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও জাতীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর যে সংকট শুরু হয়েছে, তা কেবল একটি সাময়িক প্রযুক্তিগত বিভ্রাট নয়; বরং এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতার গভীর দুর্বলতাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ)-এ অগ্নিকাণ্ডের ফলে এর একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার কারণে টার্মিনালটির কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়। এতে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ আগের গড় প্রায় ২,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) থেকে নেমে ২,১৫০ এমএমসিএফডির নিচে চলে আসে, যেখানে জাতীয় দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ এমএমসিএফডি। অগ্নিকাণ্ডের কারণে টার্মিনালের দুটি বয়লারের একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, ফলে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যায়। এলএনজি বর্তমানে দেশের দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ যোগান দেয়। অগ্নিকাণ্ডের আগে এলএনজি থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় ১.০৫ বিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ হতো, কিন্তু ঘটনার পর এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ নেমে আসে মাত্র ৫৬০ মিলিয়ন ঘনফুটে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, এই বিপর্যয়ের প্রভাব বিদ্যুৎ খাতেও পড়েছে—গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১,৫০০ মেগাওয়াট কমে গেছে, যা ব্যাপক লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

মেরামতকাজে জটিলতাও কম নয়। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের চিঠি অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে বয়লার-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কেবল ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হচ্ছে। ফিনল্যান্ড, স্পেন ও তুরস্ক থেকে প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায়, বিষয়টি সহজ কোনো মেরামতের পর্যায়ে নেই—আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সচল রাখতে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রকৃত সমস্যা কেবল একটি টার্মিনালের ত্রুটি নয়। গত ছয় বছরে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট, আর সেই ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। ফলে দুটি ভাসমান টার্মিনালের যে কোনো একটিতে সমস্যা দেখা দিলেই পুরো জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থা চাপে পড়ে যাচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ার কারণেই আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, স্থলভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণ এবং বিকল্প সরবরাহ সক্ষমতা তৈরি না করলে এই সংকট ভবিষ্যতেও ফিরে আসবে।

এই কাঠামোগত দুর্বলতার পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘ ইতিহাস। মাত্র দুই দশক আগেও দেশের জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগ পূরণ হতো নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাস থেকেই। কিন্তু ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানি শুরু করে এবং কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতিতে পরিণত হয়। এই রূপান্তর একদিকে সাময়িক চাহিদা মিটিয়েছে, অন্যদিকে দেশকে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির কাছে অরক্ষিত করে তুলেছে।

এলএনজি আমদানি এখন আর কেবল কারিগরি বিষয় নয়—এর আর্থিক বোঝাও ক্রমবর্ধমান। বাংলাদেশ প্রতিবছর গ্যাস সংকট মোকাবিলায় আনুমানিক ৪৫ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করছে। দ্য ডেইলি স্টার-এর একটি প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, দেশীয় উৎপাদন কমতে থাকায় সরকার আরও বেশি ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির প্রস্তুতি নিচ্ছে। নতুন ভাসমান টার্মিনাল ভাড়া এবং মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ ও ভর্তুকির বোঝা—উভয়ই বাড়বে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামার ঝুঁকিও বাড়বে।

গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের একটি প্রতিবেদনও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, স্বল্পমেয়াদে সস্তা মনে হওয়া এলএনজি প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় ঝুঁকি বহন করে। জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস অবকাঠামো-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো আগামী কয়েক দশকের জ্বালানি কাঠামোর গতিপথ নির্ধারণ করে দিতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সহায়ক পাইপলাইন অবকাঠামো সম্প্রসারণে ব্যর্থতা এলএনজি খাতের উন্নয়নকে থমকে দিতে পারে।

সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে গৃহস্থালি ও পরিবহন খাতে। ঢাকার মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসিন্দারা কম গ্যাসচাপের কারণে ইটের অস্থায়ী চুলায় রান্না করতে বাধ্য হচ্ছেন। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। ঢাকার মগবাজার, সাতরাস্তা, মিরপুর ও পরীবাগে চালকদের দুই থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে বলে জানা গেছে। আর তেজগাঁও, মালিবাগ ও মতিঝিলের কিছু স্টেশন সাময়িকভাবে সিএনজি বিক্রি বন্ধ রেখেছে। একজন পিকআপ চালকের ভাষ্য থেকে বোঝা যায়, আগে যেখানে একবারে ট্যাংক ভরানো যেত, এখন দীর্ঘ অপেক্ষার পরও সামান্য গ্যাস মিলছে, যা তাঁদের সময় ও আয়—উভয়ই কমিয়ে দিচ্ছে।

শিল্প খাতের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দেশের তৈরি পোশাক, সিরামিক, কাচ, স্টিল, সার ও টেক্সটাইল শিল্প নিয়মিত গ্যাস সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চালানো যায় না এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য এই সংকট আরও কঠিন বাস্তবতা। বড় প্রতিষ্ঠান কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ পেলেও ছোট প্রতিষ্ঠানের সে সক্ষমতা থাকে না।

সংকট মোকাবিলায় সরকার একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে, যা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি—উভয় ধরনের প্রচেষ্টার প্রতিফলন। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সম্প্রতি মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত স্থাপনের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। চীনের প্রতিষ্ঠান সিএনইই-এর প্রস্তাবিত এই প্রকল্প সরকার-থেকে-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হবে, যা বিদ্যমান দুটি এফএসআরইউয়ের ওপর একচেটিয়া নির্ভরতা কমানোর একটি পদক্ষেপ।

উপরের বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট, বর্তমান সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত ঝুঁকির বহিঃপ্রকাশ। মহেশখালীর অগ্নিকাণ্ড আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও সতর্কবার্তা। এটি আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, দেশীয় উৎপাদন হ্রাস এবং আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধির এই দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বদলাতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে। অন্যদিকে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, দেশীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার, বিকল্প জ্বালানির উন্নয়ন এবং শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ একটি নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে। সেই লক্ষ্যেই এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার।

লেখক : কলামিস্ট

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close