গোটা বিশ্ব তাকিয়ে আছে একটি দেশের দিকে। মনে হচ্ছে, পৃথিবী মানেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আসলেই কি তাই? অরাজকতা, অন্যায়, অত্যাচার থেকে শুরু করে ভালো-মন্দ—সব কিছুরই প্রভাব রয়েছে সেখানে। আবার অনেকে ঠিক সেই দেশ থেকেই মহাশূন্যে পাড়ি দিচ্ছেন। চমৎকার। প্রশ্ন হচ্ছে, কী এমন জাদু রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের? চীনও কিন্তু একটি জনবহুল দেশ।
এটা সত্য যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাকস্বাধীনতা এবং গণতন্ত্র বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। যদিও চীন বা রাশিয়া শক্তিশালী অর্থনীতি এবং সামরিক ক্ষমতা রাখে, তাদের গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবের কারণে তারা বিশ্বের কাছে আমেরিকার মতো আকর্ষণীয় হতে পারেনি। মানুষ হিসেবে নতুন কিছু দেখার এবং উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র তার গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার উদাহরণ দিয়ে অন্য দেশের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের ওপর আবারও হামলা চালিয়েছে। এ পরিস্থিতি দেখে যে কেউ ভাবতে পারেন, হয়তো অনেক আগেই তাদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। অথচ মাত্র এক মাস আগেই তারা ইসলামাবাদ সমঝোতা নামে একটি চুক্তিতে সই করেছিল। সেই চুক্তির লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ শেষ করার প্রক্রিয়া শুরু করা এবং চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য ৬০ দিনের সময় নির্ধারণ করা। বাস্তবতা হলো, সেই চুক্তির পর খুব অল্প সময়ই পেরিয়েছে। কিন্তু এত বেশি কথার লড়াই, হুমকি ও পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে যে, যুদ্ধটি যেন বারবার শুরু ও শেষ হয়েছে বলে মনে হয়।
একই ধরনের বক্তব্য, একই ধরনের দাবি, একই ধরনের প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে এক ধরনের ক্লান্তিকর নাটক তৈরি হয়েছে। কখনো বলা হচ্ছে যুদ্ধ শেষ, আবার বলা হচ্ছে যুদ্ধ চরমে। কখনো ইরানিদের সাহসী বলা হচ্ছে, আবার কখনো তাদের নেতাদের গালমন্দ করা হচ্ছে। কখনো বলা হচ্ছে তারা যুদ্ধবিরতি চায় না, আবার বলা হচ্ছে তারা সেটির জন্য অনুরোধ করছে।
হরমুজ প্রণালি কখনো খোলা, কখনো বন্ধ, আবার কখনো আংশিক খোলা বলা হচ্ছে। পুরো বিশ্ব যেন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের কাছে বন্দি হয়ে গেছে, যে রাষ্ট্র তার সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করছে ব্যক্তিগত অহংকার ও অজ্ঞতার জন্য। এ যুদ্ধ শুরু হয়েছিল কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হওয়ার আশা নিয়ে। কিন্তু এখন তা ছয় মাসে প্রবেশ করছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের ওপর বড় আকারে বিমান হামলা বাড়িয়েছে। ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। হুতি গোষ্ঠী আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অবরোধ ঘোষণা করেছে। এ কারণে যুদ্ধ এখন উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
এ অবস্থায় ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে গেছে। ইরান এখন বুঝে গেছে, হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ একটি বড় কৌশলগত শক্তি। এ শক্তি হাতে রেখে তারা সহজে যুদ্ধ শেষ করবে না। আবার ট্রাম্পও এ অবস্থায় যুদ্ধ শেষ করতে পারছেন না। ট্রাম্প যদি শুধু আগের অবস্থায় ফিরে যান, তাতেও তাঁর অবস্থান দুর্বল হবে। আবার পুরোপুরি যুদ্ধেও নামতে পারছেন না। কারণ, স্থলযুদ্ধ হলে তা দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী হবে।
এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ জন সেনা নিহত হয়েছেন। কিন্তু পেন্টাগন এ সংখ্যা কম দেখানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এরপর কী? বাস্তবতা হলো, ইতোমধ্যে এত খরচ ও ক্ষতি হয়েছে যে, যুদ্ধ থামানোর বদলে আরও বেশি অর্থ ও প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। এখন পেন্টাগন আরও ৬৭ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে। হোয়াইট হাউসের বাজেট প্রস্তাব দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এ বিশাল ব্যয়ের কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ খাতে ব্যয় কমে যাবে। এ যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এতে ইরানের শিশু, সাধারণ মানুষ ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়ছে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। বিশ্বজুড়ে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি খরচ বাড়ছে, সরকারের বাজেটে চাপ তৈরি হচ্ছে। এমন অস্থির সময়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার কথা। কিন্তু ট্রাম্প তাঁর পুরোনো শুল্কনীতি শেষ হওয়ার পর নতুন শুল্ক আরোপ করেছেন। তাঁর দাবি, অন্যান্য দেশ জোরপূর্বক শ্রমের বিরুদ্ধে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। অনেকের কাছে এ যুক্তি হাস্যকর মনে হতে পারে। কারণ, ট্রাম্প প্রশাসনের এমন নৈতিক উদ্বেগ রয়েছে বলে বিশ্বাস করা কঠিন।
এ পরিস্থিতিতে কোনো ভর্তুকি বা মূল্যনিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়। কারণ, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন ও উৎপাদনের কেন্দ্রে যে ধাক্কা লেগেছে, তা সামাল দেওয়া সহজ নয়। ট্রাম্প এখন এই যুদ্ধ থেকে বের হতে পারছেন না। শান্তির মূল্য তিনি দিতে পারছেন না। আর তাঁর এই অক্ষমতার খেসারত দিচ্ছে পুরো বিশ্ব।
ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ কখনো তীব্র হচ্ছে, কখনো আবার খানিকটা থেমে যাচ্ছে। কিন্তু ওঠানামার এ আবহের মধ্যেও যে প্রবণতাটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, সেটি হলো—এ সংঘাত থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে চীন। এ যুদ্ধে বেইজিংকে একটি গুলিও চালাতে হয়নি, বিপুল অর্থ খরচ করতে হয়নি, এমনকি বিশেষ রাজনৈতিক ঝুঁকিও নিতে হয়নি। অথচ গত তিন দশকের মধ্যে এ সংকট থেকেই তারা সবচেয়ে বেশি কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে।
এ যুদ্ধ চীনের দীর্ঘদিনের লক্ষ্যকে দ্রুত এগিয়ে দিয়েছে। যেমন: এমন একটি মধ্যপ্রাচ্য, যা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কম নির্ভরশীল; এমন একটি বিশ্ব, যা চীনের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল; এবং বেইজিংকে একটি স্থির, পরিমিত ও দায়িত্বশীল বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। চীন কখনোই সরাসরি ওয়াশিংটনের জায়গা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে চায়নি। কারণ, তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাদের লক্ষ্য বরং অনেক সহজ ও সূক্ষ্ম। সেটি হলো, উপসাগরীয় দেশগুলোকে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয় থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে আনা।
এই কাজই বাস্তবে অনেকটা করে দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড চীনের নেতা সি চিন পিংয়ের কৌশলগত লক্ষ্যকে এগিয়ে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলো লক্ষ করেছে, ওয়াশিংটন এই যুদ্ধ পরিচালনা করছে বিশৃঙ্খলভাবে। তারা খেয়াল করছে, তাদের শহর, অবকাঠামো ও অর্থনীতির ক্ষতির দিকে যুক্তরাষ্ট্র তেমন কোনো গুরুত্ব না দিয়ে যুদ্ধ চালাচ্ছে। এ কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এখন ধীরে ধীরে দুই ভাগে বিভক্ত হচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ক্রমেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু সৌদি আরবের নেতৃত্বে কাতার, ওমান, এমনকি ইরাক ও তুরস্কও এমন এক ভারসাম্য খুঁজতে পারে, যেখানে তারা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সংলাপ চালাবে এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করবে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য, জোট ও বিশ্বাসযোগ্যতার যে ক্ষতি হয়েছে, তার তুলনায় চীনই শেষ পর্যন্ত এগিয়ে রয়েছে। এটাই আসলে সেই আঞ্চলিক কাঠামো, যা চীন দীর্ঘদিন ধরে চেয়েছে।
২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়। এরপর রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কিছু ডেটা সেন্টার ও চিপ প্রকল্পে যোগ দিতে অনাগ্রহ দেখায়। চীনের আরেকটি বড় সাফল্য এসেছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। প্রথমে মনে হতে পারে, যে দেশ তার তেলের প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানি করে, সে এই যুদ্ধের বড় ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ হবে। কিন্তু বাস্তবে চীন এ ধাক্কা অন্য অনেক দেশের তুলনায় ভালোভাবে সামাল দিয়েছে। কারণ, তারা বহু বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিল। তারা তেলের উৎসে বৈচিত্র্য এনেছে। তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুত গড়ে তুলেছে বলে ধারণা করা হয়। তারা কয়লার ব্যবহার চালিয়ে গেছে, পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে এবং এমনভাবে অর্থনীতিকে বিদ্যুৎনির্ভর করেছে, যা অন্য কোনো বড় দেশ পারেনি।
বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো এখন সৌরশক্তি, ব্যাটারি, বায়ুশক্তি, বৈদ্যুতিক যান এবং বিদ্যুৎ গ্রিডে বিনিয়োগ বাড়াতে চাইছে। সৌর প্যানেল উৎপাদনে চীনের দখল প্রায় ৯১ শতাংশ, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনে প্রায় ৮৯ শতাংশ। ব্লুমবার্গ-এর তথ্য অনুযায়ী, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির প্রায় সব ক্ষেত্রেই অন্তত ৭০ শতাংশ উৎপাদন চীনা সংস্থাগুলোর। জ্বালানি অনিশ্চয়তা যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, বিশ্ব তত বেশি চীনের আধিপত্যশীল শিল্পগুলোর দিকে ঝুঁকবে।
সবশেষে রয়েছে ভাবমূর্তির বিষয়। ট্রাম্প প্রশাসন এই যুদ্ধে নেমেছিল বড় বড় লক্ষ্য নিয়ে। ইরানে শাসন পরিবর্তন, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নষ্ট করা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের দুর্বল করা ছিল ট্রাম্পের লক্ষ্য। কিন্তু স্থায়ীভাবে তারা এসবের কিছুই অর্জন করতে পারেনি। এখন তারা শুধু হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার চেষ্টা করছে, যা কিনা যুদ্ধের আগেও খোলা ছিল।
এ যুদ্ধ ট্রাম্প নিজেই বেছে নিয়েছিলেন। এ কারণে কয়েকশ কোটি ডলার খরচ হয়েছে, বিপুল অস্ত্র নষ্ট হয়েছে, এশিয়া থেকে সামরিক মনোযোগ সরে গেছে, মিত্রদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং প্রমাণ হয়েছে যে, কৌশল ভুল হলে এবং সিদ্ধান্তে অস্থিরতা থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশও কাঙ্ক্ষিত ফল পায় না।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে
কেকে/ এমএস