অতিসম্প্রতি দেশে পরিচালিত ভেজালবিরোধী অভিযানে একটি অত্যন্ত গা-শিউরে-ওঠা তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। যা দেশের বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেমন সকালের দাঁত মাজার টুথপেস্ট কিংবা দুপুরের রান্নায় ব্যবহৃত সয়াবিন তেলে অকল্পনীয় মাত্রায় ক্ষতিকর প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এ খবর কেবল খাদ্যে ভেজালের আরেকটি সাধারণ চিত্র নয়; বরং এটি আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্যের ওপর এক বিরাট সতর্কবার্তা। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমরা অজান্তেই যেসব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহার করছি, তার মাধ্যমেই প্রতিনিয়ত শরীরে প্রবেশ করছে এক অদৃশ্য বিষ। এ পরিস্থিতি আমাদের সাধারণ জীবনযাত্রাকে এখন এক গভীর সংশয়ের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
প্লাস্টিক দূষণ বললেই একসময় আমাদের চোখে ভাসত নদীর জলে ভেসে থাকা পলিথিন কিংবা ড্রেনে জমে থাকা প্লাস্টিকের বোতলের ছবি। কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা জানতে পারছি, এ প্লাস্টিক বর্জ্য শুধু পরিবেশের দৃশ্যমান ক্ষতিই করছে না; বরং তা ক্ষুদ্র থেকে অতিক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে মিশে যাচ্ছে আমাদের পরিবেশ, বায়ু এবং খাদ্যশৃঙ্খলে। পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট আকারের এই প্লাস্টিক কণাকে বলা হয় মাইক্রোপ্লাস্টিক। যখন এ প্লাস্টিক আরও ভেঙে ন্যানোমিটার আকারে নেমে আসে, তখন তা অতি সহজেই জীবদেহের কোষের ভেতরের দেয়ালে প্রবেশ করার সক্ষমতা অর্জন করে। বাজার থেকে কেনা চকচকে বোতলের তেল কিংবা সুবাসিত টুথপেস্টে যখন এ মারাত্মক রাসায়নিক উপাদান পাওয়া যায়, তখন বুঝতে হবে, বিপদ আর ঘরের বাইরে নেই; তা আমাদের ডাইনিং টেবিল এবং বেসিনে পৌঁছে গেছে।
মানবদেহে এ ক্ষতিকর কণাগুলোর প্রবেশ কীভাবে ঘটছে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া। পরিবেশ থেকে সমুদ্রে বা মাটিতে পড়া প্লাস্টিক রোদের আলো, তাপ ও বাতাসের চাপে ধীরে ধীরে খণ্ডবিখণ্ড হয়। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় নিম্নমানের প্লাস্টিক কনটেইনারের ব্যবহার, মোড়কজাতকরণের অসাবধানতা কিংবা যান্ত্রিক ঘর্ষণের ফলে রান্নার তেল বা টুথপেস্টের মতো তরল ও পেস্টজাতীয় জিনিসে এটি অতি সহজেই মিশে যাচ্ছে। টুথপেস্ট ব্যবহারের সময় মুখে থাকা সূক্ষ্ম রক্তনালির মাধ্যমে অথবা ভুলবশত গিলে ফেলার কারণে কণাগুলো সরাসরি পাকস্থলীতে যাচ্ছে। অন্যদিকে সয়াবিন তেলে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক তাপে গলে তেলের সঙ্গে মিশে গিয়ে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যের মাধ্যমে পাকস্থলী ও অন্ত্রে পৌঁছে যাচ্ছে।
শরীরে প্রবেশের পর এই ক্ষুদ্র কণাগুলো এক ভয়ানক তাণ্ডব শুরু করে। এগুলো রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়ে দেহের এক অঙ্গ থেকে অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের যকৃৎ, ফুসফুস, কিডনি, এমনকি মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহেও পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। অতি সম্প্রতি গর্ভবতী মায়ের প্লাসেন্টা (ফুল) এবং মায়ের বুকের দুধের মধ্যেও এ উপাদানের অস্তিত্ব মিলেছে, যা অনাগত ও সদ্যজাত শিশুদের জন্যও মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হয়েছে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এই কণাগুলো রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে রক্তনালিতে প্রদাহ তৈরি করতে পারে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হতে পারে হৃদরোগ বা স্ট্রোক।
পাকস্থলী ও অন্ত্রের ওপর মাইক্রোপ্লাস্টিকের নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে আশঙ্কাজনক। হজম প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত অঙ্গগুলোতে এগুলো জমে থেকে সেলুলার ক্ষয়ক্ষতি তৈরি করে। মানবদেহের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে হজমশক্তি নষ্ট করার পাশাপাশি এটি গ্যাস্ট্রিক ও অন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের জন্য দায়ী। দিনের পর দিন টুথপেস্ট ও খাবারের তেল থেকে পেটে যাওয়া এ কণাগুলো পরিপাকতন্ত্রে ঘা বা আলসার তৈরি করতে পারে, যা পরবর্তীতে জটিল কোলন ক্যানসারে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ক্ষুদ্র এ কণাগুলোর ভেতরে থাকে থ্যালেটস, বিসফেনল-এ-র মতো ক্ষতিকর বিষাক্ত রাসায়নিক যৌগ, যা হরমোন নিঃসরণে বাধা দেয়। এগুলো মানবদেহের এন্ডোক্রাইন সিস্টেম বা হরমোন গ্রন্থির সঠিক কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। ফলে স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া থেকে শুরু করে থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিস এবং প্রজননক্ষমতার মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়। নারী ও পুরুষের বন্ধ্যাত্বের একটি বড় কারণ হিসেবেও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন এ প্লাস্টিক দূষণকে অভিযুক্ত করছে। রাসায়নিক পদার্থের নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতির কারণে শরীরের স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ে। ফলে মানুষ ঘন ঘন নানা অজানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়।
সাম্প্রতিক অভিযানে টুথপেস্ট ও ভোজ্যতেলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়ার পর এটি স্পষ্ট যে, আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে বিদ্যমান খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ দুর্বল। এ বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে বাঁচার জন্য তাৎক্ষণিক এবং সুদূরপ্রসারী—উভয় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। সর্বপ্রথম প্রয়োজন কঠোর আইনি তদারকি। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্রসাধনী শিল্পে প্লাস্টিকের সংস্পর্শ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের বোতল বা মোড়ক ব্যবহার করছে এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় প্লাস্টিক কণামুক্ত খাদ্য ও প্রসাধনী নিশ্চিত করতে পারছে না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। ভেজালবিরোধী অভিযান কেবল বিশেষ দিনে সীমিত না রেখে প্রতিদিনের তদারকির অংশ করে তুলতে হবে।
উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাচের বোতল বা উচ্চমানের ধাতব (মেটাল) কনটেইনার ব্যবহারের দিকে উৎসাহিত করতে হবে। তেল বা টুথপেস্টের প্রক্রিয়াজাতকরণে যাতে কোনো ধরনের প্লাস্টিকের ফিল্টার বা ক্ষতিকর পাইপলাইন ব্যবহার করা না হয়, সে-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি ও প্রয়োগ বাধ্যতামূলক করা আবশ্যক। এ ছাড়া বাজারে বিক্রির আগে পণ্যের প্লাস্টিক কণা পরীক্ষা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক-ফ্রি সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হলে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়েও আমাদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বাজার থেকে খাবার কেনার সময় প্লাস্টিকের বোতল বা মোড়কজাত তেলের বদলে কাচের বোতল বা ঐতিহ্যগতভাবে ঘানিতে ভাঙা নিরাপদ তেলের ব্যবহারের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। টুথপেস্ট ক্রয়ের ক্ষেত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকমুক্ত প্রাকৃতিক প্রসাধনী বা ভেষজ বিকল্পের দিকে জোর দেওয়া যেতে পারে। রান্নাঘরের প্লাস্টিকের সামগ্রী, যেমন প্লাস্টিকের বাটি, চামচ ও কাটিং বোর্ড পুরোপুরি বর্জন করা উচিত। গরম খাবার কখনোই প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা বা প্লাস্টিকের পাত্রে মাইক্রোওয়েভে গরম করা ঠিক নয়। কারণ, অতিরিক্ত তাপে প্লাস্টিক গলে তরলে মিশে যায়।
বাসাবাড়িতে খাবার পানি ফুটানোর পর উন্নতমানের ফিল্টার ব্যবহার করা কিংবা কাচের পাত্রে পানি সংরক্ষণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। দৈনন্দিন জীবনে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বা সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিকের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার মানসিকতা গড়ে তোলা না গেলে এই সংকটের সমাধান করা প্রায় অসম্ভব। প্রাকৃতিক তন্তু, যেমন সুতি, পাট বা কাচের তৈরি জিনিসপত্রের ব্যবহার বাড়ালে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সামগ্রিক উৎপাদন এবং শরীরে গ্রহণের মাত্রা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, পরিবেশ এবং মানবস্বাস্থ্য একে অপরের পরিপূরক। আমরা যেভাবে পরিবেশকে প্লাস্টিক দিয়ে দূষিত করেছি, প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে সেই বিষই এখন খাদ্য ও প্রসাধনীর মোড়কে আমাদের শরীরে ফিরে আসছে। তেলের বোতল ও টুথপেস্টে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি নিশ্চিতভাবেই একটি লাল সংকেত। এই লাল সংকেতকে অবহেলা করলে আগামী প্রজন্মকে আমরা এক পঙ্গু ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধিগ্রস্ত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেব। রাষ্ট্রীয় তদারকি, কঠোর আইন প্রয়োগ, শিল্পমালিকদের দায়িত্বশীলতা এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের সচেতনতাই কেবল পারে আমাদের এই অদৃশ্য বিষের হাত থেকে রক্ষা করতে। আজই যদি প্লাস্টিকের ওপর আমাদের অতিরিক্ত নির্ভরতা না কমাই এবং খাদ্যনিরাপত্তায় কঠোর অবস্থান না নিই, তবে নীরবে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। নিজেদের বাঁচানোর খাতিরেই এখনই সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার উপযুক্ত সময়।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ততা আজ আর কেবল পরিবেশবিদদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি আমাদের অন্ত্র, রক্তপ্রবাহ এবং সার্বিক অস্তিত্বের ওপর এক প্রত্যক্ষ হুমকি। নিত্যদিনের খাবার তেল বা টুথপেস্টের মতো অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রীতে এই ক্ষতিকর কণার উপস্থিতি আমাদের পুরো খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবনযাত্রাকে এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই নীরব ঘাতকের আক্রমণ থেকে বাঁচতে হলে কেবল আইনের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে চলবে না; বরং রাষ্ট্রীয় কঠোর তদারকির পাশাপাশি ব্যক্তিগত অভ্যাসেও আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।
প্লাস্টিকের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে কাচ, ধাতু (মেটাল) বা প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়াই এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে প্রসাধনী ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে প্লাস্টিকের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে। আমাদের মনে রাখা জরুরি, সুস্থ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গঠনের দায়িত্ব আমাদের সবার। আজ যদি আমরা প্লাস্টিকমুক্ত জীবনযাপনের অঙ্গীকার না করি এবং সময়মতো কঠোর পদক্ষেপ না নিই, তবে এই অদেখা প্লাস্টিক-দানব খুব দ্রুতই আমাদের আগামী প্রজন্মকে এক অসুস্থ ও পঙ্গু ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
কেকে/ এমএস