মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬,
২০ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় জোর প্রধানমন্ত্রীর      ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগ বন্ধ      বুধবার জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী      জ্বালানি সংকট নিরসনে তিন নির্দেশনা      আবারও পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় বাংলাদেশ      সরকারকের চাপে ফেলতে নানা মহলের তৎপরতা      হরমুজে ইরানকে জাহাজ থেকে ফি আদায় করতে দেবো না: ট্রাম্প      
দেশজুড়ে
২৬ হাজার প্লাস্টিকের বোতলে অটোরিকশাচালকের স্বপ্নের বাড়ি
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ৩:২২ পিএম
ছবি : প্লাস্টিকের বোতলে তৈরি বাড়ি

ছবি : প্লাস্টিকের বোতলে তৈরি বাড়ি

যে প্লাস্টিকের বোতল একবার ব্যবহার শেষে ডাস্টবিন, ড্রেন কিংবা নদীতে গিয়ে বছরের পর বছর পরিবেশ দূষণের কারণ হয়, সেই পরিত্যক্ত বোতলই গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে রূপ নিয়েছে এক ব্যতিক্রমী বাড়িতে। ইটের বদলে বালুভর্তি প্লাস্টিকের বোতল, সিমেন্টের গাঁথুনি এবং অভিনব নির্মাণশৈলীতে তৈরি হয়েছে তিন কক্ষবিশিষ্ট একটি আধাপাকা বাড়ি। স্থানীয়দের কাছে এটি এখন ‘বোতলবাড়ি’ নামে পরিচিত। প্রতিদিনই কৌতূহলী মানুষ ভিড় করছেন ব্যতিক্রমী এই বাড়িটি দেখতে।

বাড়িটির নির্মাতা উপজেলার ছাপড়হাটী ইউনিয়নের খানপাড়া গ্রামের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক আবদুল হাকিম (৩৩)। সীমিত আয়ের একজন সাধারণ মানুষ হয়েও নিজের সৃজনশীল চিন্তা, ধৈর্য ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে তিনি গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রমী এই স্থাপনা। এখন তার বাড়ি দেখতে শুধু গাইবান্ধা নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ আসছেন। কেউ নির্মাণকৌশল জানতে চান, কেউ ছবি তোলেন, আবার কেউ ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ছোট্ট খানপাড়া গ্রামটি যেন নতুন এক পরিচিতি পেয়েছে এই ‘বোতলবাড়ি’কে ঘিরে।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পাকা সড়কের পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটি। দূর থেকে এটি সাধারণ টিনের ঘর মনে হলেও কাছে গেলেই চোখে পড়ে দেয়ালের ভেতরে সারিবদ্ধভাবে বসানো হাজার হাজার প্লাস্টিকের বোতল। নানা রঙের বোতলের নকশা, সবুজ টিনের ছাউনি এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বাড়িটিকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। প্রায় সারাদিনই সেখানে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে থাকে।

আবদুল হাকিম জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি ভিন্নধর্মী কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন। কয়েক বছর আগে ইউটিউবে বিদেশের বিভিন্ন দেশে প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে নির্মিত পরিবেশবান্ধব বাড়ির ভিডিও দেখে তার মাথায় একই ধরনের একটি বাড়ি নির্মাণের ভাবনা আসে। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ প্রস্তুতি।

তিনি বলেন, ‘ভাবলাম, মানুষ যেসব বোতল ফেলে দেয়, সেগুলো দিয়েই যদি একটি বাড়ি বানানো যায়, তাহলে একদিকে যেমন পরিবেশের উপকার হবে, অন্যদিকে নতুন কিছু করার স্বপ্নও পূরণ হবে।’

এরপর ভাঙারির দোকান, বাজার, হাট এবং বিভিন্ন এলাকা থেকে ধীরে ধীরে খালি প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ শুরু করেন তিনি। প্রতিটি বোতল ভালোভাবে পরিষ্কার করে শুকিয়ে তাতে শক্ত করে বালু ভরা হয়। এরপর বিশেষ কৌশলে সিমেন্টের গাঁথুনির মধ্যে বোতলগুলো বসানো হয়। ইটের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয় প্রতিটি বোতল।

হাকিম জানান, প্রায় ৩০ ফুট দৈর্ঘ্যের এই বাড়িতে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৬ হাজার প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার করা হয়েছে। গত ১১ মাস ধরে নির্মাণকাজ চলছে। প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এখনও প্লাস্টার, দরজা-জানালা, মেঝে এবং কিছু ফিনিশিংয়ের কাজ বাকি রয়েছে। তবে অসমাপ্ত বাড়িতেই স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত প্রায় ১১ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। একই আকারের একটি ইটের বাড়ি কম খরচেও করা যেত। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য শুধু একটি বাড়ি বানানো ছিল না। আমি দেখাতে চেয়েছি, যেটাকে আমরা বর্জ্য ভাবি, সেটিও সঠিকভাবে ব্যবহার করলে সম্পদে পরিণত হতে পারে।’

এই উদ্যোগের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। প্রথম দিকে গ্রামের অনেকেই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছেন। কেউ বলেছেন, বোতল দিয়ে আবার বাড়ি হয় নাকি! কেউ তাকে পাগল বলেও কটাক্ষ করেছেন। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন বাড়ির দেয়াল দাঁড়িয়ে যায়, তখন সেই সমালোচকেরাই তার প্রশংসা করতে শুরু করেন।

হাকিম বলেন, ‘আগে যারা হাসতেন, তারাই এখন মানুষ নিয়ে বাড়ি দেখতে আসেন। অনেকেই বলেন, এমন চিন্তা তারা আগে কখনও করেননি। মানুষের এই ভালোবাসা আর প্রশংসাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’

হাকিমের স্ত্রী আনজুমান আরা বেগম বলেন, ‘শুরু থেকেই আমি স্বামীকে সাহস দিয়েছি। অনেক কষ্ট করে তিনি এই বাড়ি তৈরি করেছেন। এখন প্রতিদিন অনেক মানুষ আসে, বাড়ি দেখে প্রশংসা করে। তখন খুব ভালো লাগে।’

বাড়িটি দেখতে আসা আব্দুর রহমান শিকদার বলেন, ‘এটি শুধু একটি বাড়ি নয়, পরিবেশ রক্ষার একটি অনন্য বার্তা। ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক দিয়েও এত সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা তৈরি করা যায়, না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘আগে এই এলাকায় বাইরের মানুষ খুব একটা আসতেন না। এখন প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ আসছেন। এতে এলাকাটিও নতুনভাবে পরিচিতি পেয়েছে।’

পরিবেশবিদদের মতে, বাংলাদেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার বড় একটি অংশ পুনর্ব্যবহারের বাইরে থেকে যায়। এমন উদ্যোগ শুধু প্লাস্টিক দূষণ কমাতেই নয়, পুনর্ব্যবহার সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে স্থায়ী ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রকৌশলগত নিরাপত্তা, মানসম্মত নকশা এবং বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুসরণ করা প্রয়োজন।

একজন সাধারণ অটোরিকশাচালকের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই ‘বোতলবাড়ি’ আজ শুধু একটি বাড়ি নয়; এটি স্বপ্ন, সাহস, সৃজনশীলতা ও পরিবেশ সচেতনতার প্রতীক। যেখানে অন্যরা প্লাস্টিকের বোতলে দেখেছেন বর্জ্য, সেখানে আবদুল হাকিম খুঁজে পেয়েছেন সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। সেই সম্ভাবনাই আজ তাকে এনে দিয়েছে ব্যতিক্রমী পরিচিতি, অসংখ্য দর্শনার্থীর ভালোবাসা এবং নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার গল্প।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  স্বপ্নের বাড়ি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close