আজ ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস। ২০২৪ সালের আজকের এই দিনে বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ফ্যাসিবাদী অপশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। ছাত্র-জনতার দুর্বার আন্দোলনের মুখে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পালিয়ে যান সরকারের অধিকাংশ মন্ত্রী ও এমপিসহ শীর্ষ নেতারা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘ বঞ্চনা, দুঃশাসন, দুর্নীতি, লুটপাট, গুম, খুন, অপহরণ, ভোটাধিকার হরণসহ সব ধরনের অত্যাচার, নিপীড়নের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্ম ও আপামর জনতার ক্ষোভের তীব্র বিস্ফোরণ। বৈষম্যমূলক ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপ করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জনগণের ক্ষমতায়ন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করাই ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য। আর ভয়াবহ ফ্যাসিবাদী দানবকে তাড়াতে প্রাণ ঝরেছে নারী, শিশু বৃদ্ধসহ ১,৪০০ জনেরও বেশি মানুষের। হাজার হাজার মানুষকে পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়েছে, হারাতে হয়েছে দৃষ্টিশক্তি।
এত ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে যে বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে স্বপ্ন আমাদের দেশের তরুণ জুবা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ দেখেছে তাকি বাস্তবায়িত হয়েছে। জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল কেবল ক্ষমতার রদবদল নয়; বরং রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে বিচার বিভাগ হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন, প্রশাসন হবে নিরপেক্ষ এবং নাগরিকের ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতা থাকবে সুরক্ষিত। সাধারণ মানুষের রক্তদান কিংবা ত্যাগ কোনো একক দলীয় স্বার্থের জন্য ছিল না, তা ছিল সার্বিক রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য। কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের এই প্রক্রিয়ায় যখন সেই আকাক্সক্ষার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে না, তখন জনমনে হতাশা ও প্রশ্নের জন্ম হওয়া স্বাভাবিক।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এক দিনে বা অতি অল্প সময়ে সম্ভব নয়। কিন্তু জনমানুষের প্রধান প্রত্যাশা থাকে অন্তত পরিবর্তনের একটি ইতিবাচক দিকনির্দেশনা ও সদিচ্ছা প্রত্যক্ষ করা। ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও যদি দুর্নীতি, নৈরাজ্য ও পেশিশক্তির প্রয়োগ অব্যাহত থাকে, তবে কাঠামোগত রূপান্তর বাধাগ্রস্ত হয়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যদি চিন্তাধারা ও আচরণগত পরিবর্তন না ঘটে, তবে পুরোনো ব্যবস্থাই নতুন চেহারায় ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর নীতি ও নেতৃত্বে পরিবর্তনের পাশাপাশি সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ না করলে জনআকাক্সক্ষার সঙ্গে শাসক বা রাজনৈতিক শ্রেণির ব্যবধান আরও বাড়ে। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সুস্থ ধারা ফিরিয়ে আনা, কেবল ব্যবস্থার পরিবর্তন নয় বরং সহনশীলতা ও জবাবদিহিতার চর্চা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছানো যে, রাষ্ট্র তাদের প্রত্যাশাকে মূল্যায়নে আন্তরিক- এগুলোই এখন মূল দাবি।
জনগণের ত্যাগের মধ্য দিয়ে যে প্রত্যাশার জন্ম হয়, তা বাস্তবায়ন করা যে কোনো রূপান্তরকালীন সময়ের প্রধান দায়িত্ব। ব্যক্তিস্বার্থ বা দলীয় বলয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সার্বিক রাষ্ট্র সংস্কার এবং জনগণের মৌলিক দাবিগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করাই জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র উপায়। আর এই লক্ষ্য অর্জনে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার কোনো বিকল্প নেই।
দেশ গড়ার দায়িত্ব কেবল একক কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের নয়; বরং শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শ্রমিক, কৃষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবীসহ সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের। জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে এমন বিভাজনমূলক রাজনীতি পরিহারের মাধ্যমে ২০২৪-এর গণতান্ত্রিক চেতনাকে লালন করে একটি সাম্য, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সকলকে সচেষ্ট থাকতে হবে।
কেকে/এলএ