আমাদের জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনগুলোর একটি নিয়মিত প্রথা হলো আগামী দিনগুলোর আয় এবং ব্যয়ের হিসাব মেলানো। তবে এ হিসাবের সমান্তরালে অর্থ মন্ত্রণালয় যখন ‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি’ প্রকাশ করে, তখন তা শুধু এক বছরের খতিয়ান থাকে না। ২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯ অর্থবছরের জন্য তৈরি করা এ নীতি বিবৃতিটি আগামী তিন বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যাত্রাপথের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দিকনির্দেশনা। সাধারণত এ ধরনের রূপরেখা প্রতি বছরই আসে, কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা এবং বেশ জটিল।
২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করতে যাচ্ছে। এ ঐতিহাসিক অর্জনের আনন্দের পাশাপাশি আমাদের সামনে রয়েছে এক বিশাল বাস্তবতার দেওয়াল। দেশের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্য অবক্ষয় পুরো অর্থনীতিকে এক ধরনের টানাপড়েনের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এ ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে সরকার আগামী তিন বছরের জন্য যে অর্থনৈতিক প্রক্ষেপণ বা লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে, তার ভেতরের কথাগুলো সাধারণ মানুষের জানা দরকার। কারণ এ নীতিমালার সফলতার ওপরই নির্ভর করছে আমাদের আগামী দিনের জীবনযাত্রার মান।
একটি দেশের বার্ষিক বাজেট মূলত এক বছরের একটি সাময়িক পরিকল্পনা। কিন্তু একটি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাখতে হলে শুধু বার্ষিক পরিকল্পনা দিয়ে পার পাওয়া যায় না। এ উদ্দেশ্যেই মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি তৈরি করা হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো বাজেটের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা, সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় এক ধরনের আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা। এ বিবৃতির মাধ্যমে সরকার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা যেমন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা বিশ্বব্যাংকের কাছে দেশের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। একইসঙ্গে দেশের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং অনুমানযোগ্য কর ও নীতি কাঠামোর আভাস দেওয়া এ বহুমুখী বিবৃতির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এর ফলে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা সাহসের সঙ্গে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করতে পারেন, যা দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। বিনিয়োগের এ অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা না গেলে কোনো মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনাই তার কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না।
অর্থনীতির এ জটিল নথিপত্রগুলো কোনো শুষ্ক তাত্ত্বিক হিসাব নয়। এর প্রতিটি পৃষ্ঠার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের চাল, ডাল, তেল কেনার খরচ সরাসরি যুক্ত থাকে। এ নীতি বিবৃতি থেকে সাধারণ মানুষের প্রথম যে বিষয়টি জানা উচিত, তা হলো মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা। সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে সাত শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছে। বছরের পর বছর ধরে বাজারে নয় শতাংশের ওপরে থাকা মূল্যস্ফীতির কবলে পড়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। এ অবস্থায় সরকারের এই নতুন লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত, তা সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিদিনের বাজারের থলে দিয়ে মেলাবে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান। নীতি বিবৃতিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধি সাড়ে ছয় শতাংশ প্রক্ষেপণ করা হয়েছে, যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের মুদ্রানীতিতে এটিকে কিছুটা কমিয়ে ছয় দশমিক এক শতাংশ হিসেবে দেখিয়েছে। এ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা যদি সত্যি অর্জিত হয়, তবে বাজারে নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং দেশের লাখ লাখ শিক্ষিত যুবকের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। প্রবৃদ্ধি শুধু সংখ্যায় সীমাবদ্ধ না থেকে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে কি না, তা আমাদের গভীর নজরদারিতে রাখতে হবে।
তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষের জানা দরকার কর এবং রাজস্ব নীতি নিয়ে সরকারের অবস্থান। মধ্যমেয়াদি এ বিবৃতিতে আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছর পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকায় অপরিবর্তিত রাখার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত দশ দশমিক সাত শতাংশে উন্নীত করার এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। জনগণের এটি পরিষ্কারভাবে জানা প্রয়োজন, কারণ করের আওতা বাড়াতে গিয়ে মধ্যবিত্তের ওপর নতুন কোনো করের বোঝা চাপবে কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত মেনে গ্যাস ও বিদ্যুতের ভর্তুকি ধাপে ধাপে তুলে দেওয়ার যে পরিকল্পনা চলছে, তা সাধারণ মানুষের পকেটে কেমন টান দেবে, তাও এ নীতিমালার ওপরই নির্ভর করছে। ফলে এই নীতি শুধু নীতিনির্ধারকদের আলোচনার বিষয় নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
তবে এ সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় ক্ষত এবং আশঙ্কার নাম হলো ক্রমবর্ধমান ঋণের সুদ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা। নীতি বিবৃতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শুধু ঋণের সুদ মেটাতেই সরকারকে এক লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। এ খরচের ভয়ংকর অঙ্ক এখানেই থেমে থাকছে না, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে এক লাখ ৬২ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকবে। গত কয়েক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়নের কারণে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের ঋণ ঝুঁকিকে স্বল্প থেকে মাঝারি ক্যাটাগরিতে উন্নীত করেছে। বাজেটের সিংহভাগ টাকা যদি ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যায়, তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতের মতো জনকল্যাণমূলক খাতে বরাদ্দ কমে যেতে বাধ্য। সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়া কিছুটা কমিয়ে বৈদেশিক ঋণের দিকে ঝুঁকছে যাতে বেসরকারি খাত ঋণবঞ্চিত না হয়, তবে এ নীতি বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে। আমাদের এ ঋণনির্ভরতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নীতি বিবৃতিতে স্পষ্ট হওয়া দরকার ছিল।
সুদ পরিশোধের এ বিশাল চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি আরেকটি বড় ধাক্কা আসতে যাচ্ছে ২০২৬ সালের নভেম্বরে, এলডিসি থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণের মাধ্যমে। উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বড় বাজারগুলোতে বাংলাদেশ আর বর্তমানের মতো শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাণিজ্য সুবিধা পাবে না। এর ফলে আমাদের তৈরি পোশাকসহ সামগ্রিক রপ্তানি খাত তীব্র আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। যদিও এবারের বাজেটে চামড়া, ওষুধ, জুয়েলারি এবং আইটি খাতের বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধায় সংস্কার এনে রপ্তানি বহুমুখীকরণের একটি চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তবে ডিজিটাল তদারকি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা ছাড়া এ সংস্কারের শতভাগ সুফল পাওয়া কঠিন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজস্ব আদায়ের পুরোনো অক্ষমতা। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতি এবং ব্যাংকিং খাতের রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তিকে দিন দিন দুর্বল করে দিচ্ছে। আর্থিক খাতের এ বিশৃঙ্খলা দূর করতে না পারলে আমাদের সব সামষ্টিক লক্ষ্য শুধুই অলীক কল্পনা মনে হতে পারে।
এ জটিল গোলকধাঁধা থেকে উত্তরণের জন্য কাগজে-কলমে নীতি বিবৃতি তৈরির চেয়ে এর কঠোর ও সৎ বাস্তবায়ন বেশি প্রয়োজন। প্রথমত, কর ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত করে করের জাল বাড়াতে হবে, যাতে শুধু বর্তমানের সৎ করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ না বাড়ে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাতে কঠোর সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে খেলাপি ঋণ আদায় করতে হবে এবং ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে যুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, এলডিসি উত্তরণের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নতুন সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে সরকারি প্রণোদনা ও বন্ড সুবিধা দিয়ে বৈশ্বিক বাজারের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। সর্বোপরি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ঢ়ড়ষরঃরপধষ উদ্দেশ্যে নেওয়া কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প পুরোপুরি পরিহার করে শুধু উচ্চ উৎপাদনশীল ও দেশের মানুষের জন্য সরাসরি উপকারী প্রকল্পে অর্থায়ন করতে হবে। আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে প্রতিটি পয়সার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে এসময়ের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমত্তা।
২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম একটি জটিল সন্ধিক্ষণে প্রণীত হয়েছে। দেশ এখন অর্ধ-ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে প্রবেশ করলেও প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখা এবং ঋণের ফাঁদ এড়ানোই হবে আগামী তিন বছরের মূল পরীক্ষা। নীতিমালাটি খাতায়-কলমে অনেকখানি গোছানো হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং অপচয় রোধের ওপর। সরকার যদি আর্থিক সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে এ মধ্যমেয়াদি রূপরেখা শুধুই একটি পরিসংখ্যানের নথিতে পরিণত হবে, যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হবে দেশের সাধারণ জনগণকে। বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নকে নিশ্চিত করতে হলে এ তিন বছরের রূপরেখাকে একটি কার্যকর ও দৃশ্যমান জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তর করতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক ও উদ্যোক্তা
কেকে/এলএ