বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬,
২১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: পদত্যাগের শেষ মুহূর্তেও আন্দোলনের পরিস্থিতি জানতে চেয়েছিলেন হাসিনা      জুলাই জাদুঘর নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রেরণার কেন্দ্র : ড. ইউনূস      জ্বালানি সংকটে ভুগবে সরকার      ফ্যাসিস্ট পতনের দুই বছর      এবার ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতের ভিসা বাতিল করল যুক্তরাষ্ট্র      আজ জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী      বিদ্যুৎ-গ্যাস সমস্যা সমাধানের নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছি : প্রধানমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
চব্বিশের জুলাই রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি
ড. মাহরুফ চৌধুরী
প্রকাশ: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ২:৪২ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এর গতিশীলতা। ইতিহাস কখনো স্থির নয়; এটি অবিরাম পরিবর্তন, অভিযোজন ও পুনর্গঠনের এক চলমান প্রক্রিয়া। কোনো জাতির ইতিহাস বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার সমষ্টি নয়; এটি দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক অভিযাত্রা। যে জাতি অতীতের অভিজ্ঞতাকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে ভবিষ্যতের দিকে এগোয়, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদেরই পক্ষে কথা বলে; আর যে জাতি অতীতের গৌরবকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্রে পরিণত করে, নিজেদের মধ্যে বিভেদকে স্থায়ী করে তোলে, তারা একসময় অগ্রগতির পথ হারিয়ে ফেলে। অতীতকে অস্বীকার করা যেমন আত্মঘাতী, অতীতে বন্দি থাকাও তেমনি সমান ক্ষতিকর।

পলাশী-উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত সংগ্রামের ইতিহাস— ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রতিরোধ, ১৯৪৭-উত্তর ভাষার জন্য সংগ্রাম, রাজনৈতিক অধিকারের সংগ্রাম, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার সংগ্রাম এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এসব মিলিয়েই আমাদের জাতীয় ইতিহাস নির্মিত হয়েছে। এ ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় পূর্ববর্তী অধ্যায়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তার আত্মপরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করেছে; ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সুসংহত করেছে; ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান গণশক্তির সক্ষমতা প্রকাশ করেছে; আর ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ সেই দীর্ঘ সংগ্রামকে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে পরিণতি দিয়েছে।

কিন্তু জাতির ইতিহাসের পথচলা কোনো একক ঘটনার মধ্যেই থেমে থাকে না। ১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় যেমন এ অঞ্চলে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা করেছিল, তেমনি ১৯৭১ সালের বিজয়ও কোনো চূড়ান্ত সমাপ্তি ছিল না। স্বাধীনতা একটি ঘটনা; কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যেখানে কখনো অগ্রগতি আসে, কখনো ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন সেই অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। এ ধারাবাহিক ঐতিহাসিক প্রবাহের মধ্যেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে— একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র ও সমাজকে আরও ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত করার দীর্ঘ অভিযাত্রার একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে।

বিশ্ব ইতিহাসের দিকে তাকালেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। ১৭৭৬ সালের আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির পথ খুলে দিলেও নাগরিক অধিকার ও বর্ণসমতার প্রশ্নে সংগ্রাম অব্যাহত থেকেছে; স্বাধীনতার প্রায় দুই শতাব্দী পরও আফ্রিকান-আমেরিকানদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নেতৃত্বে ব্যাপক নাগরিক অধিকার আন্দোলন গড়ে উঠতে হয়েছে। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শ সামনে নিয়ে এলেও গণতন্ত্র ও প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধ সুসংহত করতে ফরাসি সমাজকে বহু উত্থান-পতনের মধ্যদিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমে রাজনৈতিক মুক্তি অর্জনের পরও সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের প্রশ্নে নতুন সংগ্রামের সূচনা হয়েছে। এ অভিজ্ঞতাগুলো শেখায় যে রাজনৈতিক মুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, কিন্তু তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের যে স্বপ্ন জনগণ লালন করেছিল, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন আজও একটি চলমান প্রক্রিয়া। আকাক্সক্ষা ও বাস্তবতার ফারাক যখনই বেড়েছে, তখনই নতুন করে পরিবর্তনের দাবি উত্থাপিত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘ বিবর্তনধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যেখানে নতুন প্রজন্ম জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা ও নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নগুলো নতুন করে উত্থাপন করেছে।

২০২৪-এর এ গণঅভ্যুত্থান বিশেষভাবে তরুণ প্রজন্মের সেই ঐতিহাসিক ভূমিকাকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা যুগে যুগে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যখন জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, যখন ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন জবাবদিহিতার পরিসর সংকুচিত করে এবং নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে, তখন পরিবর্তনের দাবি সবচেয়ে জোরালোভাবে উচ্চারিত হয় তরুণদের কণ্ঠে। ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন— প্রতিটিতেই তরুণেরা অগ্রণীর ভূমিকা পালন করেছে; তারাই সাহসিকতার সঙ্গে প্রচলিত বাস্তবতাকে প্রশ্ন করেছে এবং প্রয়োজনে আত্মত্যাগের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। জার্মান বংশোদ্ভূত মার্কিন রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হানা আরেন্টের (১৯০৬-১৯৭৫) ভাষায়, প্রতিটি নতুন প্রজন্ম পৃথিবীতে নতুন সূচনার সম্ভাবনা নিয়ে আসে। বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানও শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ ছিল না; এটি ছিল নতুন প্রজন্মের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের উদ্দেশে একটি মৌলিক প্রশ্ন— রাষ্ট্র কার জন্য, ক্ষমতা কার স্বার্থে এবং স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কী?

ইতিহাস শুধু অতীতের ঘটনা-পরম্পরা নয়; এটি বর্তমান রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়োর (১৯৩০-২০০২) ভাষায় এটি এক ধরনের ‘প্রতীকী পুঁজি’, যার মাধ্যমে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের বৈধতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রগঠনের বিভিন্ন অধ্যায়কে এমনভাবে ব্যাখ্যা-উপস্থাপন করার প্রবণতা দেখা গেছে, যেন তার ওপর নির্দিষ্ট ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একচ্ছত্র মালিকানা রয়েছে। ফলে জাতীয় ইতিহাস, যা হওয়া উচিত ছিল সমগ্র জাতির সম্মিলিত উত্তরাধিকার, তা অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০ কিংবা ২০২৪ এসব বাংলাদেশের ইতিহাসে ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় হলেও একই জাতীয় অভিযাত্রার ভিন্ন ভিন্ন মাইলফলক। একটির গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যটিকে খাটো করার চেষ্টা যেমন ইতিহাসবিরোধী, তেমনি একটিকে অন্যটির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানোও জাতির জন্য ক্ষতিকর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে একদেশদর্শিতার ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চার স্বাভাবিক বিকাশ দীর্ঘদিন ধরে ব্যাহত হয়েছে; মুক্ত গবেষণা ও যুক্তিনির্ভর বিতর্কের পরিবর্তে তা অনেক সময় রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে, যা জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সংহতি ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে।

জুলাই আন্দোলন কোনো একক রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ বা সংগঠনের উদ্যোগ ছিল না; এর প্রাণশক্তি ছিল সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। এ গণঅভ্যুত্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ইতিহাসের প্রকৃত মালিক কোনো দল নয়, দেশের জনগণ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে জুলাইপরবর্তী সময়ে একটি রাজনৈতিক প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে, যেখানে ২০২৪-কে ১৯৭১-এর বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা হয়েছে— একপক্ষ জুলাইয়ের তাৎপর্য প্রতিষ্ঠার নামে স্বাধীনতা যুদ্ধের গুরুত্বকে খাটো করতে চেয়েছে, অন্যপক্ষ স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি সামনে এনে জুলাইয়ের বৈধতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। উভয় প্রবণতাই ইতিহাসের প্রকৃত স্বরূপকে অস্বীকার করে এবং জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি।

প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ ও ২০২৪ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ইতিহাস নয়; বরং একই জাতীয় অর্জনের অব্যাহত অভিযাত্রার ভিন্ন দুই অধ্যায়। ১৯৭১ আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মাণ করেছে, আর ২০২৪ সেই স্বাধীন রাষ্ট্রকে আরও বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও স্বৈরাচারমুক্ত করার গণআকাক্সক্ষাকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। জুলাইপরবর্তী রাষ্ট্রসংস্কারের জনআকাক্সক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুটি মৌলিক দাবি একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রযন্ত্র এবং একটি স্বৈরাচারমুক্ত শাসনব্যবস্থা, যার প্রতিফলন হিসেবেই ‘জুলাই সনদ’-এর ধারণা সামনে আসে। কিন্তু যখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু রাষ্ট্রসংস্কার থেকে সরে গিয়ে ইতিহাসের মালিকানা নিয়ে প্রতিযোগিতায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সংস্কার-এজেন্ডা দুর্বল হয়ে যায়, ফলে যে তরুণেরা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের স্বপ্ন নিয়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের অনেক প্রত্যাশাই অপূর্ণ থেকে যায়।

তবু জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন অন্যত্র। এ গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের জনগণকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে রাষ্ট্রের বৈধতার উৎস কোনো ঐতিহাসিক স্মৃতির একক ব্যাখ্যা নয়; বরং জনগণের অব্যাহত সম্মতি, অংশগ্রহণ ও আস্থার ওপরই রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তি নির্ভর করে। কোনো শাসকগোষ্ঠী অতীতের গৌরব বা রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের কথা যতই উচ্চারণ করুক, বর্তমানের জনগণের বাস্তব আকাক্সক্ষা উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদে শাসনব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। জুলাইয়ের উত্তরাধিকার নিহিত সেই নতুন প্রত্যাশার মধ্যে, যেখানে তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্রকে শুধু ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, একটি ভূখণ্ড, একটি পতাকা এবং বিশ্বের মানচিত্রে একটি সার্বভৌম পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সেই রাষ্ট্রকে কীভাবে পরিচালিত করা হবে, জনগণের অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং ক্ষমতাকে কীভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে এসব প্রশ্নও স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য শুধু তার অস্তিত্বে নয়; বরং সে তার জনগণের জন্য কতটা ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে, তার মধ্যেই নিহিত। আর এখানেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য এটি ১৯৭১-এর বিকল্প নয়, বরং ১৯৭১-এর অসমাপ্ত আকাক্সক্ষাগুলোর একটি নতুন ঐতিহাসিক প্রকাশ।

বাংলাদেশের সামনে আজ যে চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে, তা মূলত ভবিষ্যৎমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের চ্যালেঞ্জশিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার সার্বজনীনতা, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, টেকসই শিল্পায়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। কোনো জাতি যদি শুধু অতীতের অর্জনের মালিকানা নিয়ে বিতর্কে আবদ্ধ থাকে, তবে বর্তমানের বাস্তব সংকট অমীমাংসিত থেকে যায় এবং তার মূল্য দিতে হয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। রাষ্ট্রসংস্কার কোনো একক সরকার, দল বা সময়ের কাজ নয়; এটি একটি চলমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যেখানে নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের সব অংশীজনের ভূমিকা রয়েছে।

আজকের তরুণ প্রজন্মের সামনে তাই দ্বৈত দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত ইতিহাসের বিকৃতি, কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা ও অতীতের প্রতীকী পুঁজির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা; কারণ গণতান্ত্রিক সমাজে ইতিহাসের মালিকানা কোনো গোষ্ঠীর নয়, এটি জনগণের সম্মিলিত সম্পদ। দ্বিতীয়ত, শুধু প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ না থেকে রাষ্ট্র নির্মাণের ইতিবাচক ও সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা। একটি উন্নত রাষ্ট্র কেবল সেগান বা আবেগের মাধ্যমে নির্মিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, দায়িত্বশীলতা ও কঠোর পরিশ্রম। জুলাইয়ের চেতনা তখনই প্রকৃত অর্থে সফল হবে, যখন তা এমন এক নাগরিক সংস্কৃতির জন্ম দেবে, যেখানে মানুষ অধিকার যেমন দাবি করবে, তেমনি দায়িত্বও পালন করবে; যেখানে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হবে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, জনগণের কল্যাণে।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের গর্ব; চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানও আমাদের গর্ব। একটি আমাদের স্বাধীন অস্তিত্বের ভিত্তি নির্মাণ করেছে, অন্যটি সেই স্বাধীন রাষ্ট্রের চরিত্র ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মসমালোচনা ও আত্মসংশোধনের শক্তিকে প্রকাশ করেছে। দুটিই বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য ও অনিবার্য অংশ, এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নির্মাণে উভয়ই আমাদের জন্য প্রেরণা ও দিকনির্দেশনার উৎস।

অতএব, আমাদের সামনে পথ হতে হবে বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতি; প্রতিহিংসার সংস্কৃতির পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি; ইতিহাসের একচেটিয়া মালিকানা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুমাত্রিক স্মৃতিচর্চার সংস্কৃতি; এবং অতীতের অন্তহীন বিতর্কে আবদ্ধ থাকার পরিবর্তে ভবিষ্যৎ নির্মাণের দৃঢ় অঙ্গীকার। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয় কোনো একটি মুহূর্তের সাফল্যে নয়; বরং সেই মুহূর্তের চেতনাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাস্তব জীবনে রূপ দেওয়ার মধ্যেই নিহিত।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য


কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  জুলাই  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close