সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে, পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন নওগাঁর ১৩ যুবক। প্রবাসের কঠিন জীবনেও স্বজনদের জন্য স্বপ্ন বুনছিলেন তারা। কিন্তু সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে গেলো তাদের। সৌদির রাজধানী রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন তারা। এ ১৩ জনের সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন আরও তিন বাংলাদেশি। তাদের বাড়ি পাশের জেলা নাটোরে।
স্বজন হারিয়ে শোক আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার এসব পরিবার। নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।
সরেজমিনে উপজেলার গন্ডগোহালি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহতদের বাড়িতে এখন শুধু কান্নার শব্দ। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ। কেউ বুক চাপড়ে বিলাপ করছেন, কেউ প্রিয়জনের ছবি বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন। তাদের কেউ আবার বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।
তাদের চোখের পানি দেখে সান্ত্বনা দিতে আসা মানুষগুলোরও চোখ ভিজে যাচ্ছে। একে অন্যকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেরাই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই, শুধু প্রিয় মানুষটিকে হারানোর শোক আর বুকফাটা আহাজারি।
নিহতদের মধ্যে চারজনের বাড়ি আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালি গ্রামে। তারা হলেন— মহন প্রামাণিক (২২), তার ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (১৬), রুবেল প্রামাণিক (৩০) ও কলিমুল্লাহ প্রামাণিক (৩৫)।
এ ঘটনায় নিহত অন্যরা হলেন— উপজেলার সাদনগর গ্রামের সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল (৩৪) ও আব্দুল জলিল (৪৮), উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের সুমন (৩১) ও হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), বোয়ালা গ্রামের হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০) এবং নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার শাহিন (৩৮)।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, নিহতরা সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় কাজ করছিলেন। তাদের মধ্যে চারজন গন্ডগোহালি গ্রামের বাসিন্দা। চার পরিবারই দরিদ্র। পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে প্রায় আট বছর আগে সৌদি আরব পাড়ি জমান তারা। চারজনই ছিলেন অবিবাহিত।
নিহতদের স্বজনরা জানান, প্রবাসে থেকে পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার স্বপ্ন দেখছিলেন তারা। কেউ পরিবারের হাল ধরার আশায়, কেউবা নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যাশায় বিদেশে গিয়েছিলেন। কিন্তু এক ভয়াবহ আগুনে সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাতেই নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো হয়েছে।
আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া নাটোরের তিনজন হলেন— নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়ন শ্রীপুরপাড়া গ্রামের মো. রাব্বানীর ছেলে সাব্বির হোসেন শুভ, দিঘীরপাড় এলাকার মো. জাখের আলীর ছেলে শামীম হোসেন এবং মহিষডাঙ্গা এলাকার আসলাম শেখের ছেলে রবিউল আউয়াল হৃদয়।
প্রসঙ্গত, রোববার দুপুরে রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ঘটনাস্থলেই ১৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহত সবাই বাংলাদেশি বলে নিশ্চিত করে সেখানে কর্মরত ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা।
কেকে/এআই