সড়কজুড়ে অসংখ্য গর্ত, কোথাও পিচ উঠে গেছে, কোথাও আবার বৃষ্টির পানিতে গর্তই দেখা যায় না। একটু অসতর্ক হলেই বিপদ। গর্তে পড়ে কাত হয়ে যাচ্ছে অটোরিকশা-রিকশা, ঝুঁকি নিয়ে চলছেন যাত্রী ও চালকেরা। মাত্র তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেই যেন নরকযাত্রা।
গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর–ভাওয়াল মির্জাপুর সড়কের প্রায় তিন কিলোমিটার অংশ এখন এমনই বেহাল। প্রতিদিন শতাধিক অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করে এই পথে। সড়কের দুই পাশে রয়েছে ১৪–১৫টি শিল্পকারখানা। এসব কারখানায় কর্মরত হাজারো শ্রমিকের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকদেরও প্রতিদিন এই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সড়কের বিভিন্ন অংশে বড় বড় গর্ত তৈরি হলেও স্থায়ী সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বৃষ্টির সময় পানি জমে গর্তগুলো আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। গর্ত এড়াতে গিয়ে একদিকে যেমন যানবাহন উল্টে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে ধীরগতিতে চলাচলের কারণে সময় ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
রাজেন্দ্রপুর থেকে ভাওয়াল মির্জাপুর বাজার পর্যন্ত নিয়মিত অটোরিকশা চালান আরিফ হোসেন। তিনি বলেন, ‘মির্জাপুর বাজার মোড় পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সড়ক দিয়ে চলাচল করা খুব কঠিন। কয়েকবার যাত্রীসহ আমার অটোরিকশা উল্টে গেছে। প্রতিদিন শতাধিক অটোরিকশা এই পথে চলে। কিন্তু বিকল্প সড়ক না থাকায় বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে।’
বাহাদুরপুর গ্রামের অটোরিকশাচালক মো. আইয়ুব আলী বলেন, ‘বৃষ্টির পর রাস্তার অবস্থা আরও খারাপ হয়। গর্তে পানি জমে গেলে কোনটি কত গভীর, বোঝা যায় না। চাকা গর্তে পড়লে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন।’
রিকশাচালক স্বপন মিয়া বলেন, ‘রাস্তার গর্তের কারণে অনেক সময় রিকশা উল্টে যায়। যাত্রী নিয়ে চলাচল করতে ভয় লাগে।’
আরেক রিকশাচালক আব্দুর রশিদ বলেন, ‘গর্তের কারণে প্রতিটি ট্রিপে বেশি সময় লাগছে। আগে দিনে যতগুলো ট্রিপ দিতে পারতাম, এখন তা পারি না। আয়ও কমে গেছে।’
পোশাক নোংরা, বাড়ছে শ্রমিকদের ভোগান্তি
সড়কের পাশে থাকা ১৪–১৫টি শিল্পকারখানার শ্রমিকদেরও প্রতিদিন এই দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে বৃষ্টির পর গর্তে জমে থাকা নোংরা পানি যানবাহনের চাকার নিচে ছিটকে পড়ছে শ্রমিকদের পোশাকে।
তালহা ফেব্রিকসের কয়েকজন শ্রমিক জানান, পরিষ্কার পোশাক পরে বাসা থেকে বের হলেও কারখানায় পৌঁছানোর আগেই কাদা-পানিতে পোশাক নোংরা হয়ে যায়। অনেক সময় কারখানায় গিয়ে পোশাক পরিবর্তন করতে হয়।
এক শ্রমিক বলেন, ‘বাসা থেকে ভালো কাপড় পরে বের হই। কিন্তু রাস্তাটুকু পার হওয়ার পর কাপড় নোংরা হয়ে যায়। অনেক সময় অফিসে গিয়ে পোশাক পরিবর্তন করতে হয়।’
শ্রমিকদের অভিযোগ, শুধু যাতায়াতেই নয়, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে কারখানায় কাঁচামাল আনা এবং উৎপাদিত পণ্য পরিবহনেও সমস্যা হচ্ছে।
ব্যবসা ও পরিবহনেও প্রভাব
মির্জাপুর বাজারের ব্যবসায়ী সোহরাওয়ার্দী বলেন, ‘সড়কের খারাপ অবস্থার কারণে পণ্য আনা-নেওয়ায় সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে। গর্তে গাড়ি আটকে গেলে বাড়তি ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।’
ট্রাকচালক মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘কারখানার মালামাল নিয়ে প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হয়। তিন কিলোমিটার পথ পার হতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ হয়। গর্তে পড়ে গাড়িরও ক্ষতি হচ্ছে।’
সড়কটির বেহাল দশার বিষয়ে গাজীপুর সদর উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী মো. আবদুল্লাহ-আল-রাশেদীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘রাজেন্দ্রপুর–ভাওয়াল মির্জাপুর সড়কটি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অধীন।’
এলজিইডির প্রকৌশলীর বক্তব্যের পর সড়কটির সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদির বলেন, ‘সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চলাচল করেন। পাশে অনেক কারখানা থাকায় শ্রমিক ও পণ্যবাহী গাড়ির চাপও রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের এমন অবস্থা মেনে নেওয়া যায় না।’
স্থানীয়দের দাবি, সাময়িকভাবে গর্তে মাটি বা ইট ফেলে দায়সারা সংস্কার নয়, দ্রুত সড়কটির টেকসই সংস্কার করতে হবে। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
হাজারো মানুষের চলাচল এবং ১৪–১৫টি শিল্পকারখানার সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের মাত্র তিন কিলোমিটার অংশ দীর্ঘদিন ধরে এমন বেহাল কেন—এ প্রশ্নই এখন স্থানীয়দের।
কেকে/ এমএস