গত ১৬-১৭ বছরে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ও বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে বাংলাদেশকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় হুইপ ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. আখতারুজ্জামান মিয়া।
সোমবার (১০ আগস্ট) সন্ধ্যায় খানসামা উপজেলার ৫ নম্বর ভাবকী ইউনিয়ন পরিষদে ইউনিয়ন বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমন মন্তব্য করেন তিনি।
হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘একটি দেশের উন্নয়নকে স্থায়ী করতে হলে নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরি করতে হয়। ঋণের ওপর নির্ভর করে সাময়িকভাবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই হয় না।
আখতারুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক সংকট শুধু অর্থের ঘাটতির কারণে তৈরি হয় না; সঠিক পরিকল্পনা, জবাবদিহি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবও সংকটকে গভীর করে। তাই ভবিষ্যতের জন্য এমন অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থাকবে না।’
বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায় তুলে ধরে হুইপ বলেন, দেশের সংকটময় সময়ে জনগণ বারবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেছে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আমাদের শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসেছিলেন। তিনি দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দেশে পরিণত করেছিলেন।’
১৯৯১ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের মানুষ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। তাঁর দাবি, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
২০০১ সালের নির্বাচন নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি। তার ভাষ্য, ওই নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে এবং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার উদ্যোগ নেয়। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ওই সময়ে দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরেছিল।
এরপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, পরবর্তী ১৬-১৭ বছরে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতি হয়েছে। তার প্রমাণ আপনারা পেয়েছেন।’
দেশের অর্থপাচারের অভিযোগ তুলে তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে গেছে। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
হুইপ বলেন, ‘ধ্বংসের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নয়, ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই ঘটনার মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালন করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন জনগণই করবে।
দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেন, উন্নয়নের নামে শুধু ঋণ গ্রহণ নয়, উৎপাদন বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিজস্ব রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যুৎ খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাও জরুরি।
মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খানসামা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. আমিনুল হক চৌধুরী, দিনাজপুর জেলা বিএনপির অর্থবিষয়ক সম্পাদক ও ভাবকী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রবিউল আলম তুহিন এবং মো. মোসলেম উদ্দিন সরকার।
৫ নম্বর ভাবকী ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক ও খানসামা উপজেলা বিএনপির সদস্য মো. নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং খানসামা উপজেলা বিএনপির সদস্য মো. সফিকুল আলমের সঞ্চালনায় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। স্থানীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম, দলের ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও সভায় মতবিনিময় করা হয়।
কেকে/ এমএস