এক সময় ফরিদপুরের গ্রামবাংলার বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় কিংবা বাগানে বাতাবি লেবুর গাছ ছিল অতি পরিচিত দৃশ্য। বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, মধুখালী, সালথা, নগরকান্দাসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গড়ে উঠত বাতাবি লেবুর ছোট-বড় বাগান। অনেক সময় কোনো বিশেষ পরিচর্যা ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে বীজ থেকে জন্ম নিত গাছ। সবুজ পাতার ফাঁকে গোলাকার ফলগুলো যেন জানান দিত গ্রামীণ বাংলার এক সহজ-সরল ঐতিহ্যের কথা।
বাতাবি লেবুর বৈজ্ঞানিক নাম Citrus maxima। রসালো ও সুস্বাদু এ ফলে রয়েছে ভিটামিন সি, খাদ্যআঁশসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান। তাই এটি শুধু মুখরোচক ফল নয়, পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবেও এর রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। ফুল থেকে ফল—দীর্ঘ অপেক্ষা বাতাবি লেবুর গাছে সাধারণত বছরের উষ্ণ সময়ে ফুল আসতে শুরু করে। সাদা সুগন্ধি ফুল ফোটার পর ধীরে ধীরে গুটি বাঁধে এবং সেই গুটি বড় হয়ে রসালো ফলে পরিণত হয়। ফুল আসা থেকে ফল পরিপক্ব হতে কয়েক মাস সময় লাগে।
জাত, আবহাওয়া, মাটি ও পরিচর্যার ওপর এ সময়ের কিছুটা তারতম্য হতে পারে। বাংলাদেশে সাধারণত বর্ষার শেষভাগ থেকে শরৎকালে বাতাবি লেবুর ফলন ও বাজারজাতকরণ বেশি চোখে পড়ে। তবে গাছ ও জাতভেদে ফল পাকার সময় কিছুটা আগে-পরে হতে পারে। পরিপক্ব ফলের খোসা সবুজ থেকে হলদে-সবুজ বা হলুদাভ রং ধারণ করে এবং ফল আকারে ভারী ও রসালো হয়ে ওঠে। এ সময়ই বাজারে এর সরবরাহ বাড়তে থাকে। কমছে গাছ, বাড়ছে বাজারনির্ভরতাতবে প্রাকৃতিক পরিবর্তন, সামাজিক ও কৃষি সচেতনতার অভাব এবং ফলের গাছ রক্ষায় অনাগ্রহের কারণে ধীরে ধীরে কমছে বাতাবি লেবুর গাছ।
এখন আর আগের মতো বাগানে বাগানে দেখা যায় না এ ফলের সমারোহ। বরং মৌসুম এলে ফরিদপুরের বিভিন্ন ফলের দোকান কিংবা গৃহস্থের ঝুড়িতে সাজানো বাতাবি লেবু চোখে পড়ে। আকার ও মানভেদে প্রতিটি ফল বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ১০০ টাকায়।
ক্রেতা হান্নান বলেন, ‘বাতাবি লেবুর স্বাদ যেমন ভালো, তেমনি এর পুষ্টিগুণও অনেক। আগে বাড়ির আশপাশেই পাওয়া যেত, এখন কিনে খেতে হয়।’
বিক্রেতা হারুনের ভাষ্য, ‘আগের তুলনায় বাতাবি লেবু অনেক কম পাওয়া যায়। চাহিদা আছে, কিন্তু সরবরাহ কম।’
বোয়ালমারীর ময়না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কালিপদ চক্রবর্তী বলেন, ‘একসময় প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই বাতাবি লেবুর গাছ ছিল। এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে নতুন করে বাড়ির আঙিনা ও বাগানে বাতাবি লেবুর গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সচেতনতা ও পরিকল্পিত উদ্যোগে আবারও ফরিদপুরের গ্রামবাংলায় ফিরবে বাতাবি লেবুর সেই হারানো সবুজ ঐতিহ্য। বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় ও পতিত জায়গায় পরিকল্পিতভাবে বাতাবি লেবুর গাছ লাগানো গেলে একদিকে যেমন হারিয়ে যাওয়া দেশীয় ফলের ঐতিহ্য সংরক্ষণ সম্ভব, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে ফলের সরবরাহও বাড়ানো যেতে পারে।
কেকে/এআই