বনকর্মীর হাত কেটে দেওয়ার মামলার প্রধান আসামি রহিম উল্লাহর বিরুদ্ধে কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের প্রায় ২০ থেকে ২৫ একর বনভূমি দখল করে সেখানে বসবাসের অভিযোগ উঠেছে। রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের থিমছড়ি এলাকার জালাল আহমদের ছেলে রহিম উল্লাহ ওই বনভূমিতে বসবাস করছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বনকর্মীর হাত কেটে দেওয়ার পরও রহিম উল্লাহর বিরুদ্ধে ওই মামলায় দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না হওয়া এবং বনভূমি দখল করে বসবাসের সুযোগ পাওয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। তাদের দাবি, এটি যেন বনকর্মীর হাত কেটে দেওয়ার ‘প্রতিদান’ বা ‘উপহার’। না হলে এতদিনেও এই মামলায় তার কোনো শাস্তি হচ্ছে না কেন—এমন প্রশ্নও তুলেছেন তারা।
কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের বাঘখালী রেঞ্জের ঘিলাতলী বিটে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ৫০ হেক্টর সামাজিক বনায়নের গাছ রহিম উল্লাহ কেটে ফেলছেন—এমন খবর পেয়ে তৎকালীন বিট কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম, বনপ্রহরী সাইদুল হক, রিপনসহ আরও কয়েকজন ঘটনাস্থলে যান। তারা গাছ কাটতে বাধা দিলে রহিম উল্লাহ ধারালো কিরিচ দিয়ে বনকর্মীদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ সময় রহিম উল্লাহর ধারালো কিরিচের কোপ বনকর্মী সাইদুল হকের হাতে লাগে। এতে তার বাম হাত প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হাতটি সংযুক্ত করা হয়। তবে ২০১৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ওই বাম হাত দিয়ে তিনি স্বাভাবিকভাবে কোনো কাজ করতে পারেন না বলে জানিয়েছেন।
এদিকে, বাঘখালী বনবিভাগ ২০১৭ সালের ১ মার্চ রহিম উল্লাহকে প্রধান আসামি করে চারজনের নাম উল্লেখ এবং আরও ১০-১১ জনকে অজ্ঞাত আসামি রেখে রামু থানায় মামলা করে। বিট কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলাটি এখনো চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে। মামলার এফআইআর নম্বর ২/৫৬। বর্তমানে সাইদুল হক লামা বন বিভাগে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে স্থানীয়রা মনে করছেন, বনকর্মীর হাত কেটে দেওয়ার পরও রহিম উল্লাহ বনভূমি দখল করে সেখানে বসবাস করছেন, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। তাদের ভাষ্য, ‘আমাদের মনে হচ্ছে, এই জমি তাকে হাত কাটার উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে।’ তারা এ বিষয়ে বনবিভাগের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, চোরাকারবারি, জমি জবরদখল, সরকারি কর্মকর্তাকে মারধরসহ ডজনখানেক মামলার আসামি এবং গর্জনিয়ার কথিত ‘শাহীন ডাকাতের’ সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পরিচিত থিমছড়ির জালাল আহমদের ছেলে রহিম উল্লাহ এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শাহীন ডাকাত কারাগারে থাকলেও বর্তমানে তার গ্রুপের কার্যক্রম রহিম উল্লাহ পরিচালনা করছেন। রাতের আঁধারে ভারী অস্ত্র নিয়ে চলাফেরা এবং কারও জমি জবরদখল করতে হলে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মানুষকে চুপ করিয়ে রাখা তার কাজ বলে অভিযোগ রয়েছে।
রামুর গর্জনিয়ায় সংঘটিত কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে রহিম উল্লাহর সক্রিয় ভূমিকা থাকতে পারে বলেও মনে করছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে এ বিষয়ে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
সাইদুল হকের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, সেদিন ছিল আমার জন্য বিভীষিকাময় একটি দিন। আমার বাম হাত প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল সেই ভূমিখেকো রহিম উল্লাহ। আমি এখনো চিকিৎসা করেও আমার হাত ফিরে পাইনি। বাম হাত দিয়ে আমি কিছু করতে পারি না। সরকারি কোনো সহায়তাও আমাকে দেওয়া হয়নি। সবার সম্মিলনে আমাকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। অথচ আমার এই হাতের চিকিৎসার জন্য আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে, যা সম্পূর্ণ মানুষের কাছ থেকে ধার করে খরচ করেছি।
সাইদুল হক আরও বলেন, ‘দেশের জন্য নিজের প্রাণও দিতে প্রস্তুত। কিন্তু এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আমাকে মেরে ফেললে আমার পরিবারকে কে দেখবে? আমি এখনো পঙ্গু। আমি চাই এই বনখেকোর শাস্তি হোক, যেন আর কেউ বনকর্মীদের ওপর আক্রমণ করার সাহস না পায়।’
স্থানীয় জিয়া জানান, রহিম একজন ডাকাত প্রকৃতির লোক। তার কাছে ভারী অস্ত্র থাকার কারণে সবাই ভয় পায়। সে প্রায় ডজনের অধিক মামলার আসামি। তার অপরাধের কথা কেউ বলতে সাহস পায় না। যদি যৌথ বাহিনীর মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হয়, একদিকে বনের জায়গা দখলমুক্ত হবে, অন্যদিকে তার বাড়ি থেকে অস্ত্র উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভুক্তভোগী ওসমান জানান, বাংলাদেশের সব স্তরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আকুল আবেদন জানাচ্ছি। গর্জনিয়া ইউনিয়নের থিমছড়ি গ্রামে প্রায় ছোট-বড় দুই হাজার মানুষের বসবাস। এই সন্ত্রাসীর পরিবারের লোকজন বাদ দিয়ে গোপনে সব স্তরের নিরপেক্ষ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তদন্ত করলে তার নির্যাতন-নিপীড়নের কথা বেরিয়ে আসবে। প্রকাশ্যে কেউ বলবেন না। কারণ সে একজন অত্যন্ত ভয়ংকর প্রকৃতির লোক। এবং চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের সব অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন জানান, ঘটনার বিষয়ে আপনার কাছে জানতে পারলাম। বিষয়টি আমি বিশেষ গুরুত্ব সহকারে দেখছি।
কেকে/এলএ