বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬,
২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: জরুরি গ্যাস আমদানিসহ ৪ প্রস্তাবের নীতিগত অনুমোদন      ইউরোপীয় দেশগুলোর জাহাজ জব্দের হুঁশিয়ারি পুতিনের      প্রধানমন্ত্রীর সিল-স্বাক্ষর জাল করে প্রতারণা, ৬ জন রিমান্ডে      রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে বৈঠক ডেকেছেন তারেক রহমান      মাধ্যমিকে ফল বিপর্যয় শিক্ষাব্যবস্থার অব্যবস্থাপনারই বহিঃপ্রকাশ: সাইফুল হক      চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের অন্যতম রূপকার ঝু রংজি আর নেই      ডেঙ্গুতে এক দিনে ২ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৭২৩      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
দেশের অর্থনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত
ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১৭ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা প্যাকেজটি বাস্তবায়নে বছরে মাত্র ৮৭৩ কোটি থেকে ১ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। জাতীয় অর্থনীতিতে জলবায়ুজনিত কারণে বছরে ৭৭ হাজার কোটি টাকার যে বিশাল ক্ষতি হচ্ছে, তার তুলনায় এ বিনিয়োগ অত্যন্ত সামান্য। সামান্য এই রাষ্ট্রীয় সংস্থান নিশ্চিত করা গেলে দেশের ৮৪.৯ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক শ্রমশক্তির আয় ও স্বাস্থ্য উভয়ই সুরক্ষা পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় জিডিপি রক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব বা ‘এল নিনো’র জটিল বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা সাধারণ মেহনতি মানুষ বোঝে না। কিন্তু এর বাস্তবতা তাদের প্রতিদিনের কর্মযজ্ঞে বেশি স্পষ্ট। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা যায়—প্রচণ্ড দাবদাহে দেশের অর্থনীতি ও শ্রমজীবী মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ (আইআইইডি) এবং ‘অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম’ (ওকাপ)-এর যৌথ গবেষণাগ্রন্থ ‘টু হট টু ওয়ার্ক, টু পুওর টু রেস্ট’ জলবায়ু সংকটের এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাতকে সুন্দরভাবে উন্মোচন করেছে। দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশই ব্যক্তিগত বা অনানুষ্ঠানিক খাত। এ বিশালাকার শ্রমগোষ্ঠীর আয়ের একমাত্র উৎস তাদের উপস্থিতি ও শারীরিক উৎপাদনক্ষমতা। প্রখর তাপে ঘরের বাইরে কিংবা ভেতরে চরম প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করা শ্রমিকদের কাজের গতি কমে গেলে তা সরাসরি তাদের দৈনন্দিন আয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। প্রচণ্ড গরমে ঘরের বাইরে কাজ করা শ্রমিকেরা বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭ এবং ভেতরে কাজ করা শ্রমিকরা ১৩ দশমিক ৫ দিন করে কর্মদিবস হারাচ্ছেন। যার বার্ষিক আর্থিক ক্ষতি যথাক্রমে ১৪৮ দশমিক ৯ ডলার এবং ৮৯ দশমিক ১ ডলার। ঢাকায় টিকে থাকার জন্য প্রতিটি পরিবারের যেখানে মাসে অন্তত ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা প্রয়োজন, সেখানে এই তাপপ্রবাহের কারণে শ্রমিক পরিবারগুলো আয়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে বিশাল অঙ্কে পিছিয়ে পড়ছেন।

শ্রমিকের এই দুর্ভোগ কর্মক্ষেত্রের সীমাবদ্ধতা ছাপিয়ে বিশ্রামের ওপরও প্রভাব ফেলছে। ঘরের ভেতরে কাজ করা শ্রমিক পরিবারের ৬৬ শতাংশ এবং বাইরের কাজ করা শ্রমিকদের ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ বাস করেন টিন বা অ্যাসবেস্টসের ছাদের নিচে। অতিরিক্ত গাদাগাদি, বাতাস চলাচলের অনুপযুক্ত পরিবেশ এবং নিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে দিনের বেলা উত্তপ্ত হওয়া এসব ঘরে রাতেও গরম থাকে অনেক বেশি। ফলে শরীরের জন্য যতটুকু স্বাভাবিক ঘুম বা বিশ্রামের প্রয়োজন হয়, তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন এসব মানুষ। কাজের সময় অনিরাপদ তাপমাত্রা এবং রাতে অপর্যাপ্ত ঘুম—এ দুয়ের ঘূর্ণাবর্তে পিষ্ট হয়ে শ্রমিকরা নিজেদের সঞ্চয় ভাঙছেন কিংবা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন। শ্রমের এই ক্ষয় এবং অর্থনৈতিক ঘাটতি দেশের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিকে নীরবে দুর্বল করে দিচ্ছে।

তা ছাড়া, আইআইইডি ও ওকাপ-এর এই যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক এক জনস্বাস্থ্য চিত্র। জরিপভুক্ত শ্রমিকের ২৩ দশমিক ১ শতাংশই কিডনির নানাবিধ সমস্যায় ভুগছেন। গবেষণার প্রাক্কলন অনুযায়ী, দীর্ঘকাল ধরে অতিরিক্ত তাপে কাজ করার ফলে দেশের মোট অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকের প্রায় ৬ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, তাপপ্রবাহে প্রাণঘাতী হিটস্ট্রোকের শিকার হওয়া প্রতি ২০ জন শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ১৯ জনই কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা নেন না বা নিতে পারেন না। তার ওপর হাসপাতালগুলোতে গরমের সময় ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতাজনিত রোগীর উপচে পড়া ভিড় দেশের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চরম তাপমাত্রা ও উচ্চ তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। রাজধানী ঢাকার তাপসূচক জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া এরই এক ভয়াবহতার ইঙ্গিত দেয়। ২০২৪ সালে তাপজনিত শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে দেশ হারিয়েছিল প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস। আর নতুন গবেষণার জাতীয় প্রাক্কলন অনুযায়ী, তাপপ্রবাহে অসুস্থতা ও উৎপাদনক্ষমতা হ্রাসের কারণে বছরে দেশে নষ্ট হচ্ছে প্রায় ১১৮ কোটি কর্মদিবস। এতে শ্রমিকদের সরাসরি হারানো মজুরির পরিমাণ প্রায় ৪১০ কোটি ডলার, যা আমাদের মোট জিডিপির শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ। এর সঙ্গে যখন দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা হ্রাসের আনুমানিক ক্ষতি যোগ করা হয়, তখন মোট হারানো মজুরি দাঁড়ায় অবিশ্বাস্য ৬২২ কোটি ডলারে—যা দেশের জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ৩৮ শতাংশের সমান এবং বর্তমান বিনিময় হারে যার মূল্য প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমানের এক মূল্যায়নে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের ফলস্বরূপ সৃষ্ট এ সংকটের চরম মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক ও গুরুত্বপূর্ণ শ্রমজীবী মানুষকে। গরমে কাজের গতি কমলে কিংবা অসুস্থ হয়ে পড়লে কোনো ক্ষতিপূরণ বা সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় শ্রমিকের এ ক্ষতি পুরোপুরি আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। জীবনধারণের ন্যূনতম মান বজায় রাখতে গিয়ে তারা জমানো অর্থ ব্যয় করছেন কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। জলবায়ু তহবিলের আলোচনায় আন্তর্জাতিক মহলে যতই ক্ষতিপূরণের দাবি তোলা হোক না কেন, দেশের অভ্যন্তরে শ্রমিকের রক্তচোষা এ নীরব আর্থিক ক্ষতি প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এখনো পরিলক্ষিত হয়নি।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এ বহুমুখী সংকট মোকাবিলার পথে সবচেয়ে বড় বাধা আমাদের বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামোর চরম সীমাবদ্ধতা। বর্তমান শ্রম আইন ও বিধিমালায় কর্মক্ষেত্রে পানীয় জল, ছায়া কিংবা সাধারণ বায়ু চলাচলের কথা উল্লেখ থাকলেও কাজের জন্য তাপমাত্রার কোনো নির্দিষ্ট নিরাপদ সীমা নির্ধারণ করা নেই। এমনকি প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের সময় শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক বিরতি কিংবা প্রচণ্ড তাপে সৃষ্ট শারীরিক অসুস্থতাকে ‘পেশাগত রোগ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতাও নেই। ফলে, ৫০ ডিগ্রি ছুঁই ছুঁই তাপে পিচঢালা সড়কে কিংবা তপ্ত টিনের কারখানায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকরা যখন অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, তার দায়ভার পুরোপুরি বর্তাচ্ছে তাদের নিজেদের ওপরই। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) পরামর্শ অনুযায়ী, এ নজিরবিহীন জলবায়ু বাস্তবতায় শ্রম আইন সংশোধন এখন শুধু সময়ের দাবি। প্রযুক্তিগত উপায়ে তাপমাত্রা পরিমাপ করে একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে বাধ্যতামূলক কর্মবিরতি এবং নমনীয় কাজের সময়সূচি প্রবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

আইআইইডি ও ওকাপ-এর গবেষণায় তাপমাত্রাভিত্তিক সরাসরি নগদ সহায়তা, জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবা, পুষ্টিকর খাদ্য সহায়তা এবং কর্মস্থলে বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানীয় জল, ইলেকট্রোলাইট সরবরাহ ও ছায়াযুক্ত স্থানে বাধ্যতামূলক বিরতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা প্যাকেজটি বাস্তবায়নে বছরে মাত্র ৮৭৩ কোটি থেকে ১ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। জাতীয় অর্থনীতিতে জলবায়ুজনিত কারণে বছরে ৭৭ হাজার কোটি টাকার যে বিশাল ক্ষতি হচ্ছে, তার তুলনায় এ বিনিয়োগ অত্যন্ত সামান্য। সামান্য এই রাষ্ট্রীয় সংস্থান নিশ্চিত করা গেলে দেশের ৮৪.৯ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক শ্রমশক্তির আয় ও স্বাস্থ্য—উভয়ই সুরক্ষা পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় জিডিপি রক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

শ্রমিকের ঘাম ও রক্তে যে অর্থনীতির ভিত গড়ে ওঠে, চরম দাবদাহে সেই শ্রমিকের মানবেতর জীবনযাপন কোনোভাবেই একটি উন্নয়নকামী দেশের কাম্য হতে পারে না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর মেগা প্রকল্পের চাকচিক্যের আড়ালে যদি দেশের কোটি কোটি অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্য ও আয়ের নিরাপত্তাই ধসে পড়ে, তবে তা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মূল স্রোতের বিপরীত ভেসে যাবে। কোটি কোটি শ্রমিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক ক্ষতিকে আর অদৃশ্য থাকতে দেওয়া উচিত হবে না। তাপপ্রবাহকে একটি জাতীয় দুর্যোগ ও পেশাগত ঝুঁকি হিসেবে অবিলম্বে স্বীকৃতি দিতে হবে। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, শ্রমিকের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলেই জলবায়ু অভিঘাত সহনশীল এক শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক: চিকিৎসক ও কলামিস্ট

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  জলবায়ু পরিবর্তন   অর্থনীতি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close