দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ দামের রেকর্ড আবার গড়া হলো। রোববার রাতে জারি করা প্রজ্ঞাপনে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেন—চার ধরনের তেলের দামই লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। নতুন দামে ডিজেল ১৩৫, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রল ১৬০ ও অকটেন ১৬৫ টাকা লিটার। গত ফেব্রুয়ারিতে ডিজেলের দাম ছিল ১০০ টাকা। সাত মাসের ব্যবধানে সেই দাম ৩৫ টাকা বেড়েছে। যে সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে, সে সময়ে এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন চাপ তৈরি করবে, তা নিয়ে সংশয় নেই। সরকারের যুক্তি অস্বীকার করার উপায় নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও জাহাজভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। বর্তমান বাজারদরে শুধু ডিজেলেই লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। ব্যাংক হিসাবে বিপিসির যে অর্থ আছে, তা দুই মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্যও যথেষ্ট নয়। পাশের দেশগুলোর তুলনায় দেশে দাম কম থাকলে পাচারের ঝুঁকি বাড়ে, এটিও উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে টিকে থাকাও জনস্বার্থের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই সংকটের সমাধান কেবল ভোক্তার পকেট থেকে টাকা তুলেই হবে কি না।
ডিজেল শুধু একটি জ্বালানি নয়; এটি অর্থনীতির চাকা ঘোরানোর উপকরণ। বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও লঞ্চের পরিচালন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব পড়বে পরিবহনভাড়ায় ও পণ্যের দামে। সেচ পাম্প, ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার ও ধান মাড়াইয়ে ডিজেল লাগে বলে কৃষকের উৎপাদন খরচও বাড়বে। সার, বীজ ও কৃষি উপকরণ পরিবহনের ব্যয় বাড়ার প্রভাব পড়বে বাজারেও। শিল্প খাতে, বিশেষ করে গ্যাস-সংকটের কারণে যারা বিকল্প হিসেবে তরল জ্বালানি ব্যবহার করে, তাদের ব্যয় আরও বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি খরচের বড় অংশ গিয়ে পড়ে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর। কেরোসিনের দামও বেড়েছে, যা নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলমের আশঙ্কা, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর তেলের দাম বাড়ল, এরপর গ্যাসের দামও বাড়তে পারে। তার মতে, মানুষের কেনার সামর্থ্য কমলে রাজস্বও কমবে। অর্থাৎ ভর্তুকি কমাতে গিয়ে সরকার যা সাশ্রয় করবে, তার চেয়ে বেশি রাজস্ব হারাতে পারে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেও দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ, যারা বেসরকারি খাত, অনানুষ্ঠানিক খাত বা দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল, তাদের আয় সেই হারে বাড়েনি। এই বাস্তবতা নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা দরকার।
ফলে এই পরিস্থিতিতে এখন প্রধান কাজ এর ক্ষতি যতটা সম্ভব সীমিত রাখা এবং ভবিষ্যতের জন্য স্বচ্ছ ও টেকসই পথ তৈরি করা। এ জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি বলে আমরা মনে করছি। ডিজেলের দাম বাড়ার অজুহাতে অযৌক্তিক ভাড়া বা পণ্যের দাম বাড়ানো ঠেকাতে সক্রিয় মনিটরিং দরকার। ভাড়া নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে যৌক্তিক হার ঠিক করতে হবে। সিন্ডিকেট ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সেচ ও কৃষিযন্ত্রের ডিজেলের বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব কমাতে কৃষি প্রণোদনা ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার কথা ভাবতে হবে, যাতে আসন্ন মৌসুমে উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে না পড়ে।
বিপিসি প্রস্তাব দিয়েছিল, যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানিতে শুল্ক-কর কমানো বা প্রত্যাহার করা হোক। সরকার এই প্রস্তাব গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে সাময়িকভাবে করভার কমাতে পারে। লোকসানের হিসাব, আমদানি ব্যয়, জাহাজভাড়া ও মূল্যনির্ধারণ পদ্ধতি জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে হবে। যে মাসিক স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি চালু হয়েছিল, তার কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিয়ে পর্যালোচনা দরকার। ধাপে ধাপে সমন্বয়ের নীতি হঠাৎ বড় লাফের চেয়ে বাজারের জন্য কম ধাক্কা দেয়।
আমদানিনির্ভরতা কমাতে উৎসের বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানোর কাজ এগিয়ে নিতে হবে। বারবার আন্তর্জাতিক সংকটের ধাক্কা সামলানোর এটাই টেকসই উপায়। রাষ্ট্রীয় সংস্থার লোকসান পূরণের হিসাব যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সাধারণ মানুষের সংসার চালানোর হিসাব। আশা করি, সরকার শুধু মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণায় থেমে না থেকে জনগণের ওপর এর প্রভাব কমাতে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
কেকে/ এমএস