মানচিত্রে আঁকা কয়েকটি দাগের আড়ালে বসবাস করে মানুষের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং কখনো কখনো বৃহত্তর ভূরাজনীতির অস্থিরতা। বান্দরবানের আলীকদমের মিয়ানমার সীমান্তও এখন সেই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সাম্প্রতিক সময়ে আলীকদম সীমান্ত নিয়ে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন ও চিন রাজ্যের সংঘাত, সীমান্তের ওপারে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ, মানবপাচার ও মাদক চোরাচালানের অভিযোগের পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র প্রবেশের একটি টেলিভিশন প্রতিবেদন সেই উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, আলীকদম সীমান্তে কি সত্যিই নতুন কোনো নিরাপত্তা বাস্তবতা তৈরি হয়েছে? প্রশ্নটির উত্তর সরল নয়।
কারণ, সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়ে যে তথ্যগুলো সামনে আসছে, সেগুলোর সবকটির প্রকৃতি এক নয়। কোনোটি প্রত্যক্ষ ঘটনা, কোনোটি প্রশাসনিক নথিভুক্ত অভিযোগ, কোনোটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধান, কোনোটি স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা, আবার কোনোটি গোয়েন্দা-তথ্যনির্ভর আশঙ্কা। এসবকে একই পাল্লায় মাপলে বাস্তবতার বদলে তৈরি হতে পারে বিভ্রান্তি।
সম্প্রতি একটি টেলিভিশন প্রতিবেদনে আলীকদম সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র প্রবেশের দাবি ওঠে। জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের খবর অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন। মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং সীমান্তের ওপারে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তার পরিপ্রেক্ষিতে অস্ত্র পাচারের সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই।
কিন্তু সম্ভাবনা আর প্রমাণ এক বিষয় নয়। আলীকদমের দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টেলিভিশনে প্রচারিত প্রতিবেদনটি তার নজরে এসেছে। কিন্তু তার জানামতে, সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র আসার কোনো ঘটনা এখনো তার নজরে পড়েনি। তিনি বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) আলীকদম উপজেলা সভাপতি ফিলিপ ত্রিপুরাও সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র আসার বিষয়ে অবহিত নন বলে জানিয়েছেন। সংগঠনটির উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক থংলক ম্রোও একই কথা বলেছেন এবং এ ধরনের ঘটনায় জেএসএসের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন।
অতএব, বর্তমানে সবচেয়ে দায়িত্বশীল অবস্থান হলো, আলীকদম সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র প্রবেশের একটি গুরুতর দাবি উঠেছে, কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে তার স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। এ পার্থক্যটি আমাদের মনে রাখতে হবে। কারণ, একটি সীমান্তকে নিরাপদ রাখতে যেমন গোয়েন্দা সতর্কতা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন তথ্যের নির্ভুলতা। একটি অযাচাইকৃত খবর যেমন নিরাপত্তা সংস্থার জন্য সতর্কসংকেত হতে পারে, তেমনি তা সীমান্তবাসীর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্কও সৃষ্টি করতে পারে।
অস্ত্রের খবরের সত্যতা যাচাইয়ের অপেক্ষা থাকলেও আলীকদম সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের অন্য কারণগুলো বাস্তব। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে সীমান্তের ওপারে। মিয়ানমারের রাখাইন ও চিন রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলছে। বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ও প্রভাব বিস্তারের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিবেশও বদলে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ। আলীকদমের দুর্গম সীমান্তঘেঁষা এলাকায় রোহিঙ্গাদের চলাচল ও অনুপ্রবেশ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে মানবপাচারকারীদের সহায়তায় রোহিঙ্গাদের দেশের ভেতরে প্রবেশের অভিযোগও সামনে এসেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ এবং অস্ত্র প্রবেশকে একই ধরনের তথ্য হিসেবে দেখা যাবে না। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শী, গণমাধ্যমের সরেজমিন প্রতিবেদন এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের মতো তথ্য রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক অস্ত্র প্রবেশের দাবিটির ক্ষেত্রে এখনো তেমন স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ সামনে আসেনি। এ পার্থক্যটিই একটি দায়িত্বশীল সংবাদ ও একটি আতঙ্কনির্ভর প্রচারের মধ্যে সীমারেখা তৈরি করে।
আলীকদমের সীমান্তের ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত জটিল। পাহাড়, বন, ঝিরি-ছড়া, বিচ্ছিন্ন বসতি এবং দুর্গম পথ—সব মিলিয়ে পুরো সীমান্তকে একই মাত্রায় নজরদারির আওতায় রাখা কঠিন। এখানে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সক্ষমতার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তে বসবাসকারী মানুষ অনেক সময় এমন চলাচল দেখতে পান, যা দূরের কোনো প্রশাসনিক দপ্তর থেকে সহজে জানা সম্ভব নয়। তাই সীমান্ত নিরাপত্তার নতুন দর্শন হওয়া উচিত—নিরাপত্তা বাহিনী ও সীমান্তবাসীর মধ্যে আস্থার সম্পর্ক। স্থানীয় মানুষকে সন্দেহের চোখে দেখলে সীমান্ত নিরাপত্তা শক্তিশালী হয় না। বরং তাদের তথ্যের অংশীদার করতে হয়। একইসঙ্গে তথ্যদাতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
আলীকদম সীমান্তে মাদক ও চোরাচালানের অভিযোগও নতুন নয়। অতীতে সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক ও চোরাচালানের ঘটনায় মামলা, অভিযান এবং পণ্য জব্দের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে চোরাচালানের অভিযোগে মামলা হয়েছে। তবে কোনো মামলার এজাহারে অভিযোগ থাকা মানেই অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী প্রমাণিত হয়েছেন—এমনটি বলা যায় না। বিচারিক প্রক্রিয়ার ফলাফলই শেষ কথা। এ জায়গায় আমাদের সংবাদমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে। অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই লিখতে হবে। এজাহারের বক্তব্যকে আদালতের রায় বানিয়ে ফেলা যাবে না।
সীমান্ত নিরাপত্তার আরেকটি দুর্বল জায়গা হলো পরিচয় ব্যবস্থাপনা। রোহিঙ্গাদের ভুয়া নাগরিকত্ব সনদ দেওয়ার অভিযোগে আলীকদমের একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সীমান্ত দিয়ে একজন মানুষ অবৈধভাবে প্রবেশ করার পর যদি সে স্থানীয় প্রশাসনের কাগজপত্রের মাধ্যমে বৈধ পরিচয় অর্জন করতে পারে, তাহলে সীমান্তরক্ষার একটি বড় অংশ ভেতর থেকেই দুর্বল হয়ে যায়। সুতরাং সীমান্ত নিরাপত্তা শুধু পাহাড়ের প্রান্তে দাঁড়িয়ে পাহারা দেওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত ভোটার তালিকা, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ, ভূমি রেকর্ড—সবকিছু। সীমান্ত নিরাপত্তার আলোচনায় এই প্রশাসনিক স্তরটি আরও গুরুত্ব পাওয়া দরকার।
আলীকদমের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় যখন আমরা বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকাই। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার। কাছাকাছি ভারতের মিজোরাম। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের অভিঘাত ইতোমধ্যে সীমান্তবর্তী দেশগুলোর ওপর পড়ছে। অস্ত্র, মাদক, মানবপাচার, শরণার্থী প্রবাহ—এসব কোনো একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হয়ে থাকে না। তাই আলীকদমকে শুধু একটি প্রত্যন্ত উপজেলা হিসেবে দেখার দিন শেষ হয়েছে। এ সীমান্ত এখন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আলীকদম সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রয়োজন আছে কি না, আমার মনে হয়, এর উত্তর হ্যাঁ। কিন্তু নিরাপত্তা বাড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যদি প্রমাণিত ঘটনা, অভিযোগ, আশঙ্কা ও গুজবকে একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়, তাহলে নিরাপত্তা বাড়ার বদলে জনমনে আতঙ্ক বাড়বে। বিশেষ করে অস্ত্র প্রবেশের সাম্প্রতিক দাবিটির ক্ষেত্রে এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই। কোনো অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে কি না, অস্ত্রের চালান আটক হয়েছে কি না, মামলা হয়েছে কি না, কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না—এসব তথ্য প্রকাশ্যে এলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। একইসঙ্গে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ, মানবপাচার ও মাদক চোরাচালানের যেসব ঘটনা ইতোমধ্যে বিভিন্ন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সেগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
সীমান্তে নিরাপত্তা মানে শুধু আরও সদস্য মোতায়েন নয়। প্রয়োজন আধুনিক নজরদারি, প্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়, আন্তঃসংস্থা সহযোগিতা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা এবং সীমান্তের ওপারের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত বিশ্লেষণ। আর প্রয়োজন তথ্যের শুদ্ধতা।
আলীকদম সীমান্ত নিয়ে আমাদের অবস্থান তাই আতঙ্কের নয়, সতর্কতার। অস্ত্রের খবরকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না; আবার যাচাই ছাড়া সত্যও ধরে নেওয়া যাবে না। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকে মানবিক সংকট হিসেবে দেখতে হবে, একইসঙ্গে এর নিরাপত্তাগত ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে। মাদক ও মানবপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার অপব্যবহারের পথ বন্ধ করতে হবে। কারণ, সীমান্ত রক্ষা শুধু সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দায়িত্ব নয়। এটি রাষ্ট্র, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং গণমাধ্যম—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। আলীকদম সীমান্তে পাহারা বাড়ুক। নজরদারি বাড়ুক। কিন্তু তার চেয়েও বেশি বাড়ুক সত্যের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা। কারণ, নিরাপদ সীমান্তের প্রথম শর্ত শুধু শক্তিশালী প্রহরা নয়—সঠিক তথ্য।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেস ক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা
কেকে/এলএ