জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষণা করা উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা SDGs (Sustainable Development Goals), বাংলায় এসডিজি অর্জন বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, এটি বর্তমান বিএনপি সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করবে, তা আমরা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছি সদ্য (১০ আগস্ট) জাতীয় সম্মেলনে, যেখানে এসডিজি অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো নির্ধারণ নিয়ে বিশদ উপস্থাপন হয়েছে। আন্তরিকতম অভিনন্দন জানাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এবং প্রধান মুখ্য কর্মকর্তা প্রফেসর ড. এস এম আব্দুল আওয়াল সাহেবকে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ইভেন্টটি দেশের সবার জন্য দরকার ছিল, যা কিনা সময়োপযোগী এবং পাইওনিয়ার। অত্যন্ত সুশৃঙ্খল আমাদের এই অনুষঙ্গী প্রফেসর তার কম্প্রিহেনসিভ কাজের একটা উদাহরণ উপস্থাপন করেছেন এর মাধ্যমে।
অবশ্যই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেশ ও দিকনির্দেশনায় যা সু-সাধিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে, অর্থাৎ এই ইভেন্টটির প্রভাব ও এর আবশ্যকতায় আমার অনুধাবন এবং রায় অত্যন্ত সুস্পষ্ট বা পরিষ্কার, জাতির পক্ষ থেকে সরকার সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। যাহোক, আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি যে, জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষণা ১৭টি সুনির্দিষ্ট এসডিজি গোলের অধীনে দেশজুড়ে চলমান নানামুখী উন্নয়নমূলক কাজগুলোকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ যেমন জরুরি, তেমনি সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ (synthesis) এবং আন্তর্জাতিক মহলে সঠিক রিপোর্টিংয়ের জন্য একটি শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা থাকা অপরিহার্য। জাতিসংঘের সর্বশেষ ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট’ অনুযায়ী, ১৬৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১১০তম এবং সামগ্রিক স্কোর ৬৪.৮, যা একটু হলেও আশার আলো দেখায়। শিক্ষা সহ বেশ কিছু নির্দিষ্ট সূচকে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ভালো করছে, তবে আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য হলো এই র্যাঙ্কিংয়ে প্রথম ১০০ দেশের মধ্যে নিজেদের স্থান নিশ্চিত করা। আমার আজকের আলোচনায় এই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণে এবং পুরো মনিটরিং ব্যবস্থাকে আধুনিক রূপ দিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) এক যুগান্তকারী ভূমিকা নিয়ে কিছু আলোচনার প্রত্যাশা রাখছি।
মুদ্রাগতভাবে SDGs-এর গোলগুলোর অনেক জটিল বৈশিষ্ট্য এবং বিস্তৃত বর্ণনামূলক কাঠামো রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক ইউনিট যখন বিভিন্ন খাতে কাজ করে, তখন সেই কাজগুলোর মূল্যায়নের জন্য প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ নথিপত্র বা ডকুমেন্টেশন তৈরি হয় বা আগে তৈরি ছিল। এই বিশাল নথিপত্রের বেশিরভাগই PDF বা Word Document আকারে সংরক্ষিত থাকে বা যেকোনো সিস্টেমের স্টোরিতে পাওয়া যাবে। যাহোক, বিশাল আকারের এই আনস্ট্রাকচারড নথিপত্রগুলো লাইন ধরে পড়া, প্রতিটি খাতের অগ্রগতি যাচাই করা এবং একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাধ্য একটি কাজ। প্রথাগত বা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে বা সাধারণ সফটওয়্যার দিয়ে এত বিপুল পরিমাণ ডেটা প্রক্রিয়াকরণ করতে গিয়ে অনেক সময়ই সঠিক রিপোর্টিং বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
একটি বাস্তব প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা যাক। স্বাস্থ্য খাতের (এসডিজি ৩) অগ্রগতি নির্ধারণের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ৬৪টি জেলার শত শত উপজেলা থেকে আসা মাসিক ও প্রান্তিক রিপোর্টগুলো সমন্বয় করতে হয়। প্রতিটি রিপোর্টে মাতৃমৃত্যুর হার, টিকাদানের পরিসংখ্যান এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিবরণ থাকে। এই হাজার হাজার পৃষ্ঠার রিপোর্ট ম্যানুয়ালি পড়ে, সেগুলোকে নির্দিষ্ট সূচকের অধীনে নির্ভুলভাবে শ্রেণিবদ্ধ করে একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কার্যত অসম্ভব এবং এতে মানবিক ভুলের (human error) ব্যাপক সম্ভাবনা থেকে যায়।
যাহোক, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় শ্রেণিবিন্যাসকারী (ক্লাসিফিকেশন) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন কেবল সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যারের ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি নির্ভর করে আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে এই উদ্ভাবনকে গ্রহণ করছে তার ওপর। সমাজবিজ্ঞানী এভারেট রজার্সের ১৯৬২ সালের বিখ্যাত ‘ডিফিউশন অফ ইনোভেশন’ (Diffusion of Innovation) ফ্রেমওয়ার্ক এবং এর থেকে উদ্ভূত পরবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক প্রযুক্তি আত্তীকরণ মডেলগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, কোনো নতুন প্রযুক্তি সরকারি কাঠামোতে রাতারাতি কার্যকর হয় না। তাই, যেটা এখন দরকার, সরকারি প্রশাসনে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি গ্রহণের প্রক্রিয়াকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় আনতে কাজ শুরু করা। শুরুতে মন্ত্রণালয়ের কিছু নির্দিষ্ট ‘আর্লি অ্যাডপ্টার’ বা প্রযুক্তি-উদ্যমী শাখা পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে ক্লাসিফিকেশন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু করতে পারে। তবে মূল চ্যালেঞ্জ হলো এই প্রযুক্তিটিকে বৃহত্তর প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। আধুনিক প্রযুক্তি আত্তীকরণ তত্ত্বগুলো নির্দেশ করে যে, এই উত্তরণ ঘটাতে হলে প্রযুক্তিগত একীভূতকরণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি কৌশলগত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। ক্লাসিফিকেশন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আপেক্ষিক সুবিধা বা বর্তমান ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ার চেয়ে এটি কতটা কার্যকর, তা নীতিনির্ধারকদের কাছে দৃশ্যমান হতে হবে। পাশাপাশি, প্রযুক্তিটির ব্যবহার হতে হবে ব্যবহারকারীবান্ধব এবং বর্তমান প্রশাসনিক কার্যপ্রণালীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যাহোক, যা বলছিলাম, এই বিশাল ম্যানুয়াল কাজকে সহজ ও নির্ভুল করতে ক্লাসিফিকেশন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি কার্যকরী সমাধান বের করতে হবে। এ ধরনের এআই মূলত অগোছালো বা আনস্ট্রাকচারড ডকুমেন্টকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পড়ে তা সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে ভাগ করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (NLP) মডেলগুলো বিশাল ডেটাসেটের ভেতর থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে বের করতে অত্যন্ত পারদর্শী। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) ইতিমধ্যে তাদের কার্যক্রমে ‘SDG Meter’ নামক একটি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। এটি গুগল গবেষকদের তৈরি বিডিরেকশানাল মডেলের সাহায্যে কাজ করে। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিটি যেকোনো লেখাকে বিশ্লেষণ করে তা ১৭টি এসডিজির কোনটির সঙ্গে সম্পর্কিত, তা ৯৮% নির্ভুলতার সঙ্গে নির্ধারণ করতে পারে। ক্লাসিফিকেশন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু টেক্সট বা শব্দমালার জন্য নয়, বরং স্যাটেলাইট ইমেজ বা অন্যান্য কাঠামোহীন ডেটা বিশ্লেষণ করেও অগ্রগতি পরিমাপ করতে সক্ষম। বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর রিপোর্টিং ব্যবস্থায় এ ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল যুক্ত করা গেলে তা এসডিজির রিপোর্টিংয়ের সময় বাঁচানোর পাশাপাশি কাজের নির্ভুলতা অনেকাংশে বাড়িয়ে দেবে।
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার সরকারের কাজে অভাবনীয় স্বচ্ছতা নিয়ে আসতে পারে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে ডেটা প্রাইভেসি এবং স্বচ্ছতার বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বা কোনো ডেটাকে কীভাবে শ্রেণিবদ্ধ করছে, তা যেন ‘ব্ল্যাক বক্স’ (অস্পষ্ট) না থাকে, সেজন্য ‘গ্লাস বক্স’ (স্বচ্ছ) গভর্ন্যান্স মডেল প্রয়োগ করা অপরিহার্য। এই মডেলে এআই-এর প্রতিটি কাজের একটি নিখুঁত ‘ডিজিটাল অডিট ট্রেইল’ থাকে। ফলে কোন যুক্তিতে এআই একটি নির্দিষ্ট খাতকে বা রিপোর্টকে মূল্যায়ন করেছে, তা নীতিনির্ধারকরা সহজেই নিরীক্ষা করতে পারেন। এর মাধ্যমে সরকারি কাজে গতিশীলতা আসবে এবং জনগণের কল্যাণে নেওয়া প্রকল্পগুলোর তদারকি আরও নিবিড় ও জবাবদিহিমূলক হবে।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের জন্য এই প্রযুক্তি সফলভাবে প্রশাসনিক কাঠামোতে বাস্তবায়নে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে: পাইলট প্রজেক্ট গ্রহণ: পুরো দেশে একবারে প্রয়োগ না করে প্রথমে কোনো একটি নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ে (যেমন: শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়) ক্লাসিফিকেশন এআই-এর পাইলট প্রজেক্ট শুরু করা। কাস্টমাইজড দেশীয় এআই মডেল: ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা নথিপত্র নির্ভুলভাবে পড়ার জন্য দেশীয় আইটি এক্সপার্ট ও ভাষাবিদদের মাধ্যমে নিজস্ব এআই মডেল বা বাংলা ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং টুলস তৈরি করা। দক্ষতা উন্নয়ন: সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এআই টুলস ব্যবহারের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা, যেন তারা এই আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেন। মনে রাখা দরকার যে, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানে স্বনির্ভরতার বাংলাদেশ দর্শন এবং বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচির লক্ষ্যগুলো কৌশলগতভাবে একসঙ্গে কাজ করছে। একটি সাধারণ বাংলা ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং টুলস বা সিস্টেমসের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রশাসনিক কাঠামোতে ডেটার সুষমভাবে ব্যবহার এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালনার উন্নতি সম্ভব এবং যেটা সহজেই।
পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের উন্নয়নকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে এবং এসডিজির ১০০ র্যাঙ্কিংয়ের ভেতর প্রবেশের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো বিলাসী চিন্তা নয়। বরং আমি বলতে চাই, এটি একটি অপরিহার্য হাতিয়ার। সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যদি ক্লাসিফিকেশন এআই-এর মতো প্রযুক্তিগুলো নিজেদের মনিটরিং ও মূল্যায়নের কাজে ব্যবহার শুরু করেন, তবে বাংলাদেশ তার টেকসই উন্নয়নের পথে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং কার্যকরভাবে এগিয়ে যাবে।
লেখক: প্রফেসর ড. শাহ জে মিয়া
প্রফেসর অফ বিজনেস এনালিটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড এআই
নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া
ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের বহিঃবিশ্বে শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী পেশাজীবী এক্সপার্টিজ গ্রুপের সদস্য।
কেকে/এলএ