শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬,
৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: রামিসা হত্যা মামলার শুনানি হাইকোর্টে রোববার      তারেকের ভারত সফর ঘিরে নতুন সমীকরণ      গ্যাস-বিদ্যুতে অচলাবস্থা      আজ শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী      অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি চর্চার আহ্বান তথ্যমন্ত্রীর      ইন্দোনেশিয়ায় ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প      তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে যা বললেন রণধীর জয়সওয়াল      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
প্রোটিন নিরাপত্তাই উন্নয়নের নতুন ভিত্তি
ড. শহীদুল ইসলাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৫১ এএম আপডেট: ১৪.০৮.২০২৬ ১২:০২ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

এক সময় একটি দেশের উন্নয়নের প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচিত হতো খাদ্য উৎপাদন। একটি জাতি পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করতে পারছে কি না, মানুষ দিনে অন্তত দুই বেলা খেতে পারছে কি না—এসবই ছিল উন্নয়নের অন্যতম মানদণ্ড। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে সেই ধারণা দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। আজ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শুধু খাদ্যনিরাপত্তা নয়, পুষ্টিনিরাপত্তা এবং বিশেষ করে প্রোটিন নিরাপত্তাকে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। কারণ বিজ্ঞান এখন স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, শুধু পেট ভরানো একটি জাতিকে সুস্থ, মেধাবী ও উৎপাদনশীল করে তুলতে পারে না; তার জন্য প্রয়োজন সুষম ও উচ্চমানের পুষ্টি, যার কেন্দ্রে রয়েছে প্রোটিন।

বাংলাদেশ গত পাঁচ দশকে খাদ্য উৎপাদনে এক অভূতপূর্ব সাফল্যের গল্প রচনা করেছে। স্বাধীনতার পর খাদ্যঘাটতিগ্রস্ত দেশ থেকে আজ বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি পৌঁছেছে, মাছ উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় অবস্থান অর্জন করেছে এবং ডিম, পোলট্রি ও সবজি উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এ অর্জন নিঃসন্দেহে গর্বের। কিন্তু উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ আমাদের সামনে নতুন একটি প্রশ্ন তুলে ধরেছে—আমরা কি শুধু মানুষের পেট ভরাতে পেরেছি, নাকি তাদের শরীরের প্রকৃত পুষ্টির চাহিদাও পূরণ করতে পারছি?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রোটিনের গুরুত্ব অনিবার্যভাবে সামনে আসে। মানবদেহের প্রতিটি কোষ, পেশি, ত্বক, হাড়, রক্ত, এনজাইম, হরমোন এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার মূল নির্মাণ উপাদান হলো প্রোটিন। একটি নবজাতক শিশুর বৃদ্ধি, একজন শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কের বিকাশ, একজন শ্রমিকের কর্মক্ষমতা, একজন ক্রীড়াবিদের শক্তি, একজন গর্ভবতী মায়ের সুস্থতা এবং একজন প্রবীণের পেশিশক্তি—সবকিছুর সঙ্গেই প্রোটিনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই প্রোটিনকে শুধু একটি খাদ্য উপাদান হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের মৌলিক ভিত্তি।

প্রোটিনের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব আরও ভালোভাবে বোঝা যায় এর গঠন থেকে। প্রোটিন তৈরি হয় অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে। মানুষের শরীরে মোট ২০ ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড ব্যবহৃত হলেও এর মধ্যে ৯টি অত্যাবশ্যকীয় বা এসেনশিয়াল অ্যামিনো অ্যাসিড শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না। এগুলো অবশ্যই খাদ্যের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়। এই কারণেই সব প্রোটিনের পুষ্টিমান এক নয়। মাছ, ডিম, দুধ, মাংস এবং দুগ্ধজাত খাদ্যে এমন সব প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে, যেগুলো শরীর সহজে ব্যবহার করতে পারে। অন্যদিকে ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি, সয়াবিন, বাদাম এবং বিভিন্ন শস্যজাত খাদ্যও প্রোটিনের ভালো উৎস, তবে অনেক ক্ষেত্রে এগুলোর অ্যামিনো অ্যাসিডের ভারসাম্য ভিন্ন হয়। সুখবর হলো, প্রাণিজ ও উদ্ভিজ্জ উৎসের সঠিক সমন্বয় করলে তুলনামূলক কম খরচেও উচ্চমানের প্রোটিন নিশ্চিত করা সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সুপারিশ করেছে যে, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন প্রতি কেজি শরীরের ওজনের জন্য প্রায় ০.৮ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। অর্থাৎ ৬০ কেজি ওজনের একজন মানুষের প্রতিদিন প্রায় ৪৮–৫০ গ্রাম এবং ৭০ কেজি ওজনের একজন মানুষের প্রায় ৫৬–৬০ গ্রাম প্রোটিন দরকার। তবে এটি ন্যূনতম চাহিদা। শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী, প্রবীণ ব্যক্তি, ক্রীড়াবিদ এবং অধিক শারীরিক পরিশ্রম করেন এমন মানুষের প্রয়োজন আরও বেশি হতে পারে। পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা এখন শুধু মোট প্রোটিন নয়, প্রোটিনের গুণগত মান, হজমযোগ্যতা এবং শরীরে ব্যবহারের দক্ষতাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বাংলাদেশের খাদ্যাভ্যাস ঐতিহাসিকভাবে ভাতকেন্দ্রিক। ভাত আমাদের শক্তির প্রধান উৎস হলেও এটি একা একটি পূর্ণাঙ্গ পুষ্টিকর খাদ্য নয়। চালে কিছু প্রোটিন থাকলেও তার জৈবিক মান মাছ, ডিম বা দুধের প্রোটিনের সমতুল্য নয়। তাই খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত মাছ, ডিম, ডাল, দুধ, মাংস কিংবা সয়াবিন না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে উচ্চমানের প্রোটিনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ পর্যাপ্ত ক্যালোরি গ্রহণ করলেও শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিডের অভাব থেকে যায়। এ অবস্থা অনেক সময় চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর প্রভাব শিশুদের বৃদ্ধি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, শিক্ষাগত সক্ষমতা, কর্মক্ষমতা এবং সুস্থ বার্ধক্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদে পড়ে।

বিশ্বজুড়ে এখন প্রোটিন নিয়ে নতুন এক বিপ্লব শুরু হয়েছে। একসময় প্রোটিন বলতে শুধু মাছ, মাংস বা দুধকেই বোঝানো হতো। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, মাইক্রোঅ্যালগি, এককোষী প্রোটিন, প্রিসিশন ফারমেন্টেশন, বিকল্প প্রোটিন এবং খাদ্যবর্জ্য থেকে মূল্যসংযোজিত প্রোটিন তৈরির মতো প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চ-প্রোটিন খাদ্য এখন শুধু ক্রীড়াবিদদের জন্য নয়; বরং শিশু, প্রবীণ, কর্মজীবী মানুষ এবং সাধারণ ভোক্তাদের জন্যও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশ্ববাজারে উচ্চ-প্রোটিন খাদ্য, স্পোর্টস নিউট্রিশন, মেডিক্যাল নিউট্রিশন এবং প্ল্যান্ট-বেইজড প্রোটিনের বাজার প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। আমাদের দেশে মাছ, দুধ, ডিম, ডাল, সয়াবিন, মুগডাল, ছোলা এবং বিভিন্ন কৃষিপণ্য থেকে উচ্চমানের প্রোটিনভিত্তিক খাদ্য তৈরির বিরাট সুযোগ রয়েছে। যদি আমরা এখন থেকেই প্রোটিন নিরাপত্তাকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে পারি, তাহলে শুধু অপুষ্টি কমবে না; বরং খাদ্যশিল্পে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং রপ্তানির নতুন বাজারও তৈরি হবে।

কিন্তু প্রোটিন নিরাপত্তা বলতে আসলে কী বোঝায়? এটি কি শুধু বেশি প্রোটিন উৎপাদন, নাকি এর সঙ্গে আরও অনেক বিষয় জড়িত? কেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন আলাদা করে প্রোটিন নীতি নিয়ে কাজ করছে? আর বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি কার্যকর জাতীয় প্রোটিন নিরাপত্তা কৌশল কেমন হতে পারে?

প্রোটিন নিরাপত্তা বলতে শুধু একটি দেশে পর্যাপ্ত প্রোটিন উৎপাদনকে বোঝায় না। এর প্রকৃত অর্থ হলো—প্রতিটি মানুষ যেন সারা বছর নিরাপদ, সাশ্রয়ী, পুষ্টিকর এবং উচ্চমানের প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য সহজে কিনতে ও গ্রহণ করতে পারে। অর্থাৎ প্রোটিনের প্রাপ্যতা, ক্রয়ক্ষমতা, গুণগত মান, নিরাপত্তা এবং সুষম বণ্টন—এই পাঁচটি বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত হলেই একটি দেশ প্রকৃত অর্থে প্রোটিন নিরাপত্তা অর্জন করতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে উন্নত দেশগুলো আর শুধু কৃষি উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছে না; তারা মানুষের খাদ্যের গুণগত মান উন্নয়নের ওপরও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানে খাদ্যশিল্প দ্রুত উচ্চ-প্রোটিন খাদ্য উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে। উচ্চ-প্রোটিন দই, দুধ, পানীয়, রুটি, পাস্তা, স্ন্যাকস, শিশু খাদ্য, প্রবীণদের জন্য বিশেষ পুষ্টিপণ্য, চিকিৎসা-সহায়ক খাদ্য এবং স্পোর্টস নিউট্রিশনের বাজার প্রতি বছর সম্প্রসারিত হচ্ছে। কারণ বিজ্ঞানীরা এখন বুঝতে পেরেছেন, সঠিক প্রোটিন গ্রহণ শুধু অপুষ্টি প্রতিরোধ করে না; এটি দীর্ঘমেয়াদে কর্মক্ষমতা, মানসিক বিকাশ, সুস্থ বার্ধক্য এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। আমাদের দেশে বছরে বিপুল পরিমাণ মাছ, ডিম, দুধ, মুরগি, গরুর মাংস, ডাল এবং সয়াবিন উৎপাদিত হয়। একইসঙ্গে চালের কুঁড়া, তিল, চিনাবাদাম, মুগডাল, ছোলা, মাষকলাই এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য থেকেও মূল্যসংযোজিত প্রোটিন উপাদান তৈরি করা সম্ভব। অথচ এসব কাঁচামালের একটি বড় অংশ এখনো সীমিত মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে বাজারজাত হয়। গবেষণা, প্রযুক্তি এবং শিল্প বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে বাংলাদেশ শুধু নিজের জনগণের পুষ্টি উন্নয়নই করবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতামূলক উচ্চ-প্রোটিন খাদ্যপণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে পারবে।

প্রোটিন নিরাপত্তার সঙ্গে দেশের অর্থনীতির সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর। অপুষ্ট শিশুরা সাধারণত শারীরিক ও মানসিক বিকাশে পিছিয়ে পড়ে, যা পরবর্তী জীবনে তাদের শিক্ষা, দক্ষতা এবং আয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণকারী শিশুদের শেখার ক্ষমতা, রোগপ্রতিরোধ শক্তি এবং কর্মজীবনে উৎপাদনশীলতা তুলনামূলক বেশি হয়। অর্থনীতিবিদরা বহুদিন ধরেই বলছেন, একটি দেশের মানবসম্পদে বিনিয়োগের অন্যতম কার্যকর উপায় হলো মাতৃ ও শিশুপুষ্টির উন্নয়ন। অর্থাৎ প্রোটিনে বিনিয়োগ আসলে ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ।

তবে প্রোটিন নিরাপত্তা অর্জনের পথে বাংলাদেশের সামনে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথমত, এখনো অনেক পরিবারের খাদ্যতালিকা ভাতনির্ভর। দ্বিতীয়ত, মাছ, দুধ, ডিম ও মাংসের দাম অনেক নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য নিয়মিত কেনার মতো নয়। তৃতীয়ত, অনেক মানুষ জানেন না যে ডাল, সয়াবিন, ছোলা, মুগডাল, চিনাবাদাম এবং ছোট মাছও তুলনামূলক কম খরচে ভালো মানের প্রোটিনের উৎস হতে পারে। চতুর্থত, আমাদের দেশে উচ্চ-প্রোটিন মূল্যসংযোজিত খাদ্য উৎপাদন এখনো সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। ফলে বাজারে সাশ্রয়ী ও বৈচিত্র্যময় প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যের পরিসর আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় প্রোটিন নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন সময়ের দাবি। এই কৌশলের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা। বিদ্যালয়ের খাবার কর্মসূচিতে নিয়মিত ডিম, দুধ, ডাল বা অন্যান্য উচ্চমানের প্রোটিন অন্তর্ভুক্ত করা গেলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একইভাবে গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ নীতিতে প্রোটিন উৎপাদনকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

তৃতীয়ত, দেশের খাদ্যশিল্পকে উচ্চ-প্রোটিন খাদ্য উদ্ভাবনে উৎসাহিত করতে হবে। উচ্চ-প্রোটিন দই, পানীয়, বিস্কুট, নুডলস, শিশু খাদ্য, পুষ্টিকর স্ন্যাকস, সিনিয়র নিউট্রিশন এবং চিকিৎসা-সহায়ক খাদ্যের মতো পণ্যের দেশীয় বাজার দ্রুত গড়ে তোলা সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প খাত একসঙ্গে কাজ করলে দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মানের নতুন পণ্য তৈরি করা যাবে।

চতুর্থত, জনগণের মধ্যে পুষ্টি শিক্ষা জোরদার করতে হবে। অনেকেই এখনো মনে করেন, বেশি ভাত খেলেই শরীরের চাহিদা পূরণ হয়ে যায়। আবার অনেকে মনে করেন, ভালো প্রোটিন মানেই দামি মাংস।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা। বাংলাদেশে নিয়মিতভাবে মানুষের প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ, উৎস এবং গুণগত মান নিয়ে আরও বিস্তৃত জাতীয় জরিপ প্রয়োজন। নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কার্যকর নীতি প্রণয়ন করা কঠিন। তাই ভবিষ্যতের খাদ্য ও পুষ্টি জরিপে প্রোটিন নিরাপত্তাকে একটি স্বতন্ত্র সূচক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত, স্মার্ট ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সুস্থ, দক্ষ এবং উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী। আর সেই মানবসম্পদ গড়ে ওঠে জীবনের প্রথম দিন থেকেই সঠিক পুষ্টির মাধ্যমে। তাই খাদ্যনিরাপত্তার অর্জনের পর এখন বাংলাদেশের পরবর্তী জাতীয় লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রোটিন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

আজকের পৃথিবীতে যে দেশ তার মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ও উচ্চমানের প্রোটিন নিশ্চিত করতে পারবে, আগামীকাল সেই দেশই পাবে আরও সুস্থ শিশু, আরও দক্ষ কর্মশক্তি, আরও উদ্ভাবনী তরুণ প্রজন্ম এবং আরও শক্তিশালী অর্থনীতি। বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্যশিল্প, গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য—সব ক্ষেত্রেই সেই সম্ভাবনা রয়েছে। এখন প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক নীতিনির্ধারণ এবং সম্মিলিত উদ্যোগ। কারণ একটি জাতির প্রকৃত শক্তি শুধু তার অর্থনীতিতে নয়, তার মানুষের সুস্বাস্থ্য, মেধা ও কর্মক্ষমতায় নিহিত। আর সেই শক্তির অন্যতম ভিত্তি হলো প্রোটিন নিরাপত্তা।

লেখক : খাদ্য বিজ্ঞানী, বার্মিহাম

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:   উন্নয়ন   খাদ্য  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close