পদ্মার তীব্র স্রোত আর ভাঙনের কাছে একে একে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের বসতভিটা, ফসলি জমি, সড়ক ও বিদ্যুতের খুঁটি। চোখের সামনে নদীতে বিলীন হচ্ছে শেষ সম্বল। কেউ ঘর খুলে নিচ্ছেন, কেউ দোকানের মালামাল সরাচ্ছেন, আবার কেউ পূর্বপুরুষের কবরের দিকে তাকিয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে আছেন। চারদিকে শুধু হাহাকার আর অনিশ্চয়তা।
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পালেরচর ইউনিয়নের কাঠুরিয়া এলাকায় পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতে নতুন করে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত সাত দিনে ইটের রাস্তা, তিনটি বিদ্যুতের খুঁটি, সাতটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ প্রায় ২০০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন এখন কাঠুরিয়া ছাড়িয়ে পদ্মা সেতুর দক্ষিণ প্রান্তের জিরো পয়েন্ট থেকে পালেরচর পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাঝিরঘাট ও পালেরচর বাজারসহ আশপাশের এলাকার প্রায় ৫০০ পরিবার চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকালে কাঠুরিয়া পদ্মার পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, নদীতে প্রবল স্রোত বয়ে যাচ্ছে। একটু পরপরই নদীর পাড় ভেঙে পড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছে। ভাঙনের আতঙ্কে অনেকে স্থাপনা সরিয়ে নিচ্ছেন।
নিজের দুটি বসতঘরের টিনের চালা, দরজা ও আসবাবপত্র খুলে সরিয়ে নিচ্ছিলেন মজিদ ঘরামি (৪৮)। স্ত্রী ও পাঁচ কন্যাসন্তানকে নিয়ে কোথায় যাবেন, সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি। কথা হয় মজিদ ঘরামির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি ইঞ্জিনচালিত ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। আমার ৮ কাঠা জায়গা পুরোটা পদ্মা নদী নিয়ে যাচ্ছে। পাঁচ মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে এখন কোথায় যাব, বুঝতে পারছি না। এখানে যদি স্থায়ী বেড়িবাঁধ থাকত, তাহলে আজ ভিটেমাটি হারাতে হতো না।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বর্ষায় ভাঙন শুরু হলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় বছর ঘুরলেই আবারও নদীর আগ্রাসনের মুখে পড়তে হয় তাঁদের। তাই এবার স্থানীয়দের একটাই দাবি—‘আমরা শুকনো খাবার চাই না, নগদ টাকা চাই না, জিও ব্যাগও চাই না; আমরা চাই এখানে একটি স্থায়ী বাঁধ।’
স্থানীয়রা জানান, গত রোববার সকাল ৭টার দিকে কাঠুরিয়া এলাকায় হঠাৎ ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। বিকেল পর্যন্ত প্রায় ১০০ মিটার এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। ভাঙনের কবল থেকে নিজেদের ঘরবাড়ি ও দোকান রক্ষায় স্থানীয়রা নিজ নিজ মালামাল সরিয়ে নিতে শুরু করেন।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা ঝুঁকিতে থাকা বিদ্যুতের খুঁটি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও সড়কের ইট তুলে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীর তীরে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। গত কয়েক দিনে অন্তত ২৫টি বসতবাড়ি ও সাতটি দোকান সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ভাঙনকবলিত কাঠুরিয়া এলাকার বাসিন্দা রহমান বলেন, পদ্মার ভাঙনে তাঁর পরিবারের জমিজমা হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। এবার নদী এগিয়ে এসেছে পূর্বপুরুষের কবরের দিকে। পদ্মায় ভাঙতে ভাঙতে আমাদের সব জমিজমা চলে গেছে। এখন আমার পূর্বপুরুষ দাদার কবরের অর্ধেক অংশও ভেঙে গেছে। বাকি অংশটুকুও কিছুক্ষণের মধ্যে নদীতে চলে যাবে। শুধু চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করতে পারছি না।
ভিটে হারানোর শোকে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দা নাজমা বেগম (৬০)। তিনি জানান, গত ৪০ বছরে ছয়বার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। ‘অনেক কষ্ট করে টাকা জমিয়ে ১০ কাঠা জমি কিনেছিলাম। এখন সেই ১০ কাঠা জমিও নদী খেয়ে নিয়েছে।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বর্ষাকাল এলেই বাঁধের কাজ শুরু করে। শীতকালে যদি কাজ করত, তাহলে হয়তো আমার শেষ সম্বলটুকু হারাতে হতো না।’
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, পদ্মা সেতুর দক্ষিণ প্রান্তের জিরো পয়েন্ট থেকে পালেরচর পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা বর্তমানে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এ এলাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাঝিরঘাট, পালেরচর বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শত শত বসতবাড়ি রয়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। ভাঙনের আতঙ্কে গত সাত দিনে অনেক পরিবার নিজেদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট সরিয়ে নিয়েছে। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ অন্যের জমিতে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জাজিরার নাওডোবা ইউনিয়নের পদ্মা সেতু এলাকা থেকে জাজিরা ইউনিয়নের পাথালিয়াকান্দি পর্যন্ত ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার নদীর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। ৩৯টি প্যাকেজের মাধ্যমে এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকা।
২০২৪ সালে পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের জিরো পয়েন্ট থেকে পাথালিয়াকান্দি পর্যন্ত ৮ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার নদীর তীর রক্ষা বাঁধের কাজ শুরু হয়। পরে ২০২৫ সালে মাঝিরঘাট জিরো পয়েন্টে নদীর তীর রক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিলে প্রকল্পের সঙ্গে আরও দুই কিলোমিটার এলাকা যুক্ত করা হয়। প্রকল্পের জিরো পয়েন্ট থেকে পালেরচর পর্যন্ত তিন কিলোমিটার এলাকায় গত বছরও ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছিল। এতে কয়েকটি প্যাকেজের বাঁধের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে ওই অংশের কাজ বন্ধ রাখা হয়। এ বছর মে মাসে ১৪টি প্যাকেজের নকশা পরিবর্তন করে আবার কাজ শুরু করা হয়।
বর্তমানে কাঠুরিয়া এলাকায় প্রকল্পের ১২ ও ১৩ নম্বর প্যাকেজের আওতায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছিল। কিন্তু নদীর তীব্র স্রোতে প্রায় ২০০ মিটার এলাকায় ফেলা জিও ব্যাগ ভেসে গেছে। ভাঙনের খবর পেয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা সরেজমিনে কাঠুরিয়া এলাকা পরিদর্শন করেন।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান জানান, নদীতে পানি ও স্রোত বৃদ্ধি পাওয়ায় হঠাৎ ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রকল্পের প্রায় তিন কিলোমিটার অংশ বর্তমানে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার অংশের মধ্যে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার কাজ ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৫ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার অংশের কাজ চলমান। বর্ষা মৌসুম হওয়ায় বর্তমানে নদীতে মূল বাঁধ নির্মাণের কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে ঠিকাদাররা ব্লক তৈরির কাজ করছেন। কাঠুরিয়া এলাকায় ভাঙন ঠেকাতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।
কেকে/এলএ