শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬,
৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি চর্চার আহ্বান তথ্যমন্ত্রীর      ইন্দোনেশিয়ায় ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প      তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে যা বললেন রণধীর জয়সওয়াল      ১৫ আগস্ট ঘিরে নিরাপত্তায় মাঠে থাকছে সোয়াট-বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট      আগামী সপ্তাহে ভারত সফরে যেতে পারেন তারেক রহমান      সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯      ১৫৩ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় দিন শেষ করল বাংলাদেশ      
দেশজুড়ে
প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে উৎসবের আমেজ, উন্নয়নের স্বপ্ন কিশোরগঞ্জবাসীর
সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৪৮ এএম আপডেট: ১৫.০৮.২০২৬ ৯:৫২ এএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে কিশোরগঞ্জ। ‘জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০২৬’-এর উদ্বোধন উপলক্ষে আগামী রবিবার (১৬ আগস্ট) কটিয়াদী উপজেলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে কেন্দ্র করে জেলা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত জনপদ—সবখানেই চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। প্রশাসনিক ব্যস্ততা, রাজনৈতিক তৎপরতা এবং সাধারণ মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনায় কিশোরগঞ্জে এখন বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ।

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও চলছে নানা প্রস্তুতি। সফরস্থল ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার, সড়ক সংস্কার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জেলার দীর্ঘদিনের সমস্যা, সম্ভাবনা ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত দাবিগুলো তুলে ধরার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে কিশোরগঞ্জবাসীর কাছে এ সফর শুধু আনুষ্ঠানিকতা কিংবা উৎসবের বিষয় নয়। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে জেলার মানুষের মধ্যে নতুন করে জেগেছে উন্নয়নের প্রত্যাশা। দীর্ঘদিনের অবহেলিত সমস্যা সমাধান, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা ও চিকিৎসায় সুযোগ বাড়ানো, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্রীড়া খাতের বিকাশ—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

কিশোরগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় দাবি ভৈরব-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে কিশোরগঞ্জের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কিন্তু সড়কের বিভিন্ন অংশে যানজট, সরু সড়ক, ভাঙাচোরা অবস্থা এবং অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে প্রতিদিনই দুর্ভোগে পড়ছেন যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকেরা।

ভৈরব-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হলে শুধু যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নই হবে না, জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। কৃষিপণ্য, হাওরের মাছসহ বিভিন্ন উৎপাদিত পণ্য দ্রুত রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি নতুন শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সুযোগও বাড়বে।

সড়কের পাশাপাশি কিশোরগঞ্জ-ভৈরব রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার দাবিও দীর্ঘদিনের। একই সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে আরও দ্রুতগামী, আধুনিক ও সময়নিষ্ঠ ট্রেন চালুর দাবি রয়েছে মানুষের। জেলার মানুষ মনে করছেন, রেল যোগাযোগ উন্নত হলে কিশোরগঞ্জের সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য এলাকার যোগাযোগ আরও সহজ হবে। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি কমবে। পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও রেল যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ও বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী শরীফুল আলম বলেন, “বর্তমানে ভৈরব-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ সড়কের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ও ভঙ্গুর। তাই এটিকে চার লেনে উন্নীত করার দাবি আমরা জানিয়েছি এবং বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। সড়কের পাশাপাশি রেল যোগাযোগ নিয়েও মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “কিশোরগঞ্জ-ভৈরব রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার পাশাপাশি রাজধানীর সঙ্গে আরও দ্রুতগামী ও আধুনিক ট্রেন চালুর বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”

কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও জেলার মানুষের প্রত্যাশা দিন দিন বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, একাডেমিক ভবন, আবাসিক সুবিধা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে।

জেলার শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা ও অন্যান্য জেলায় যেতে বাধ্য হন। স্থানীয়ভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় কার্যকরভাবে গড়ে উঠলে জেলার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও কিশোরগঞ্জ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

মন্ত্রী শরীফুল আলম বলেন, “কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম এগিয়ে যাচ্ছে এবং উপাচার্য নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।”

কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বন্ধ শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালুর দাবিও জোরালো হচ্ছে। কিশোরগঞ্জ টেক্সটাইল মিলস, কালিয়াচাপড়া সুগার মিল এবং ভৈরবের দুটি জুট মিল পুনরায় চালু করা গেলে জেলার অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠান চালু হলে সরাসরি কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ছোট-বড় ব্যবসা ও নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে। তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং জেলার বাইরে চাকরির জন্য ছুটে যাওয়ার প্রবণতাও কিছুটা কমতে পারে।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন সময়ের অন্যতম দাবি। কিশোরগঞ্জে কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সম্ভাবনাময় অন্যান্য খাতেও বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি রয়েছে।

উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও কিশোরগঞ্জবাসীর অন্যতম বড় প্রত্যাশা। প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে।

হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হলে কিশোরগঞ্জের মানুষকে জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য বারবার ঢাকায় ছুটতে হবে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বিশেষায়িত চিকিৎসা, উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, জরুরি চিকিৎসা এবং পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি রয়েছে।

এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল এবং জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসক, নার্স, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ ও জরুরি চিকিৎসাসেবা বাড়ানোর দাবি রয়েছে।

কিশোরগঞ্জের ক্রীড়াক্ষেত্রের রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। বিশেষ করে নিকলীর সাঁতারুরা জাতীয় পর্যায়ে সুনাম অর্জন করে আসছেন। কিন্তু জেলার ক্রীড়াবিদদের নিয়মিত অনুশীলনের জন্য পর্যাপ্ত আধুনিক অবকাঠামো নেই। এ কারণে নিকলী অথবা জেলা সদরে একটি আধুনিক সুইমিংপুল নির্মাণের দাবি রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় মানের স্টেডিয়াম, ইনডোর স্পোর্টস কমপ্লেক্স এবং বিভিন্ন খেলাধুলার জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন সুবিধা গড়ে তোলার প্রত্যাশা জানিয়েছেন ক্রীড়া সংগঠকরা।

জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের উদ্বোধন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কিশোরগঞ্জ সফর হওয়ায় জেলার মৎস্য খাত নিয়েও মানুষের প্রত্যাশা রয়েছে। কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর, বিল ও জলাশয় মাছ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক ব্যবস্থাপনা, মাছের অভয়াশ্রম, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং আধুনিক মৎস্যচাষের সুযোগ বাড়ানো গেলে এ খাতে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একই সঙ্গে হাওরের কৃষকদের জন্য আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, ফসল সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার দাবি রয়েছে। কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর সফর সফল করতে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় হয়েছে। সফরকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ডও চলছে।

জেলার উন্নয়নসংক্রান্ত দাবিগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তুলে ধরার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশাগুলো সরকারের নজরে এনে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্ত্রী শরীফুল আলম বলেন, “এটি শুধু একদিনের কোনো বিষয় নয়। আগামী পাঁচ বছরে আমাদের যে মেয়াদ রয়েছে, সেই সময়ের মধ্যে কিশোরগঞ্জের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ও দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার জন্য আমরা কাজ করতে চাই।”

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে কিশোরগঞ্জবাসীর আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। কেউ চান উন্নত সড়ক, কেউ চান আধুনিক রেল যোগাযোগ। কেউ চান বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কেউ চান উন্নত চিকিৎসা ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ। আবার কেউ চান হাওরের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন ও মৎস্য খাতকে আরও সমৃদ্ধ করা।

জেলার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর সফর কিশোরগঞ্জের উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত প্রকল্প ও দাবিগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলে বদলে যেতে পারে জেলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিত্র।


কেকে/সাশ 


আরও সংবাদ   বিষয়:  প্রধানমন্ত্রীর আগমন   উন্নয়ন   কিশোরগঞ্জ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close