নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের ডিসি রোড নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশ করায় উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে ওই ইউনিয়নে ভবিষ্যতে আর কোনো উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়া হবে না বলেও তিনি হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে প্রকৌশলী এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সম্প্রতি নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের কয়েকজন বাসিন্দা রাস্তার নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হকের সঙ্গে দেখা করেন। তারা সড়কের নিম্নমানের কাজ তদন্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ অপসারণ, পুনরায় নির্মাণ এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এ সময় উপস্থিত লোকজনের সামনে উপজেলা প্রকৌশলী ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, “আপনারা ছবি তুলে পোস্ট করতে থাকেন, এই ইউনিয়নে আর কোনো বরাদ্দ দেওয়া হবে না।”
আম্পান প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নিঝুমদ্বীপ ডিসি রোডের সাড়ে তিন কিলোমিটার উন্নয়নকাজ শুরু হয়। কাজটি পেয়েছে এম আলী কর্পোরেশন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পরে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে কাজটি সাব-কন্ট্রাক্টে নেন আবদুল হাই আরাম নামে এক ব্যক্তি। ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই কাজ শুরু হয়। ২০২৬ সালের অক্টোবরে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এরই মধ্যে কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের ইট, বালু, রড ও খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও সড়কের নির্ধারিত পুরুত্বও ঠিক রাখা হচ্ছে না। নির্মাণ করা সড়কের কিছু অংশ সামান্য বৃষ্টিতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ওপরের স্তর উঠে গেছে। কোথাও কোথাও সড়কের অংশ ধসে পড়েছে। নিম্নমানের কাজের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর ক্ষতিগ্রস্ত অংশে সিমেন্টের ঘোলা ছিটিয়ে তা ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।
নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের বাসিন্দা হাফেজ মাওলানা ইলিয়াস উদ্দিন বলেন, “আমি ইমাম, মোয়াজ্জেম ও খাদেমদের কাগজ সত্যায়িত করার জন্য উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে যাই। কথাবার্তার একপর্যায়ে নিঝুমদ্বীপের রাস্তার কাজের অনিয়মের বিষয়টি তুললে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে যান। একপর্যায়ে তিনি বলেন, আপনারা ছবি তুলে ফেসবুকে দেন। এখন তো কাজ বন্ধ রেখেছি। আর কাজ হবে না। নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নে আর কোনো নতুন বরাদ্দ যাবে না।”
তিনি আরও বলেন, “ফেসবুকে অনিয়মের বিষয়ে প্রতিবাদ করায় একটি ইউনিয়নের বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”
স্থানীয় বাসিন্দা সুজন উদ্দিন বলেন, “আমরা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে পোস্ট করিনি। আমরা রাস্তার কাজের অনিয়মের ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিয়েছি। কারণ সরকারি টাকায় কাজ হচ্ছে, কাজটি ভালো হওয়া দরকার। রাস্তা যেন টেকসই হয়, সেটিই আমরা চাই।”
স্থানীয় বাসিন্দা হাসানুল বান্না ফুয়াদ বলেন, “সরকারি উন্নয়নকাজে অনিয়মের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা নাগরিকদের অধিকার। ছবি প্রকাশের কারণে একটি ইউনিয়নের উন্নয়ন বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি কেন দেওয়া হবে? নিঝুমদ্বীপের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা এমনিতেই দুর্ভোগপূর্ণ। দীর্ঘদিনের দাবির পর গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের নির্মাণকাজ শুরু হলেও নিম্নমানের মালামাল ব্যবহারের কারণে কাজ শেষ হওয়ার আগেই সড়কটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
স্থানীয়দের দাবি, সড়কটির নির্মাণকাজের মান নিয়ে শুরু থেকেই অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি এলজিইডির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও উপজেলা প্রকৌশলীকে জানানো হলেও কাজের মানে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি। পরে স্থানীয়রা বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনার চেষ্টা করেন। বর্তমানে সড়কটির নির্মাণকাজ সাময়িক বন্ধ রয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক বলেন, “আম্পান প্রকল্পের আওতায় নিঝুমদ্বীপে ডিসি রোডের কাজ চলমান আছে। সম্প্রতি স্থানীয়দের কাছ থেকে কিছু অভিযোগ ও ভিডিও এসেছে। এগুলো আমরা অবগত হয়েছি। ঠিকাদারকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সরকারের নীতিমালার বাইরে কাজ করলে কাজ বন্ধ থাকবে। সেই অনুযায়ী বর্তমানে কাজটি বন্ধ রয়েছে।”
বরাদ্দ না দেওয়ার হুমকির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “আমি তাকে বলেছি, ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার কারণে আমরা বিব্রত হই। বরাদ্দ দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়ে কোনো ধরনের হুমকি আমি দিইনি। বরাদ্দ দেওয়ার এখতিয়ার তো আমার নয়।”
কেকে/সাশ