শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬,
৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আট শিশুর মৃত্যু      রামিসা হত্যা মামলার শুনানি হাইকোর্টে রোববার      তারেকের ভারত সফর ঘিরে নতুন সমীকরণ      গ্যাস-বিদ্যুতে অচলাবস্থা      আজ শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী      অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি চর্চার আহ্বান তথ্যমন্ত্রীর      ইন্দোনেশিয়ায় ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প      
দেশজুড়ে
ভিক্ষা করে চলে সংসার, বিধবা ফজিলার জোটেনি ভাতার কার্ড
এম আর সাইফুল, মাদারগঞ্জ (জামালপুর)
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৪০ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

বয়স ৬০ বছর। জীবনের এই সময়ে এসে বিশ্রামে থাকার কথা থাকলেও প্রতিদিন ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বের হতে হয় ফজিলা বেগমকে। মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে পাওয়া সামান্য চাল-টাকায় চলে ছয় সদস্যের সংসার। কোনো দিন ভিক্ষায় বের হতে না পারলে সেদিন পরিবারটির চুলায় আগুন জ্বলে না।

জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার গুনারীতলা ইউনিয়নের পশ্চিম মোসলেমাবাদ এলাকার বাসিন্দা ফজিলা বেগম। সাত বছর আগে স্বামী খোকা মিয়া মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে।

একমাত্র ছেলে, পুত্রবধূ ও তিন নাতিকে নিয়ে কোনোরকমে দিন কাটছে তাদের। অথচ স্বামীর মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সরকারি বিধবা ভাতার কার্ড পাননি তিনি।

ফজিলার পরিবারের নিজস্ব কোনো জায়গাজমি নেই। অন্যের জায়গায় টিন দিয়ে তৈরি জরাজীর্ণ একটি ঘরেই ছয়জনের বসবাস। ঘরটিতে বিদ্যুৎ, টিউবওয়েল কিংবা শৌচাগারের কোনো ব্যবস্থা নেই।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, ছোট্ট ঘরটিতে দুজনের পাশাপাশি দাঁড়ানোও কষ্টকর। দুটি খাট ও কয়েকটি হাঁড়িপাতিল ছাড়া তেমন কোনো আসবাব নেই। টিনের বেড়া ও ছাউনির অবস্থাও নাজুক। বাইরে থেকে ঘরটিকে পরিত্যক্ত কোনো স্থাপনা মনে হলেও এটাই পরিবারটির একমাত্র আশ্রয়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফজিলা পাঁচ বোনের একজন। বাবার সামান্য জমি বোনদের মধ্যে ভাগ হলে নিজের অংশে স্বামী খোকা মিয়াকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন তিনি। খোকা মিয়া দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন। অভাবের কারণে একসময় সেই জমিও বিক্রি করে দিতে হয়। পরে অন্যের জায়গায় ঘর তুলে থাকতে শুরু করেন তারা।

জীবনের শেষদিকে খোকা মিয়াও ভিক্ষা করে সংসার চালাতেন। তার মৃত্যুর পর সংসারের পুরো ভার পড়ে ফজিলার ওপর। একমাত্র ছেলে শহীদুল্লাহ কোনো কাজ করতে পারেন না। ফলে বয়স ও শারীরিক দুর্বলতা উপেক্ষা করেই পরিবারের খাবারের জোগান দিতে তাকে ভিক্ষায় বের হতে হয়।

পরিবারের অভিযোগ, সরকারি সহায়তার আশায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তারা কোনো সহযোগিতা পাননি।

ফজিলার পুত্রবধূ আবেদা বেগম বলেন, “আমার স্বামী কোনো কাজ করতে পারেন না। শাশুড়ি ভিক্ষা করে যা আনেন, তা দিয়েই ছয়জনের সংসার চলে। তিনি একদিন বের হতে না পারলে আমাদের না খেয়ে থাকতে হয়। আমাদের কোনো জায়গাজমি নেই। অন্যের জায়গায় ছোট্ট একটি ঘরে থাকছি।”

অভাবের মধ্যেও নাতিদের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে পরিবারটি। ফজিলার তিন নাতির মধ্যে একজন এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। অন্য দুজনের একজন ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং আরেকজন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে।

নিজের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ফজিলা বেগম। তিনি বলেন, “আমরা খুবই অসহায়। আমাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। ভিক্ষা করে সংসার চালাই। আমার কোনো ভাতার কার্ড হয়নি। জায়গাজমিও নেই। সরকারের কাছে অনুরোধ, মৃত্যুর আগে যেন একটি ঘর ও একটু জায়গা পাই।”

প্রতিবেশী তুষার আহমেদ বলেন, “পরিবারটি খুবই দরিদ্র। বৃদ্ধা ভিক্ষা করে যা পান, তা দিয়েই সংসার চলে। আমরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করি। কিন্তু ছয়জনের সংসার চালানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়। সরকারি সহায়তা পেলে পরিবারটি কিছুটা স্বস্তি পেত।”

আরেক প্রতিবেশী মিজানুর রহমান বলেন, “আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ফজিলা বেগম ও তার ছেলেকে একটি ঘর দেওয়া হলে তাদের থাকার কষ্ট অনেকটাই কমে যেত।”

মাদারগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও প্রবেশন কর্মকর্তা তৌফিকুল ইসলাম খালেক বলেন, “ফজিলা বেগম বিধবা ভাতার আওতায় আসেননি, বিষয়টি আগে জানা ছিল না। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ অনলাইনে আবেদন করলে তাকে ভাতার আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হবে।”

তিনি আরও বলেন, “সরকার ভিক্ষুক পুনর্বাসনে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ফজিলা বেগমের পরিবারের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া যায়, সেটিও দেখা হবে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী বলেন, “ফজিলা বেগমের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। তাকে দ্রুত বিধবা ভাতার আওতায় আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও থামেনি ফজিলার সংগ্রাম। ছয় সদস্যের পরিবারের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দিতে এখনো প্রতিদিন ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় তাকে। সরকারি সহায়তার আশ্বাসই এখন তার পরিবারের বেঁচে থাকার অন্যতম ভরসা।


কেকে/সাশ 



আরও সংবাদ   বিষয়:  ভিক্ষাবৃত্তি   বিধবা   ভাতার কার্ড  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close