রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬,
১ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ে টাইগারদের প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন      অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ      জবাবদিহিতা থাকলে সরকারের পদক্ষেপ জনকল্যাণমুখী হবে      দুপুরের মধ্যে যেসব জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের আভাস      টুইট করে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যাবে না, যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজয় মেনে নেওয়ার আহ্বান ইরানের      প্রধানমন্ত্রীর কিশোরগঞ্জ সফর : নিরাপত্তায় পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ      পাঁচ দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা, হতে পারে ভারী বর্ষণ      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
জ্বালানি সংকটে বাড়ছে অর্থনীতির ঝুঁকি
মোতাহার হোসেন
প্রকাশ: রোববার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৫৫ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি যে গভীর সংকটে পড়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তারই আরেকটি সতর্কবার্তা। এ সংকটে দেশের অর্থনীতি, মানুষ, মানুষের জীবনযাত্রা, শিল্পকারখানা, যানবাহন চলাচল ব্যবস্থায় মারাত্মকভাবে ছন্দপতন ঘটছে। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ, গ্যাস সংকটে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। বেসরকারি হিসেবে গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। ইতোমধ্যে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রায় দেড় সহস্রাধিক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গ্যাসের সরবরাহ কমতে কমতে জাতীয় গ্রিডে নেমে এসেছে প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুটে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ অর্ধেকের কাছাকাছি। গত ১৬ বছরের মধ্যে এমন নিম্ন সরবরাহের নজির বিরল। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, আবাসিক গ্রাহক ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। জ্বালানি পরিস্থিতি সম্পর্কে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘সংকট উত্তরণে কিছুটা সময় লাগবে, আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই সরকারের।’

উল্লেখ্য, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালগুলোকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সৌদি আরামকোর সরবরাহ করা একটি এলএনজি কার্গো গ্রহণে জটিলতা তৈরি হওয়ায় আমদানি করা গ্যাস সরবরাহে নতুন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এর আগে আগুনের ঘটনায় এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এলএনজি সরবরাহে সামিটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছিল। ফলে একটি টার্মিনালে সমস্যা দেখা দিতেই পুরো জ্বালানি ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ছে। এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—একটি দেশের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা কেন এতটা সীমিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল থাকবে?

সরকারি মহলের বক্তব্য, ‘গ্যাস সংকটের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রে’ সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় ৬৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হতো, এখন তা বেড়ে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা ধরে রাখা সম্ভব হলেও শিল্প, আবাসিক ও অন্যান্য খাতে গ্যাস সরবরাহ ভয়াবহভাবে কমে গেছে। তিন সপ্তাহ আগেও এসব খাতে ১৬০ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ৮৫ কোটিতে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে শিল্পে গ্যাস কম দেওয়ার এ সিদ্ধান্ত হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে যৌক্তিক মনে হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য অনেক বেশি। গ্যাসের অভাবে কারখানা বন্ধ হলে শুধু উৎপাদনই কমে না; শ্রমিকের কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বিনিয়োগ, সরবরাহব্যবস্থা এবং সরকারের রাজস্ব সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইতোমধ্যে শিল্প উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে দেশের শিল্প খাত বড় ধরনের প্রতিযোগিতামূলক সংকটে পড়বে। একইসঙ্গে এসব শিল্পে কর্মরত শ্রমিক চাকরি হারাবে।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ডাইং, স্পিনিং, ইস্পাত, কাচ, সিরামিক ও অন্যান্য ভারী শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব শিল্পের অনেকগুলোতে উৎপাদন একবার বন্ধ হলে তা দ্রুত স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা যায় না। কাচের মতো শিল্পে চুল্লি বন্ধ হয়ে গেলে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে সাময়িক গ্যাস সংকট কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।

উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, সংকট এখন বিদ্যুৎ খাতেও ফিরে আসছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে লোডশেডিং শুরু হয়েছে। জাতীয় পর্যায়েও বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে বেশি গ্যাস দেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। এতে বোঝা যায়, বর্তমান সংকট শুধু গ্যাসের নয়; এটি একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের আন্তঃসম্পর্কিত জ্বালানি সংকট।

এই পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, এলএনজি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করতে হবে। সামিট টার্মিনালে নতুন কার্গো যুক্ত করার সম্ভাবনা থাকলেও শুধু একটি কার্গোর ওপর নির্ভর করে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এক্সিলারেটের ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালও দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে কার্গো গ্রহণ, বীমা, চুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় যেন শেষ মুহূর্তে জটিলতা তৈরি না হয়, সে বিষয়েও কঠোর প্রস্তুতি প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই। দেশীয় গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন বাড়ানো, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, এলএনজি অবকাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসের উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভর করে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

তৃতীয়ত, গ্যাস বণ্টনে অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নীতিমালা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শিল্পকে দীর্ঘদিন গ্যাসবঞ্চিত রেখে বিদ্যুৎ সরবরাহও টেকসই রাখা যাবে না। শিল্পে উৎপাদন বন্ধ হলে বিদ্যুতের চাহিদা কমতে পারে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে অর্থনীতি ভালো আছে। বরং সেটি হবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হওয়ার লক্ষণ।

সরকারকে তাই সংকট ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি শিল্পের জন্য একটি জরুরি জ্বালানি পরিকল্পনা দিতে হবে। কোন খাতে কত গ্যাস দেওয়া হবে, কতদিন সংকট চলতে পারে এবং উদ্যোক্তারা কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন—এসব বিষয়ে আগাম স্পষ্ট তথ্য থাকা প্রয়োজন। অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ ও ব্যবসার জন্য সংকটের চেয়েও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।

গ্যাস ও বিদ্যুতের বর্তমান সংকট আমাদের দীর্ঘদিনের জ্বালানি পরিকল্পনার দুর্বলতাও সামনে নিয়ে এসেছে। বারবার সাময়িক ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বদলে এখন প্রয়োজন সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক জ্বালানি নীতি। পাশাপাশি নতুন নতুন গ্যাস কূপ অনুসন্ধান, উত্তোলন, আমদানি অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সঞ্চালন-বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

শিল্প বন্ধ রেখে বিদ্যুৎ সচল রাখা যেমন টেকসই সমাধান নয়, তেমনি বিদ্যুৎ সংকটকে উপেক্ষা করে শিল্প চালু রাখাও সম্ভব নয়। তাই প্রত্যাশা গ্যাস ও বিদ্যুৎ দুই খাতকে আলাদা করে নয়, জাতীয় অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বর্তমান সংকট তাই শুধু কয়েক দিনের সরবরাহ ঘাটতি হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত হিসেবে নিয়ে এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক—বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  জ্বালানি সংকট  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close