মৎস্যসম্পদ শুধু সরকারের নয়, এটি সবার সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষার দায়িত্বও সবার বলে মন্তব্য করেছেন দিনাজপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া।
রোববার (১৬ আগস্ট) উপজেলা পরিষদ হলরুমে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আয়োজনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
হুইপ বলেন, ‘শুধু প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর করে মৎস্যসম্পদ রক্ষা করা সম্ভব নয়। চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালের মতো ক্ষতিকর জাল বন্ধে সাধারণ মানুষকে সচেতন হয়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘একসময় দেশের মানুষ সাধারণ সুতার জাল দিয়ে মাছ ধরত। পুকুর, নদী, খাল-বিল ও প্রাকৃতিক জলাশয় থেকেই মানুষের মাছের চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ হতো। সময়ের সঙ্গে মাছ চাষের পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এখন শুধু বাড়ির পুকুরে নয়, সরকারি পুকুর, খাস জলাশয় ও বিভিন্ন জলাশয়েও পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষ হচ্ছে। অনেক মানুষ মাছ চাষকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ফলে মৎস্য খাতের সঙ্গে অসংখ্য মানুষের জীবিকা ও কর্মসংস্থান জড়িয়ে গেছে।’
মাছের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি কিছু ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড মৎস্যসম্পদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে হুইপ বলেন, ‘আগে সাধারণ জাল দিয়ে মাছ ধরা হলেও বর্তমানে কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারির মতো জালের ব্যবহার বেড়েছে। এসব জালে শুধু বড় মাছ নয়, ছোট মাছ ও পোনাও ধরা পড়ে। ফলে মাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হয়।’
হুইপ বলেন, ‘আমি যদি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি কেউ কারেন্ট জাল বা চায়না জাল ব্যবহার করছে, তাহলে আমাদেরও তাকে প্রশ্ন করা উচিত—এই জাল কেন ব্যবহার করছেন? কিন্তু আমরা অনেক সময় কিছু বলি না। আমরা অপেক্ষা করি প্রশাসন যাবে, পুলিশ যাবে, তারা জাল ধরে নিয়ে আসবে। এটা কি সব জায়গায় সম্ভব?’
তিনি বলেন, রাতের আঁধারে অনেক সময় জলাশয়, খাল-বিল কিংবা নিচু জমিতে নিষিদ্ধ জাল বসানো হয়। প্রতিটি এলাকায় প্রশাসনের পক্ষে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা সম্ভব নয়। তাই স্থানীয় মানুষকে নিজেদের এলাকার মৎস্যসম্পদ রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। কোথাও নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার হতে দেখলে প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে।
দেশীয় মাছের প্রসঙ্গ তুলে হুইপ বলেন, একসময় বর্ষা মৌসুম এলেই নদী, খাল, বিল ও প্রাকৃতিক জলাশয়ে টেংরা, পাবদা, কৈসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ সহজেই পাওয়া যেত। বর্তমানে অনেক দেশীয় মাছ আগের মতো প্রাকৃতিক জলাশয়ে পাওয়া যায় না। বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর জাল ব্যবহারের কারণে মাছের বংশবিস্তার ও প্রাকৃতিক প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, কিছু মাছের প্রজাতি একসময় প্রায় হারিয়ে গেলেও পরিকল্পিত মাছ চাষের মাধ্যমে সেগুলোর অনেকগুলো আবার উৎপাদনের আওতায় এসেছে। তবে শুধু পুকুরে মাছ চাষ করলেই হবে না, প্রাকৃতিক জলাশয় ও মাছের প্রজননক্ষেত্রও সংরক্ষণ করতে হবে।
মৎস্যসম্পদের ক্ষতির জন্য শুধু নিষিদ্ধ জাল নয়, কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়েও সতর্ক করেন হুইপ। তিনি বলেন, জমিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ পানির সঙ্গে জলাশয়ে গিয়ে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর ক্ষতি করতে পারে। তাই কৃষকদের কীটনাশক ব্যবহারে আরও সতর্ক হতে হবে।
পুকুরে বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধনের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। হুইপ বলেন, ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুকুরে বিষ প্রয়োগ করে শত শত কিংবা হাজার হাজার মাছ মেরে ফেলার ঘটনা ঘটে। কিন্তু অনেক সময় যথাযথ প্রমাণ না থাকায় এসব ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
হুইপ আখতারুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘মূল যে ক্ষতিটা হচ্ছে, সেটা হলো আমরা নিজেরাই যথেষ্ট সচেতন নই। আমরা নিজেরা যদি ক্ষতির বিপক্ষে দাঁড়াই, তাহলে অনেক ক্ষতি দূর করতে পারি।’
তিনি মৎস্যচাষি, মৎস্যজীবী, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। তার মতে, প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে—এই অপেক্ষায় না থেকে নিজেদের এলাকার জলাশয়, মাছ ও জলজ সম্পদ রক্ষায় স্থানীয় জনগণকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান সরকারের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দিনাজপুর জেলা বিএনপির অর্থবিষয়ক সম্পাদক ও ভাবকী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রবিউল আলম তুহিন, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক চৌধুরী বিএসসি এবং উপজেলা বিএনপির সদস্য সাঈয়েদ আহমেদ সেলিম বুলবুল।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) অয়ন ফারহান শামস, ভেড়ভেড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম বাবুল, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মো. ওয়াইদুর রহমান, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবু হায়দার আলী, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জ্যোৎস্না আরা বেগম, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. তমিজুল ইসলামসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, মৎস্যচাষি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
আলোচনা সভায় নিরাপদ মাছ উৎপাদন, আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ, দেশীয় প্রজাতি সংরক্ষণ এবং নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। পরে মৎস্য খাতে অবদান রাখা ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
কেকে/ এমএস