যশোরের কেশবপুরে দুই বছরের ব্যবধানে একই খাল পুনঃখনন দেখিয়ে সরকারি অর্থের অপচয় ও আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার বাঁশবাড়িয়া খাল খনন প্রকল্পে খননকাজ, শ্রমিকের মজুরি ও গাছ রোপণসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি ৫ থেকে ৩০ টাকা দামের ছোট চারা গাছের বিপরীতে প্রতিটির জন্য ৫০১ টাকা করে ভাউচার করার তথ্যও উঠে এসেছে। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পক্ষে সাফাই গাইছেন প্রকল্প কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী দেব কুমার।
রোববার (১৬ আগস্ট) যশোর জেলা প্রশাসকের নির্দেশে খালটি পরিদর্শন করেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শেখ আব্দুল কাদের।
সরেজমিন পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে খাল খনন ও গাছ রোপণে কিছুটা দুর্নীতি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তদন্ত শেষে অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানা যাবে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ধর্মপুর ব্রিজ থেকে ৩ দশমিক ৩৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁশবাড়িয়া খাল পুনঃখননের জন্য ৫১ লাখ ৫৪ হাজার ১৮১ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ২৩ মে কাজ শুরু হয়ে ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। সাগরদাঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. কামরুল ইসলামকে প্রকল্প সভাপতি করা হলেও বাস্তবে কাজ করেন মোকলেছুর রহমান মুকুল।
অভিযোগ রয়েছে, দুটি এক্সকাভেটর দিয়ে মাত্র ৮ থেকে ১০ দিন, প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা করে খননকাজ চালানো হয়। অথচ প্রকল্পের কাগজপত্রে ৭৯৫ দশমিক ৩৮ ঘণ্টা কাজ দেখিয়ে ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৯৬৭ টাকা বিল করা হয়েছে।
ঠিকাদার মোকলেছুর রহমান মুকুল দাবি করেন, ‘আমার এক্সকাভেটর ভাড়া নিয়ে প্রকল্প চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম খাল খনন করিয়ে নিয়েছেন। আমি এখনো এক্সকাভেটরের ভাড়া পাইনি। আমি কোনো ঠিকাদারি করিনি। টাকা পাওয়ার জন্য তাগাদা দিলেও তারা টাকা দেয়নি।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্টরা নিজেদের মধ্যে টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করেছেন এবং এতে প্রকল্প কার্যালয়েরও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ৬ লাখ ২৪ হাজার ৪০০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেখিয়ে মোট ৪৫ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ টাকা ব্যয় হিসেবে চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে। আর এসব অনিয়মের বৈধতা দিয়ে সাফাই গাইছেন সহকারী প্রকৌশলী দেব কুমার।
প্রকল্পের আওতায় খালের দুই পাড়ে ৩০০টি বনজ ও ফলজ গাছের চারা রোপণের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার ৪২৩ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের একাংশে সামান্য কিছু গাছ লাগানো হলেও মেহেরপুর এলাকায় কোনো গাছই লাগানো হয়নি। যেসব ছোট চারা রোপণ করা হয়েছে, সেগুলোর বাজারমূল্য ৫ থেকে ৩০ টাকা হলেও ভাউচারে প্রতিটি গাছের দাম দেখানো হয়েছে ৫০১ টাকা।
শ্রমিকের মজুরিতেও অনিয়মের অভিযোগ
প্রকল্পে ১১৪ জন শ্রমিকের বিপরীতে প্রতিদিন ৫০০ টাকা মজুরি দেওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিকদের ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শ্রমিক জানান, প্রকল্পের পুরো মেয়াদে কাজ না করিয়ে মাত্র ৮ থেকে ১০ দিন ৫০-৬০ জন শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হয়েছে। পরে কাগজপত্রে পূর্ণ সময়ের শ্রমিক দেখিয়ে ভাউচার করা হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
সাগরদাঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী মোস্তাফিজুর রহমান মুক্ত বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে বিএডিসির অর্থায়নে বাঁশবাড়িয়া খালটি খনন করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো স্থানে একবার প্রকল্প বাস্তবায়নের পর পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে সেখানে নতুন প্রকল্প নেওয়ার সুযোগ নেই।
প্রকল্পের ট্যাগ কর্মকর্তা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ইয়াছির আরাফাত বলেন, খাল খননে কত টাকা বরাদ্দ ছিল, তা তাঁর জানা নেই। তিনি শুধু মাঝে মাঝে গিয়ে শ্রমিকরা উপস্থিত আছেন কি না, তা দেখেছেন। খাল পরিমাপের কোনো তালিকাও তাঁকে দেওয়া হয়নি এবং গাছ রোপণের বিষয়েও তাঁকে কিছু জানানো হয়নি।
প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য মো. কামরুল ইসলাম অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “আমাকে সভাপতি করে খননকাজের বিষয়ে অভিযোগ হয়েছে। তদন্ত হয়েছে। আমি পরে দেখা করব।”
তবে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী দেবদাস বিশ্বাস। তিনি দাবি করেন, প্রকল্প অনুযায়ী কাজ শেষ হয়েছে এবং গাছ রোপণেও কোনো দুর্নীতি হয়নি। তবে আগের অর্থবছরে খালটি খনন করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে তার জানা নেই বলে জানান তিনি।
এদিকে, একই খালে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পুনঃখনন, খননকাজের ঘণ্টা, শ্রমিকের মজুরি এবং গাছ রোপণের ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও বাস্তব কাজের পরিমাণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
কেকে/ এমএস