বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬,
৪ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: কলকাতার হোটেলে অগ্নিকাণ্ড, ৬ জনের পরিচয় শনাক্ত      ছয় ব্যাংকে আটকে আছে ডেসকোর ২৫০ কোটি টাকা      পর্যটন খাতে সহযোগিতা বাড়াবে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া      এনবিআরের পাঁচ অঙ্গীকার      কলকাতায় আগুনে ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু      তিন জেলার ডিসি প্রত্যাহার      রাষ্ট্রপতি হলেও জনগণের পাশে থেকে সেবা করব: মির্জা ফখরুল      
দেশজুড়ে
দরপতনে কাঁঠাল চাষে হতাশ কাপাসিয়ার কৃষকেরা
গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ২:২৬ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

“আর একটি কাঁঠালগাছও লাগাব না। এ বছরই শেষ। নতুন করে বাগান কেনারও ইচ্ছে নেই।” চলতি মৌসুমে কাঁঠাল বিক্রি করতে না পেরে এভাবেই হতাশা প্রকাশ করলেন গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার খোদাদিয়া গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব কৃষক মোতাহার হোসেন মুন্তু।

তিনি বলেন, “২০০০ সালে একবার কাঁঠালের দাম একেবারে কমে গিয়েছিল। তখনও হাজার খানেক কাঁঠাল বিক্রি করে কিছু টাকা জমিয়েছিলাম। এরপর গত ২৫ বছর বাজার মোটামুটি ভালোই ছিল। আমার নিজের কাঁঠালগাছ আছে। ছোটবেলা থেকেই মৌসুমি ফল কাঁঠালের ব্যবসাও করি। কিন্তু চলতি মৌসুমে কাঁঠাল কিনে বিক্রি করতে পারিনি। এমনকি নিজের গাছের কাঁঠালও গাছে পেকে পেকে নিচে পড়ে গেছে।”

সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের বরহর বাজারে সড়কের পাশে তিনটি কাঁঠাল নিয়ে বসে আছেন আলাউদ্দিন (৬৫)। সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে গেলেও একটি কাঁঠালও বিক্রি করতে পারেননি তিনি।

বেলাশী গ্রামের কৃষক মোস্তফা মিয়া বলেন, “আমার ৩০টি কাঁঠালগাছ আছে। প্রতি বছর অন্তত তিন থেকে চার হাজার টাকার কাঁঠাল বিক্রি করি। এবার ১০০টি কাঁঠালের দাম ৫ টাকা করে বলছিল। তাই বিক্রি করিনি, গরুকে খাইয়েছি। অথচ গত বছরও একই কাঁঠাল ২০ থেকে ৩০ টাকা করে বিক্রি করেছি।”

তবে মৌসুমের শেষ দিকে এসে কোথাও কোথাও কাঁঠালের দাম কিছুটা বেড়েছে। গত সপ্তাহে কোঠামনি বাজারের মসজিদের সামনে পাঁচটি গাছের কাঁঠাল মোটামুটি ভালো দামে বিক্রি হয়েছে। বাড়তি দামের আশায় কিছু কৃষক গাছের ডালে চটের বস্তা দিয়ে কাঁঠাল বেঁধে রাখছেন, যাতে মৌসুমের শেষ দিকে বিক্রি করা যায়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে প্রায় ৮ হাজার ৫০২ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের চাষ হয়। এর মধ্যে শুধু শ্রীপুর উপজেলাতেই রয়েছে ২ হাজার ৯৫০ হেক্টর। প্রতি বছর জেলায় প্রায় ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫০৯ মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়।

গাজীপুর সদর উপজেলার বানিয়ারচালা গ্রামের কাঁঠালচাষি আমজাদ হোসেন বলেন, “স্থানীয় বাজারে কাঁঠালের কেনাবেচা কমে গেছে। স্থানীয় ক্রেতাও কম। সাধারণত গাজীপুরের কাঁঠাল সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। এবার বাজারে কাঁঠালের সরবরাহ থাকলেও বিক্রি কম।”

শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ী ইউনিয়নের হালুকাইদ গ্রামের কাঁঠালচাষি আলমগীর বলেন, “যেসব চাষি আগেই বাগান বিক্রি করে দিয়েছেন, তাঁরা কিছুটা রক্ষা পেয়েছেন। কিন্তু যাঁরা বাগানের কাঁঠাল একসঙ্গে বিক্রি করেননি, তাঁদেরই বেশি বিপাকে পড়তে হয়েছে।”

পাচুয়া গ্রামের শিক্ষক ও কৃষক আসাদুজ্জামান আকাশ বলেন, “কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল। আমাদের কাপাসিয়ায়, আমার বাড়িতেই এর কী করুণ অবস্থা! গাছে এখনো অনেক কাঁঠাল পেকে আছে। পোকায় খাচ্ছে, পাখিতে খাচ্ছে, প্রতিদিন পেকে নিচে পড়ে যাচ্ছে। গরুও খায় না, মানুষও খায় না। এমনকি কাঁঠালের বিচিও কেউ কুড়িয়ে নেয় না।”

তিনি বলেন, “জাতীয় এই ফলের উৎপাদনকারীরা যাতে যথাযথ মূল্য পান, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। একবার শুনেছিলাম, চীনে কাঁঠাল রপ্তানি করা যাবে। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে খুবই ভালো হবে। কাঁঠালের মতো সুস্বাদু ফলের জন্য ভবিষ্যতে কাপাসিয়া, গাজীপুর ও শ্রীপুরের কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাবেন—এটাই আশা করি।”

কাপাসিয়ার কাঁঠাল ব্যবসায়ী মিলন মিয়া বলেন, “প্রতি বছর আমি সিলেটে কাঁঠাল নিয়ে যাই। তবে এবার কাঁঠাল নিয়ে সিলেটে যাইনি। স্থানীয় এলাকা থেকে কাঁঠাল কিনে স্থানীয় বাজারেই বিক্রি করছি।”

তিনি আরও বলেন, “এবার ট্রাকভাড়াও অনেক বেড়েছে। তেলের দাম বাড়ার কারণে হয়তো পরিবহন খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি মানুষও কাঁঠাল কম কিনছে। তবে কী কারণে কাঁঠালের চাহিদা কমেছে, তা জানি না।”

রানিগঞ্জ-গাজীপুর আঞ্চলিক সড়কে কথা হয় আরেক কাঁঠাল ব্যবসায়ীর সঙ্গে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যবসায়ী বলেন, “গাজীপুর থেকে সিলেটে কাঁঠাল নিয়ে গেলে পথে নানা ধরনের খরচ হয়। এসব বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাই না। রাস্তায় কত টাকা দিতে হয়, এসব কথা বলতে চাই না। বললে বিপদ হতে পারে।”

শিক্ষক আবুল হোসেন বলেন, “সারা বছর পরিচর্যা, সার, শ্রমিক ও পরিবহন খরচ করে উৎপাদিত বড় আকারের একটি কাঁঠাল চলতি বছর হাটে মাত্র ১০ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কাপাসিয়ায় প্রায় অর্ধশতাধিক কাঁঠালের হাট রয়েছে। তবে মৌসুমের শেষ দিকে কিছুটা দাম বেড়েছে।”

গাজীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম খান বলেন, “মৌসুমে দাম কমে যাওয়ায় কৃষকেরা প্রায়ই ক্ষতির মুখে পড়েন। তবে কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং অপচয়ও কমবে।”

তিনি আরও বলেন, “ইতিমধ্যে চীনে কাঁঠাল রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে কৃষি বিভাগ সব ধরনের সহযোগিতা করবে।”

গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আইয়ুবি খোলা কাগজকে বলেন, “কাপাসিয়াবাসীর জন্য এটা বড় সুসংবাদ হতে পারে, যদি যথাযথ সরকারি সহযোগিতা পাওয়া যায়। সরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে আট থেকে ১০ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ চাহিদা কম থাকা এবং রপ্তানির সুযোগ সীমিত থাকায় প্রতি বছর এর ৪৫ শতাংশের বেশি নষ্ট হয়।”

কৃষকদের ভাষ্য, উৎপাদন খরচের তুলনায় কাঁঠালের দাম না পাওয়ায় অনেকেই গাছ ও বাগান নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। প্রক্রিয়াজাত শিল্প, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং রপ্তানির সুযোগ বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে কাঁঠাল চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন গাজীপুরের কৃষকেরা। 


কেকে/সাশ 



আরও সংবাদ   বিষয়:  দরপতন   কাঁঠাল চাষ   গাজীপুর   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close