সরকার গঠনের ৬ মাস পার করল বিএনপি সরকার। তবে সরকার গঠনের পর দলটির সাংগঠনিক তৎপরতা অনেকটাই কমে গেছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে বিরাজ করছে স্থবিরতা। এ ছাড়া ত্যাগী নেতাদের অবমূল্যায়ন ও এমপি-মন্ত্রীদের স্বজনপ্রীতিতে দলে সৃষ্টি হচ্ছে অস্থিশীলতা। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ফাঁকা মাঠে সুযোগ নিচ্ছে বিরোধী দলগুলো। এমন পরিস্থিতি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে আছে তৃণমূল কর্মীরা।
দলটির জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী নেতারা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকায় সাংগঠনিক বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্ব হারাচ্ছে। ফলে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কেন্দ্র ও স্থানীয় নেতৃত্বের দূরত্ব বাড়ছে।
দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা ত্যাগী নেতাকর্মীদের একটি অংশের অভিযোগ, ক্ষমতায় আসার পর তাদের মূল্যায়নের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত নতুন ও প্রভাবশালী একটি অংশ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে পদ-পদবি, সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও পুরোনো ও নতুন নেতৃত্বের মধ্যে বিরোধ তৈরি হচ্ছে।
বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা নেতাকর্মীদের অনেকেই মনে করছেন, বিরোধী দলে থাকার সময় যারা মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন, ক্ষমতায় আসার পর তাদের প্রত্যাশিত মূল্যায়ন হচ্ছে না। বরং স্থানীয়ভাবে এমপি-মন্ত্রীদের ঘনিষ্ঠজনদের প্রভাব বাড়ছে।
তাদের ভাষ্য, এ ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা আরও বাড়বে। এর প্রভাব আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও স্থানীয় নির্বাচনি প্রস্তুতিতেও পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে এমপি-মন্ত্রীদের ঘিরে গড়ে ওঠা নিজস্ব বলয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের একটি অংশের অভিযোগ—গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দলের সাংগঠনিক কাঠামোর চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্য ও ঘনিষ্ঠতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় দলীয় নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আবার একই এলাকায় একাধিক গ্রুপ সক্রিয় থাকায় কর্মীদের মধ্যেও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। ফলে সরকারের ছয় মাসের মাথায় তৃণমূলে যে সাংগঠনিক প্রাণচাঞ্চল্য থাকার কথা, তা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।
এদিকে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে বিরোধী দলগুলো। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় পর্যায়ের ব্যস্ততা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ক্ষমতায় থাকার কারণে বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দল ও সরকারকে আলাদা সাংগঠনিক কাঠামোয় সক্রিয় রাখা। সরকার পরিচালনার ব্যস্ততায় যদি দলীয় কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকে, তাহলে মাঠপর্যায়ে বিরোধীদের জন্য জায়গা তৈরি হবে।
এ পরিস্থিতিতে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দলের চেয়ারপারসন তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের প্রত্যাশা, কেন্দ্র থেকে কঠোর সাংগঠনিক নির্দেশনা দিয়ে জেলা, মহানগর ও উপজেলা পর্যায়ে দলীয় কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
তৃণমূলের দাবি— দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে গ্রুপিং ও স্বজনপ্রীতি বন্ধে কেন্দ্র কার্যকর পদক্ষেপ নিক। একইসঙ্গে দলীয় সাংগঠনিক কাঠামোকে সক্রিয় করে নিয়মিত সভা, কর্মসূচি ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হোক।
গতকাল রোববার (২৩ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেছেন, “তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিত করে তা সমাধান ও মেরামতে কাজ করা হবে। একইসঙ্গে নেতাকর্মীদের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক বাড়িয়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
রিজভী আরও বলেন, “দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাংগঠনিক বিষয়ে যেসব নির্দেশনা ও দিকনির্দেশনা দেবেন, তা তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হবে। সংগঠনের দুর্বলতা দূর করে একটি ঐক্যবদ্ধ ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ রাজনৈতিক দল গড়ে তোলাই তাদের মূল লক্ষ্য।”
তিনি বলেন, “দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো অনৈতিক অভিযোগ থাকবে না—এমন পরিচ্ছন্ন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে কাজ করা হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা ও সহযোগী সংগঠনগুলোতে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করা হবে। তবে কোনো নেতা পদ হারালেই সাংগঠনিকভাবে বাদ পড়বেন না; যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের ওপরের পদে বা মূল দলে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ থাকবে।”
রিজভীর ভাষায়, নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে সংগঠনে ‘নতুন রক্ত সঞ্চালন’ ঘটবে। সাংগঠনিক এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখাই তার অন্যতম প্রধান প্রচেষ্টা হবে।
কেকে/সাশ