কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পোড়াবাড়ীয়া গ্রামে প্রায় ৩৮ শতক পৈতৃক সম্পত্তি দখল করে রাখার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন ধরে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ চললেও আদালতের রায় ও বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও জমির দখল বুঝে পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগী পরিবার।
পৈতৃক সম্পত্তি দখলমুক্ত করে পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া, জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য মো. শফিক মিয়া।
আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে শফিক মিয়া বলেন, “তার বাবা আবদুল হাই দীর্ঘদিন আগে নিজ এলাকা ছেড়ে জীবিকার প্রয়োজনে সিলেটে চলে যান। পরবর্তীতে তিনি পরিবার নিয়ে সেখানেই বসবাস শুরু করেন। তবে পাকুন্দিয়া উপজেলার পোড়াবাড়ীয়া গ্রামে তাদের পৈতৃকসূত্রে পাওয়া প্রায় ৩৮ শতক সম্পত্তি রয়েছে। ওই সম্পত্তির মধ্যে বসতভিটা, পুকুর ও ফসলি জমি রয়েছে।”
শফিক মিয়ার জানান, তার বাবা এলাকায় না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এসব সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তার চাচাতো ভাই মুঞ্জুরুল হক মুঞ্জুকে। তিনি জমিজমা দেখাশোনা করার পাশাপাশি সেখানকার ফসল ও পুকুরের মাছের একটি অংশ পরিবারের সদস্যদের দিয়ে আসতেন।
তবে কয়েক বছর ধরে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে বলে অভিযোগ করেন শফিক। তিনি বলেন, “মুঞ্জুরুল হক মুঞ্জু ধীরে ধীরে ওই সম্পত্তি নিজের বলে দাবি করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তার বাবা পৈতৃক সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলে তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানান।” পাশাপাশি বিভিন্ন লোকজন ও সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখিয়ে সম্পত্তি জোরপূর্বক দখলে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে শফিক মিয়া অভিযোগ করেন, সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে তাদের পরিবারের সঙ্গে মুঞ্জুরুল হক মুঞ্জুর দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। বিষয়টি নিয়ে আদালতে একাধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলার কয়েকটিতে তাদের পক্ষে আদালতের রায়ও এসেছে বলে দাবি করেন তিনি। জমির মালিকানা প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় দলিলপত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র তাদের কাছে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এরপরও আদালতের রায় ও বৈধ কাগজপত্র অনুযায়ী তারা নিজেদের সম্পত্তির দখল বুঝে পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন শফিক। তার দাবি, রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাব কাজে লাগিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি সম্পত্তি দখলে রাখার চেষ্টা করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে শফিক মিয়া আরও দাবি করেন, মুঞ্জুরুল হক মুঞ্জু স্থানীয় বিএনপির নেতা এবং ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির ১৭ নম্বর সদস্য। রাজনৈতিক পরিচয় ও স্থানীয় প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ করেন শফিক। তার বিরুদ্ধে অন্যদের জমিজমা দখলের অভিযোগ রয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
শফিক বলেন, “আমরা আমাদের জমিতে গেলেই মুঞ্জুরুল হক মুঞ্জু নারীদের লেলিয়ে দেন। নারীরা লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আমাদের ওপর চড়াও হয়। এতে আমরা নিজেদের সম্পত্তিতে যেতেও ভয় পাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “অভিযুক্ত মুঞ্জুরুল হক মুঞ্জু আমাদের জমিতে যাবেন না—এ মর্মে আদালতে অঙ্গীকার করে এলেও বাস্তবে তিনি সেই অঙ্গীকার রাখছেন না। তিনি বিভিন্নভাবে আমাদের সম্পত্তির দখল ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।”
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, সম্পত্তির দখল নেওয়ার চেষ্টা নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে তাদের পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। ফলে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এ অবস্থায় স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—পৈতৃকসূত্রে পাওয়া ৩৮ শতক সম্পত্তির মালিকানা ও কাগজপত্র যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, অবৈধ দখলে থাকা সম্পত্তি দখলমুক্ত করে পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া, দখলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ, পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি ও হয়রানি বন্ধে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান এবং আদালতের রায় ও বৈধ কাগজপত্রের ভিত্তিতে পরিবারের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।
শফিক মিয়া বলেন, “তারা কোনো ধরনের সংঘাতে যেতে চান না। আইন ও প্রশাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেই নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি ফিরে পেতে চান। এ জন্য প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।”
তিনি বলেন, “আমরা কারও সঙ্গে বিরোধ বা সংঘাতে যেতে চাই না। আমাদের দাবি খুবই পরিষ্কার—আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি আমরা আইন অনুযায়ী ফিরে পেতে চাই। আদালতের রায় ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও যদি আমরা নিজেদের জমিতে যেতে না পারি, তাহলে আমরা কার কাছে যাব? প্রশাসনের কাছে আমাদের অনুরোধ, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে মুঞ্জুরুল হক মুঞ্জুর বক্তব্য জানতে তার বাড়িতে গেলে সেখানে থাকা কয়েকজন নারী সাংবাদিকদের ওপর তেড়ে আসেন। এ সময় পরিস্থিতি অনুকূল না থাকায় তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলা সম্ভব হয়নি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কেকে/সাশ