শৈশব থেকে কৈশোরে পদার্পণের সময়টিকে বলা হয় সন্ধিকাল। সাধারণত ১২-১৮ বছর বয়সের এই সময়টি একজন সন্তানের শারীরিক, মানসিক, আবেগিক ও নৈতিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই বয়সে সন্তান নিজেকে নতুনভাবে চিনতে শেখে, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, বন্ধুদের প্রভাব বাড়ে এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নানা স্বপ্ন ও দুশ্চিন্তা জন্ম নেয়। তাই এই সময়ে মা-বাবার দায়িত্ব ও ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে সন্তান একজন সুশিক্ষিত, নৈতিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে; আর অবহেলা করলে সে সহজেই ভুল পথে পরিচালিত হতে পারে।
প্রথমত, মা-বাবাকে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। অনেক অভিভাবক মনে করেন, শুধু শাসন করলেই সন্তান ভালো হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অতিরিক্ত শাসন সন্তানকে দূরে সরিয়ে দেয়। সন্তান যেন নির্ভয়ে তার সমস্যা, ভয়, ব্যর্থতা কিংবা ভুলের কথা বাবা-মাকে বলতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একজন ভালো শ্রোতা হওয়াই একজন ভালো অভিভাবকের অন্যতম বড় গুণ।
দ্বিতীয়ত, সন্তানকে সময় দিতে হবে। বর্তমান ব্যস্ত জীবনে অনেক বাবা-মা অর্থ উপার্জনের পেছনে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে সন্তানের সঙ্গে বসে কথা বলারও সময় পান না। অথচ সন্তান সবচেয়ে বেশি চায় বাবা-মায়ের সান্নিধ্য ও ভালোবাসা। প্রতিদিন কিছু সময় একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা বা হাঁটাহাঁটি করার অভ্যাস পারিবারিক সম্পর্ককে দৃঢ় করে।
তৃতীয়ত, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ইসলাম সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই নামাজ, সততা, শিষ্টাচার ও মানবিকতার শিক্ষা দিতে উৎসাহিত করেছে। কুরআন তিলাওয়াত, রাসুলের (সা.) আদর্শ এবং নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা সন্তানের চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মা-বাবা নিজেরা ভালো উদাহরণ হলে সন্তানের ওপর তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে।
চতুর্থত, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখাতে হবে। বর্তমানে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিশোর-কিশোরীদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। এগুলোর ভালো দিক যেমন আছে, তেমনি ক্ষতিকর দিকও রয়েছে। তাই নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং সচেতনতা ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সন্তান কী দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং অনলাইনে কত সময় ব্যয় করছে—সেদিকে দায়িত্বশীলভাবে নজর রাখা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, সন্তানের বন্ধু নির্বাচন সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। কৈশোরে বন্ধুর প্রভাব অনেক বেশি। তাই সন্তানের বন্ধুদের সম্পর্কে জানুন, তাদের পরিবার সম্পর্কে খোঁজ নিন এবং ভালো বন্ধু বেছে নিতে উৎসাহ দিন। তবে অযথা সন্দেহ বা অপমান না করে যুক্তি ও ভালোবাসার মাধ্যমে বিষয়টি পরিচালনা করতে হবে।
ষষ্ঠত, পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, বই পড়া ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করতে হবে। শুধু পরীক্ষার ফলাফলই জীবনের সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড নয়। একজন সন্তানের ব্যক্তিত্ব বিকাশে সাহিত্যচর্চা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সপ্তমত, তুলনা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অনেক অভিভাবক নিজের সন্তানকে অন্যের সন্তানের সঙ্গে তুলনা করেন। এতে সন্তানের আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। বরং তার নিজের যোগ্যতা ও অগ্রগতিকে মূল্যায়ন করে উৎসাহ দেওয়া উচিত।
অষ্টমত, ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। কৈশোরে ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ভুলের জন্য অপমান বা কঠোর শাস্তি না দিয়ে ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে বোঝাতে হবে। সন্তান যেন বুঝতে পারে, তার পাশে বাবা-মা আছেন।
নবমত, মানসিক পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই বয়সে অনেক সন্তান একাকীত্ব, হতাশা, আত্মবিশ্বাসের অভাব বা উদ্বেগে ভুগতে পারে। তাদের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। প্রয়োজনে শিক্ষক, অভিজ্ঞ আত্মীয় বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।
সবশেষে, সন্তানের জন্য নিয়মিত দোয়া করতে হবে। ইসলামে সন্তান আল্লাহর একটি মহান নিয়ামত। তাই তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পাশাপাশি আল্লাহর কাছে হেদায়েত ও কল্যাণ কামনা করা প্রত্যেক মা-বাবার দায়িত্ব।
সন্তানের বয়স সন্ধিকাল একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে ভালোবাসা, ধৈর্য, নৈতিক শিক্ষা, সময় দেওয়া এবং সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে মা-বাবা সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারেন। মনে রাখতে হবে, সন্তান শুধু আমাদের কথা নয়, আমাদের আচরণ থেকেও শিক্ষা নেয়। তাই একজন আদর্শ মা-বাবাই একজন আদর্শ সন্তানের ভিত্তি রচনা করেন। আজকের সঠিক পরিচর্যাই আগামী দিনের একজন সৎ, দক্ষ ও মানবিক নাগরিক উপহার দিতে পারে।
কেকে/এমএ