সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬,
৯ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৯৯৪, মৃত্যু তিনজনের      হামে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১২৩২      মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপা কারাগারে      জামায়াত বিসমিল্লাহ বলে মিথ্যা শুরু করে : রাশেদ      নুসরাত হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল      ব্যবসায়িক সম্পর্ক এগিয়ে যাক, রাজনীতি চলবে নিজের পথে : দীনেশ ত্রিবেদী      রংপুরে শিক্ষক ও স্ত্রী-সন্তানদের শেষকৃত্য সম্পন্ন      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
সাংবাদিক বনাম ফেসবুক সাংবাদিক: পরিচয় নয়, দায়িত্বই বড়
মো. মীমরাজ হোসেন
প্রকাশ: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৪৪ পিএম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে সংবাদ পরিবেশনের ধরনও বদলে গেছে। একসময় একটি খবর মানুষের কাছে পৌঁছাতে সংবাদপত্র, রেডিও কিংবা টেলিভিশনের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন একটি স্মার্টফোন হাতে থাকলেই ছবি, ভিডিও কিংবা কোনো ঘটনার তথ্য মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এই পরিবর্তন সংবাদপ্রবাহকে যেমন দ্রুত করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন কিছু প্রশ্নও।

এর মধ্যে অন্যতম সাংবাদিক কে, আর ফেসবুক সাংবাদিকই বা কে?

প্রশ্নটি আসলে কোনো ব্যক্তিকে ছোট করা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে খাটো করার নয়। বরং প্রশ্নটি সাংবাদিকতার মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে। কারণ ফেসবুক এখন সাংবাদিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফর্ম। অনেক পেশাদার সাংবাদিক মাঠ থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে তা দ্রুত পাঠকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। তাই শুধু ফেসবুকে সংবাদ প্রকাশ করলেই কাউকে সাংবাদিক বলা যাবে না, আবার ফেসবুক ব্যবহার করলেই কেউ সাংবাদিকতার বাইরে এমন ধারণাও ঠিক নয়।

মূল পার্থক্য হলো তথ্য যাচাই, পেশাগত নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বিভিন্ন আলোচনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য যাচাই এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল ভাবনা হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তথ্য পাওয়া যায়, সেটিকে যাচাই না করে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়; গণমাধ্যমকে তথ্য যাচাই ও পেশাগত নীতিমালা মেনে চলতে হবে।

এই কথাটিই বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটিকে সামনে আনে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো একটি ভিডিও ভাইরাল হলো। সঙ্গে সঙ্গে সেটি নিয়ে পোস্ট দেওয়া হলো। কিন্তু ভিডিওটি কখনকার, কোথাকার, কারা সেখানে ছিলেন কিংবা ঘটনার প্রকৃত প্রেক্ষাপট কী—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা হলো না। তাহলে সেটি তথ্য হতে পারে, কিন্তু যাচাই করা সংবাদ নয়।

একজন সাংবাদিকের কাজ এখানেই আলাদা।

তিনি একটি তথ্য পাওয়ার পর তার উৎস খোঁজেন। প্রয়োজনে ঘটনাস্থলে যান। প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য নেন। নথিপত্র যাচাই করেন। একাধিক সূত্রের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখেন। তারপর সংবাদ প্রকাশ করেন।

বিশেষ করে অভিযোগের ক্ষেত্রে দায়িত্ব আরও বেশি। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। অভিযোগকারীর বক্তব্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদে ‘অভিযোগ’, ‘পুলিশের দাবি’, ‘মামলার এজাহার অনুযায়ী’—এসব শব্দ ব্যবহারের মধ্যেও সাংবাদিকতার পেশাগত সতর্কতা রয়েছে।

অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় ‘আগে পোস্ট, পরে যাচাই’ প্রবণতা দেখা যায়। একটি পোস্ট বেশি ভাইরাল হবে কি না, কত মানুষ দেখবে কিংবা কতটি শেয়ার হবে—এসব বিষয় কখনো কখনো তথ্যের গুরুত্ব ও সত্যতাকে ছাড়িয়ে যায়।

এখানেই তৈরি হয় সংকট।

কারণ একটি ভুল তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক মিনিটে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। পরে সেটি ভুল প্রমাণিত হলেও প্রথম প্রকাশের ক্ষতি পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা কঠিন। বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভুয়া বক্তব্য, ভুয়া ফটোকার্ড ও পুরোনো ছবি-ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচারের একাধিক ঘটনা ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের মাধ্যমে শনাক্ত হয়েছে।

তবে ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং সাংবাদিকদের জন্য এটি হতে পারে তথ্য সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। প্রত্যন্ত এলাকার কোনো ঘটনা, দুর্ঘটনা, জনদুর্ভোগ কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীর ভিডিও অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই প্রথম পাওয়া যায়। কিন্তু সেই তথ্যকে সংবাদে রূপ দেওয়ার আগে যাচাই করাটাই পেশাদার সাংবাদিকের দায়িত্ব।

সাংবাদিকতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সংবাদ ও মতামতের পার্থক্য।

একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত মত থাকতে পারে। কিন্তু সংবাদ লেখার সময় ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ যেন তথ্যের ওপর প্রভাব না ফেলে, সেটিই পেশাগত নৈতিকতার দাবি। সংবাদে তথ্য থাকবে, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য থাকবে, পাঠক তথ্যের ভিত্তিতে নিজের সিদ্ধান্ত নেবেন।

তাই ‘ফেসবুক সাংবাদিক’ শব্দটি দিয়ে কাউকে বিচার করার চেয়ে বরং তার কাজের ধরন দেখা বেশি জরুরি।

কেউ একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করেও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করতে পারেন। আবার কোনো প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমে কাজ করেও কেউ যদি তথ্য যাচাই না করে, একপক্ষের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে কিংবা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে সংবাদ প্রকাশ করেন, তাহলে শুধু প্রতিষ্ঠানের পরিচয় তার সাংবাদিকতাকে দায়িত্বশীল করে তুলবে না।

সাংবাদিকতার আসল পরিচয় প্রেস কার্ডে নয়, পরিচয় তৈরি হয় কাজে।

গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয় দীর্ঘদিনের দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে। একটি সংবাদ সঠিকভাবে প্রকাশ করা যেমন একজন সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়, তেমনি একটি মিথ্যা বা যাচাইহীন সংবাদ সেই বিশ্বাসে বড় আঘাত করতে পারে।

বর্তমান সময়ে তাই সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত কে আগে সংবাদ দিলেন—তা নয়; বরং কে সবচেয়ে নির্ভুলভাবে সংবাদটি দিলেন।

ফেসবুকের যুগে সংবাদ দ্রুত পৌঁছাবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু দ্রুততার কারণে যাচাই-বাছাই বাদ দেওয়া কোনোভাবেই সাংবাদিকতার মানদণ্ড হতে পারে না।

শেষ পর্যন্ত সাংবাদিক বনাম ‘ফেসবুক সাংবাদিক’—এই লড়াইটি ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির নয়। এটি আসলে যাচাই করা তথ্যের সঙ্গে যাচাইহীন তথ্যের লড়াই, দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্বহীনতার লড়াই।

মাধ্যম যাই হোক, সাংবাদিকতার মূলনীতি একটাই সত্যকে খুঁজে বের করা, যাচাই করা এবং মানুষের সামনে দায়িত্বশীলভাবে তুলে ধরা।

কারণ একটি পোস্ট ভাইরাল হতে পারে মুহূর্তে, কিন্তু একজন সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয় বছরের পর বছর।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close