একদিনের জন্য মাথা গোঁজার আশ্রয় পেতে সীমান্ত পেরিয়েছিলেন তারা, আর সেই একদিনের আশ্বাসে দেখতে দেখতে কেটে গেছে সু-দীর্ঘ নয়টি বছর। গত ২০১৭ সালের আগস্টে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্বিচারে গণহত্যা, বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভয়াবহ নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কাছে আজকের রোহিঙ্গা শরণার্থী দিবসটি কেবল বর্ষপূর্তির একটি সংখ্যা নয়, বরং আন্তর্জাতিক বিশ্বের ব্যর্থতা ও অনন্ত অনিশ্চয়তার এক নীরব স্মারক।
সাময়িক মানবিক সংকট হিসেবে যে বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছিল, নয় বছর পর বৈশ্বিক দূরদর্শিতার ফাটলে তা আজ রূপ নিয়েছে এক স্থায়ী ও অমীমাংসিত আঞ্চলিক সংকটে। উখিয়া-টেকনাফের পাহাড় ঘেঁষা আশ্রয়শিবির থেকে শুরু করে স্থানীয় হাটবাজার, ধ্বংসপ্রাপ্ত বনভূমি আর নিরাপত্তার শঙ্কায় দিন কাটানো সীমান্তবাসীর জীবন সবখানেই এখন এ দীর্ঘায়িত সংকটের সুদূরপ্রসারী ও গভীর ছায়া।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে বর্তমানে কয়েক লাখ মানুষের বসবাস। বাঁশ, প্লাস্টিক, ত্রিপাল আর টিনের খুপরি ঘরে গাদাগাদি করে দিন কাটাচ্ছে পরিবারগুলো। গ্রীষ্মের প্রখর তাপপ্রবাহ, বর্ষায় পাহাড়ধস কিংবা আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই কাটে তাদের দৈনন্দিন জীবন। ত্রাণ হিসেবে পাওয়া সীমিত রেশনের ওপর নির্ভর করে সংসার চালানো যে কতটা দুষ্কর, তা ফুটে ওঠে ক্যাম্পের বাসিন্দাদের বক্তব্যে।
আশ্রয়শিবিরের একাধিক বাসিন্দা জানান, সাহায্যসংস্থার দেয়া রেশনের সীমাবদ্ধতা এবং উপার্জনের সুযোগ না থাকায় তাদের টিকে থাকাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে, ক্যাম্পের ছোট পরিসরে জন্ম নেওয়া একটি নতুন প্রজন্মের কাছে মায়ানমার শুধুই এক দূর অতীতের স্মৃতির নাম। পর্যাপ্ত উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের অভাবে এ তরুণদের ভবিষ্যৎ এক গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের সবচেয়ে বড় মাশুল গুনতে হয়েছে উখিয়া-টেকনাফের ভূপ্রকৃতি ও পরিবেশকে। বিপুল জনগোষ্ঠীর আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে উজাড় হয়ে গেছে একসময়কার বিস্তৃত পাহাড়ি বনভূমি। বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ায় বন্যহাতি ও মানুষের সংঘাত বেড়েছে, আর বর্ষায় পাহাড়ধস যেন নিয়মিত আতঙ্কের নাম।
ক্যাম্পের প্রবীণ বাসিন্দা মাষ্টার কামালের জানান, বর্ষা এলেই তাদের রাত কাটে নির্ঘুম উদ্বেগে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবেশ সুরক্ষায় বনবিভাগের উদ্যোগে জবরদখল মুক্ত পাহাড়ে বনায়ন ও হাতির করিডোর রক্ষার চেষ্টা চালানো হলেও, ক্যাম্পের একটি অংশের কাঠ সংগ্রহ ও পাহাড় কাটার কারণে বনাঞ্চল পুনরুদ্ধারের কাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে এত বড় জনগোষ্ঠীর বিপুল উপস্থিতিতে স্থানীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এসেছে বড় পরিবর্তনের হাওয়া। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা একলাফে বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় বাজারে দেখা দিয়েছে তীব্র মূল্যস্ফীতি।
উখিয়ার রত্নাপালংয়ের বাসিন্দা প্রসেনজিৎ বড়ুয়াসহ স্থানীয়দের মতে, অতিরিক্ত চাহিদার কারণে চাল, ডাল, সবজি থেকে শুরু করে ঘরভাড়া ও পরিবহন খরচ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত স্থানীয় পরিবারগুলোর নাভিশ্বাস তুলছে। তবে বিপরীত চিত্রও রয়েছে; রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নির্মাণ খাতের এক নতুন কর্মসংস্থান, যা স্থানীয় অর্থনীতির এক বিকল্প গতিপথ তৈরি করেছে।
মানবিক সংকটের পাশাপাশি ক্যাম্প ঘিরে দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা। মাদক পাচার, অবৈধ অস্ত্র, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তারের জেরে ক্যাম্প ও আশপাশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এপিবিএন (আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন) কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।
এ বিষয়ে ১৪ এপিবিএন অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মোহাম্মদ সিরাজ আমীন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, অপরাধী রোহিঙ্গা নেতা হোক কিংবা সাধারণ রোহিঙ্গা, আইনের চোখে সবাই সমান। ক্যাম্পের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিয়মিত টহল ও যৌথ অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে।
সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান প্রত্যাবাসন হলেও, মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, রাখাইনের অস্থিতিশীলতা এবং নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা না মেলায় নয় বছরেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। নিজের জন্মভূমিতে ফিরতে চান সবাই, কিন্তু নিরাপত্তা, মর্যাদা, ভিটেমাটি আর মৌলিক অধিকারের পূর্ণ নিশ্চয়তা ছাড়া ফেরাটাকে তারা আত্মঘাতী মনে করছেন।
উখিয়া-টেকনাফের সরু পথে খেলে বেড়ানো যে শিশুরা মায়ানমারকে দেখেনি, আর যে অভিভাবকেরা মাতৃভূমির স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছেন উভয়ের সামনেই ঝুলে আছে একটিই বড় প্রশ্ন: তবে কি নিজ ভূমিতে ফেরার এ আশ্বাস অধরাই থেকে যাবে? উত্তরটি শুধু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যতের সঙ্গেই নয়, বাংলাদেশ সীমান্ত অঞ্চলের পরিবেশ, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা এবং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার স্বার্থেই দ্রুত খুঁজে নেওয়া জরুরি।
কেকে/এআই