সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায় হয়েছে গতকাল। এ রায় আবারও আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন হাজির করেছে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করে প্রতিকার চাইলে একজন কিশোরীকে কি নিজের জীবন দিয়ে তার মূল্য দিতে হবে? যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রত্যাহার না করায় ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে গভীর ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি করেছিল।
গতকাল হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের দেওয়া ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় নতুনভাবে পর্যালোচনা করে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। চার আসামির সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং অপর ১০ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। রায়টি ডেথ রেফারেন্স ও দণ্ডিতদের আপিল শুনানির পর এসেছে। এই রায়কে নুসরাতের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলা যায়। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে বিচার কেবল সাজা ঘোষণার বিষয় নয়; বিচার মানে সুষ্ঠু তদন্ত, প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়ন, আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যায্য সুযোগ এবং আইনের প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া মেনে অপরাধের দায় নির্ধারণ। বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার জন্য এ সবকিছুই অপরিহার্য।
নুসরাতের মামলায় বিচারিক আদালতের কার্যক্রম তুলনামূলক দ্রুত এগিয়েছিল। ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয় ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এবং শুনানি শেষ হওয়ার পর গতকাল রায় দেওয়া হয় অর্থাৎ নিম্ন আদালতে দ্রুত বিচার হলেও হাইকোর্ট পর্যায়ে মামলা নিষ্পত্তিতে প্রায় সাত বছর সময় লেগেছে।
এই বাস্তবতা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার একটি বড় সংকটের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আলোচিত ও জনমত-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো কখনো কখনো দ্রুত অগ্রসর হলেও অসংখ্য নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বিচার দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকে। ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৩১৪টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৩৫ হাজার ২৬২টি মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে অনিষ্পন্ন অবস্থায় ছিল।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ, বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পাচ্ছেন এবং প্রায় ১০ শতাংশ মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে আপসের মাধ্যমে। আইনে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে সময় লাগছে প্রায় তিন বছর সাত মাস, যার মধ্যে গড়ে ২২ বার তারিখ পড়ছে। দুর্বল তদন্ত, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, ফরেনসিক ও ডিএনএ প্রতিবেদনে বিলম্ব, নিষিদ্ধ পরীক্ষা পদ্ধতির ব্যবহার এবং সাক্ষী সুরক্ষার অভাব এই দীর্ঘসূত্রতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফল ভোগ করেন ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার। দীর্ঘ অপেক্ষা তাদের মানসিক, আর্থিক ও সামাজিক চাপ বাড়ায়; পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে আইনব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে মানুষের আস্থা দুর্বল করে।
বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আক্তার যথার্থই বলেছেন, বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে ন্যায়বিচার অস্বীকার করা; বিচারকাজে দেরি হলে সাক্ষী-আলামত নষ্ট হয়ে যায় এবং অপরাধীদের শাস্তি দৃশ্যমান না হলে তা অপরাধ প্রতিরোধে কোনো কাজে আসে না। এই দীর্ঘসূত্রতার ফল ভোগ করেন ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার। দীর্ঘ অপেক্ষা তাদের মানসিক, আর্থিক ও সামাজিক চাপ বাড়ায়; পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে আইনব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে মানুষের আস্থা দুর্বল করে। তাই নুসরাতের মামলাকে শুধু ব্যতিক্রমী একটি রায় হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এটিকে বিচারপ্রক্রিয়া সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার স্মারক হিসেবে নিতে হবে।
যৌন সহিংসতা, শিশু নির্যাতন এবং নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের প্রতিটি মামলায় সমান গুরুত্ব নিশ্চিত করতে হবে মামলাটি আলোচিত কি না, সংবাদমাধ্যমে কতটা জায়গা পেয়েছে, কিংবা ভুক্তভোগীর পরিবার কতটা প্রভাবশালী এসবের ভিত্তিতে বিচারপ্রাপ্তির গতি নির্ধারিত হতে পারে না। এ জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার।
পর্যাপ্ত বিচারক, সরকারি কৌঁসুলি, দক্ষ তদন্ত কর্মকর্তা, ফরেনসিক সুবিধা এবং আদালত-সহায়ক জনবল নিশ্চিত করতে হবে। সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, পুনর্বাসন এবং আইনি সহায়তা কার্যকর করা জরুরি। তদন্তে গাফিলতি বা প্রমাণ নষ্টের ঘটনায় জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত বিচার অবশ্যই দরকার, কিন্তু তা যেন তাড়াহুড়ো বা জনচাপের কারণে ন্যায্য বিচারের বিকল্প না হয়ে ওঠে। প্রয়োজন দ্রুত, নিরপেক্ষ, প্রমাণভিত্তিক ও স্বচ্ছ বিচার। অপরাধী যেন আইনের ফাঁক গলে পার না পায়, আবার নিরপরাধ কেউ যেন অন্যায়ভাবে দণ্ডিত না হয় ন্যায়বিচারের এই দুই শর্ত সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কেকে/ এমএস