বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট নিয়ে বিভিন্ন সেমিনারে অংশ নিয়ে আমার উপলব্ধি হয়েছে—সংকট দেখা দিলেই আমরা নতুন প্রকল্পের কথা ভাবি। নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, পাইপলাইনসহ নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা হয়। অথচ ইতোমধ্যে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো থেকে কীভাবে সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়—এই প্রশ্নটি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও অর্থ ব্যবহার করে নির্মিত এই গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধি করা। কিন্তু BPDB-এর ২০২৬ সালের ২৯ জুনের তথ্য অনুযায়ী, ওইদিন কেন্দ্রটির Actual Generation ছিল শূন্য মেগাওয়াট। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় অর্থে একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেও আমরা তার কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন থেকে জাতীয়ভাবে সুফল পাচ্ছি না। এটাই আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি বড় শিক্ষা।
এখানে প্রশ্ন শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র কেন উৎপাদন করছে না—প্রশ্ন হলো, প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের আগে আমরা কি পুরো সিস্টেমটিকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করেছিলাম?
শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত হয় না। প্রকল্প গ্রহণের সময়ই দেখতে হবে—জ্বালানি কোথা থেকে আসবে, কীভাবে আসবে, দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ নিশ্চিত হবে কি না, Supply Chain কতটা ঝুঁকিমুক্ত, উৎপাদন খরচ কত, গ্রিডে বিদ্যুৎ নেওয়ার সক্ষমতা আছে কি না এবং প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদে Cost-effective ও বাস্তবায়নযোগ্য কি না।
এখানেই Feasibility Study-এর প্রকৃত গুরুত্ব। Feasibility যেন শুধু প্রকল্প অনুমোদনের আনুষ্ঠানিকতা না হয়, কিংবা “কর্তার ইচ্ছায় কীর্তন”-এ পরিণত না হয়। প্রকল্প করার সিদ্ধান্ত আগে নিয়ে পরে সেই সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক প্রমাণ করার জন্য Feasibility Study তৈরি করা হলে সেটি কোনো প্রকৃত Feasibility নয়।
একটি স্বাধীন, তথ্যভিত্তিক ও পেশাদার Feasibility Study-তে প্রকল্পটি বাস্তবায়নযোগ্য কি না—তার পাশাপাশি কেন বাস্তবায়ন করা উচিত নয়, সেটিও বলার স্বাধীনতা থাকতে হবে।
অর্থাৎ—
Technical Feasibility → Fuel & Logistics → Financial Viability → Supply Chain → Grid/Infrastructure → Cost Effectiveness → Long-term Sustainability
প্রতিটি বিষয়কে বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক হলে প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন, স্থগিত অথবা বাতিল করার সাহসও থাকতে হবে।
এর কোনো একটি অংশ বাদ দিয়ে শুধু মূল স্থাপনাটি তৈরি করলে সেটি জাতীয় সম্পদে পরিণত না হয়ে একসময় জাতীয় বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় এই End-to-End Integrated Planning-এর ঘাটতিই আজ বড় সংকট তৈরি করেছে। একটি সেক্টরের Output অন্য সেক্টরের Input। গ্যাস না থাকলে বিদ্যুৎকেন্দ্র চলে না; জ্বালানি থাকলেও সঞ্চালন সক্ষমতা না থাকলে বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে পৌঁছায় না; বিদ্যুৎ না থাকলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়।
তাই ভবিষ্যতে যে ক্ষেত্রেই উন্নয়ন করা হোক—বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস, পানি, পরিবহন কিংবা শিল্প—প্রতিটি প্রকল্পকে বৃহত্তর জাতীয় ব্যবস্থার সঙ্গে Integrated করে পরিকল্পনা করতে হবে।
তাই আমাদের উন্নয়ন দর্শনে পরিবর্তন প্রয়োজন—
Repair → Maintain → Optimise → Integrate → তারপর Expand
প্রথমে বিদ্যমান সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এরপর যেখানে প্রকৃত প্রয়োজন আছে, সেখানেই নতুন বিনিয়োগ করতে হবে।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থে নেওয়া বড় প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রকল্পে যদি প্রমাণিত হয় যে যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করে, প্রয়োজনীয় সমন্বয় না করে, বাস্তব সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় না নিয়ে অথবা দায়িত্বে অবহেলার কারণে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
কারণ রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় শুধু একটি আর্থিক ক্ষতি নয়; এটি জনগণের সম্পদের অপচয় এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সুযোগ নষ্ট করা।
প্রকৌশলীদেরও শুধু Design, Planning ও Implementation-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। Strategy, Policy ও Investment Decision-making পর্যায়েও প্রকৌশলীদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রকৃত উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়; সেই অবকাঠামো থেকে নিরবচ্ছিন্ন, সাশ্রয়ী ও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নিশ্চিত করা।
রূপসা ৮০০ মেগাওয়াটের অভিজ্ঞতা আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়—
“প্রকল্প নির্মাণই উন্নয়ন নয়; প্রকল্পটি বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে চালানো যাচ্ছে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে তার কাঙ্ক্ষিত অবদান কতটা নিশ্চিত হচ্ছে—সেটিই প্রকৃত উন্নয়নের মানদণ্ড।”
ভবিষ্যতের বাংলাদেশে তাই আর বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়; প্রয়োজন Integrated National Development Planning, Independent Feasibility Assessment এবং প্রকৃত জবাবদিহি।
“আর কী নতুন করে নির্মাণ করব?”—এর আগে প্রশ্ন হওয়া উচিত, “যা নির্মাণ করেছি, তার পূর্ণ সুফল কীভাবে নিশ্চিত করব?”
কেকে/ এমএস