‘মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন কোনো দেবতার জীবন নয়, বরং একজন মানুষের জীবন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই জীবন পুরোটাই মানুষের।’ -স্ট্যানলি লেন-পুল
ঈদে মিলাদুন্নবী মুসলিম উম্মাহর কাছে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, চরিত্র, ন্যায়বোধ, দয়া, সামাজিক দায়িত্ব ও মানবমর্যাদার শিক্ষা স্মরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। তাঁর জীবন কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত বা আধ্যাত্মিকতার দৃষ্টান্ত নয়; বরং অন্যায়, গোত্রবিদ্বেষ, বৈষম্য, শোষণ, প্রতিহিংসা ও নৈতিক অবক্ষয়ে আক্রান্ত সমাজকে ন্যায়, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার দিকে আহ্বান করে।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, মহানবী (সা.) আনুমানিক ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আবির্ভাবের সময় আরব উপদ্বীপে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক রীতিতে বৈচিত্র্য ছিল। মক্কার কাবাকেন্দ্রিক সমাজে বহুদেববাদ প্রচলিত ছিল; পাশাপাশি ইহুদি, খ্রিষ্টান, মাজুসি এবং একেশ্বরবাদে ঝোঁক থাকা কিছু ব্যক্তিও মক্কার বিভিন্ন অঞ্চলে উপস্থিত ছিলেন। সেই যুগের আরব সমাজকে সম্পূর্ণ অন্ধকার, নৈতিকতাবর্জিত বা একরঙা বলে বর্ণনা করা ঐতিহাসিকভাবে যথাযথ নয়। গোত্রীয় আনুগত্য, বাণিজ্য, কবিতা, অতিথিপরায়ণতা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার মতো মূল্যবোধও ছিল। তবে একই সঙ্গে দুর্বল মানুষের ওপর নিপীড়ন, গোত্রীয় সংঘাত, প্রতিশোধের চক্র, দাসত্ব, সুদভিত্তিক শোষণ এবং নারীর অধিকারহীনতার নানা রূপ সমাজে বিদ্যমান ছিল।
এই বাস্তবতায় নবী করিম (সা.) মানুষের চিন্তা ও আচরণের কেন্দ্রে স্থাপন করেন তাওহিদ- এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও জবাবদিহির চেতনা। তাওহিদ কেবল ধর্মতাত্ত্বিক ঘোষণা ছিল না; এর সামাজিক তাৎপর্যও ছিল গভীর। যখন ক্ষমতা, বংশ, সম্পদ বা গোত্রের বদলে আল্লাহর কাছে মানুষের জবাবদিহি ও তাকওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তখন মানবসমতার নতুন ভিত্তি তৈরি হয়। কুরআনে বলা হয়েছে, মানুষকে নারী ও পুরুষ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং জাতি-গোষ্ঠীতে বিভক্ত করা হয়েছে পরিচয়ের জন্য; শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হলো তাকওয়া, বংশ, বর্ণ বা সম্পদ নয়।
মহানবী (সা.) গোত্রকেন্দ্রিক বৈরিতার পরিবর্তে বিশ্বাস, ন্যায় এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে সমাজ গঠনের শিক্ষা দেন। মদিনায় হিজরতের পর মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য গোষ্ঠীকে নিয়ে যে রাজনৈতিক-সামাজিক সমঝোতার কাঠামো গড়ে ওঠে, তা ইতিহাসে মদিনা সনদ নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থায় ভিন্ন ধর্মীয় ও গোত্রীয় গোষ্ঠীর নিরাপত্তা, অধিকার ও পারস্পরিক প্রতিরক্ষার প্রশ্ন গুরুত্ব পায়। ফলে তাঁর সমাজচিন্তার মূল কথা ছিল-ক্ষমতাবান ও দুর্বল, স্বজন ও পর, মুসলিম ও অমুসলিম- সবার প্রতি ন্যায়পরায়ণতা।
দাসপ্রথার প্রশ্নেও ইসলামের শিক্ষা ছিল মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দিকে ধাবিত। নবীজি (সা.) বিদ্যমান দাসপ্রথাকে একদিনে আইন করে বিলুপ্ত করেননি- এ কথা ইতিহাসসম্মতভাবে স্বীকার করা জরুরি। তবে তিনি দাসমুক্তিকে নৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে উৎসাহিত করেন, দাসের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দেন এবং বহু ক্ষেত্রে দাসমুক্তিকে পাপের কাফফারা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। তাঁর সাহাবিদের মধ্যে হজরত বিলাল (রা.) সম্মানিত মুয়াজ্জিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান, আর হজরত যায়েদ ইবন হারিসা (রা.) গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
এই দৃষ্টান্তগুলো বংশ, বর্ণ ও দাসত্বের ভিত্তিতে মানুষের মর্যাদা খর্ব করার বিরুদ্ধে শক্তিশালী নৈতিক বার্তা বহন করে। নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ছিল নবীজির সমাজ সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইসলাম নারীকে উত্তরাধিকারের অধিকার দেয়, বিবাহে মোহরকে নারীর প্রাপ্য অধিকার হিসেবে নির্ধারণ করে এবং নারীর সম্মতি ছাড়া তাকে উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ বা জোরপূর্বক ভোগের বস্তুতে পরিণত করাকে নিষিদ্ধ করে। কুরআন নারীর জন্যও পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়ের সম্পত্তিতে নির্ধারিত অংশের কথা বলেছে।
তবে নারী-পুরুষের উত্তরাধিকার-অংশ সব ক্ষেত্রে অভিন্ন- এ দাবি সঠিক নয়; পারিবারিক দায়িত্ব ও সম্পর্কভেদে অংশের পার্থক্য রয়েছে। তাই নারীর অধিকার প্রসঙ্গে আবেগের পরিবর্তে কুরআনের নির্দিষ্ট বিধান ও ন্যায়বোধকে সঠিকভাবে তুলে ধরা দরকার।
সূরা হুজুরাতের আয়াতে মানবমর্যাদার মানদণ্ড হিসেবে তাকওয়ার কথা বলা হয়েছে; সেখানে নারী-পুরুষ, জাতি বা বংশের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্বের কথা নেই। কিন্তু সূরা নিসার ৩৪ নম্বর আয়াতকে এক বাক্যে কেবল ‘পুরুষ বেশি শক্তিশালী’- এভাবে ব্যাখ্যা করাও যথেষ্ট নয়। আয়াতে পুরুষকে পরিবারে ‘কাওয়াম’ বা দায়িত্বশীল/ভরণপোষণদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, এবং এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ব্যয়ের কথাও যুক্ত আছে।
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইসলামি চিন্তাবিদদের মধ্যে মতভেদ ও বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। এটিকে নারীর মানবিক মর্যাদা কম হওয়ার ঘোষণা হিসেবে ব্যবহার করা অনুচিত; আবার আয়াতটির জটিল ব্যাখ্যাগত প্রশ্ন আড়াল করাও সমীচীন নয়। নারীর প্রতি সদ্ব্যবহারকে নবীজি (সা.) পারিবারিক নীতির কেন্দ্রে এনেছেন। তাঁর বিদায় হজের ভাষণ, স্ত্রীদের সঙ্গে তাঁর আচরণ এবং কন্যাসন্তানকে সম্মান দেওয়ার শিক্ষা মুসলিম সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দৃষ্টান্ত। ‘তোমাদের মধ্যে উত্তম সে-ই, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম’ এই মর্মের হাদিস মুসলিম পারিবারিক জীবনে দায়িত্ব, সৌজন্য ও সহমর্মিতার নীতিকে দৃঢ় করে।
নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন, অপমান কিংবা অধিকারহরণ তাই ইসলামের ন্যায় ও রহমতের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। তৎকালীন আরবে দীর্ঘস্থায়ী গোত্রীয় সংঘাত ও প্রতিশোধপরায়ণতার নজির ছিল। মহানবী (সা.) শান্তি, সন্ধি, ক্ষমা ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে এই চক্র ভাঙার চেষ্টা করেন। নবুয়তের পূর্বে তিনি হিলফুল ফুজুল নামের ন্যায়ভিত্তিক জোটে অংশ নিয়েছিলেন বলে সিরাত-ঐতিহ্যে উল্লেখ আছে; এর উদ্দেশ্য ছিল মক্কায় নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো। পরে মদিনায় তিনি নাগরিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক নিরাপত্তার ভিত্তিতে রাজনৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন। এসব উদাহরণ আমাদের শেখায়- শান্তি মানে অন্যায়কে মেনে নেওয়া নয়; শান্তি হলো ন্যায়, প্রতিশ্রুতি পালন এবং মানুষের অধিকার সুরক্ষার ফল।
ইসলাম মদ, জুয়া ও সুদভিত্তিক শোষণ থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। এসব বিধানের সামাজিক উদ্দেশ্য- ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে নেশা, অপচয়, ঋণদাসত্ব, প্রতারণা ও অর্থনৈতিক অবিচার থেকে রক্ষা করা। নবীজি (সা.)-এর যুগেই সব ধরনের আর্থসামাজিক অন্যায় সম্পূর্ণভাবে সমাজ থেকে উচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল এ কথা না বলা গেলেও এটি ঠিক যে, সমাজ থেকে এই ধরনের চর্চা বহুলাংশেই কমে গিয়েছিল। তিনি ন্যায়সংগত বাণিজ্য, মাপজোখে সততা, আমানত রক্ষা, এতিমের সম্পদ সংরক্ষণ, দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানো এবং সম্পদের সামাজিক দায়িত্ববোধের নীতি প্রতিষ্ঠা করেন। যাকাত সেই দায়িত্ববোধের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ- যা সম্পদের পুনর্বণ্টন, দারিদ্র্য লাঘব ও সামাজিক সংহতিতে ভূমিকা রাখে।
জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তাকে তিনি পবিত্র অধিকার হিসেবে শিক্ষা দিয়েছেন। অন্যায় হত্যা, প্রতারণা, চুরি, সম্পদ আত্মসাৎ, মিথ্যা সাক্ষ্য, চুক্তিভঙ্গ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর নৈতিক অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট। তাঁর সমাজসংস্কারকে কেবল ধর্মীয় বিধানের তালিকা হিসেবে নয়; বরং মানুষের অধিকার, দায়িত্ব ও জবাবদিহির একটি নৈতিক কাঠামো হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
ঈদে মিলাদুন্নবীর শিক্ষাকে অর্থবহ করতে হলে আমাদের আত্মসমালোচনা জরুরি। আজও পরিবারে নারী নির্যাতন, শিশুর প্রতি সহিংসতা, যৌতুক, সম্পদ আত্মসাৎ, দুর্নীতি, মিথ্যাচার, শ্রমিকের অধিকারহরণ, ধর্মের নামে বিদ্বেষ এবং দুর্বল মানুষের ওপর জুলুম দেখা যায়। এগুলো দূর করার জন্য নবীজিকে শুধু ভালোবাসার দাবি যথেষ্ট নয়; নবীজি (সা.)-এর ন্যায়, সততা, দয়া, ক্ষমা, দায়িত্বশীলতা এবং মানবমর্যাদার শিক্ষা ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রীয় আচরণে প্রয়োগ করতে হবে। তবেই আমরা একটি সুন্দর সমাজ গঠন করতে পারব।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়- মানুষের মর্যাদা রক্ষা, দুর্বলকে সহায়তা, নারীর অধিকার নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক লেনদেনে সততা বজায় রাখা, ঘৃণার বদলে ন্যায় ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠা করা ইবাদতেরই অংশ। তাঁর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা হবে তাঁর চরিত্রের এই শিক্ষা নিজেদের জীবনে ধারণ করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে ন্যায়, দয়া ও শান্তির সমাজ গঠনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : প্রাবন্ধিক
কেকে/ এমএস