মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
১০ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু      বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ পাঁচ জেলের লাশ উদ্ধার      গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট কাটাতে পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার      ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলে দ্রুত নীতিমালা করবে সরকার’      আট মাসে ৯৫ কারখানা বন্ধ, বেকার ৬২ হাজার শ্রমিক      রাজনৈতিক বিরোধীদের বিচারের পূর্বে অনির্দিষ্টকাল আটকের অবসান চায় এইচআরডব্লিউ      সংসদে মন্ত্রীদের দায়িত্ব বণ্টন, প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে দায়িত্বে ৩ মন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
তরুণ প্রজন্মের এআই জ্ঞানের ভিত্তি: কী শিখতে হবে ও কোথা থেকে শুরু করতে হবে
ড. শাহ জে মিয়া
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ৭:০৭ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

বর্তমানে তরুণ প্রজন্মকে সবচেয়ে বেশি যে পরামর্শটি দেওয়া হচ্ছে, সেটি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শেখো। পরামর্শটি নিঃসন্দেহে সঠিক, কিন্তু আমি লক্ষ করেছি যে এই পরামর্শের সাথে খুব কম ক্ষেত্রেই স্পষ্ট করে বলা হয় ঠিক কী শিখতে হবে, কোথা থেকে শুরু করতে হবে, এবং কোন জ্ঞানটি না থাকলে বাকি সবকিছু অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ফলে আগ্রহী অনেক তরুণ দিশা খুঁজে না পেয়ে হয় হতাশ হচ্ছেন, নয়তো এমন কিছু নিয়ে সময় ব্যয় করছেন যা তাদের প্রকৃত ভিত্তি তৈরিতে খুব একটা সাহায্য করছে না। আমার এই লেখায় আমি সেই ঘাটতিটুকু পূরণ করার চেষ্টা করব। অর্থাৎ, একজন তরুণের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জ্ঞানের ভিত্তি বলতে আমরা প্রকৃতপক্ষে কী বোঝাই, তা যতটা সম্ভব সহজ ভাষায় আলোচনা করব।

তার আগে একটি পার্থক্য পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি। কোনো একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সফটওয়্যার ব্যবহার করতে জানা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে জানা, এই দুটি কখনোই এক বিষয় নয়। আজ যে কেউ কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় জনপ্রিয় কিছু জেনেরেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল নির্ভর সফটওয়্যার ব্যবহার করতে শিখে যেতে পারেন, এবং সেটি অবশ্যই কাজের কথা, এটাকে আমি ভালো বলছি। কিন্তু সেই দক্ষতা দিয়ে একজন তরুণ কেবল ব্যবহারকারী হয়ে ওঠেন, নির্মাতা হন না বা হতে পারবে না। যিনি নির্মাতা হতে চান, তাঁকে জানতে হয় এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নামক যন্ত্রটি কীভাবে শেখে, কেন ভুল করে, কোন তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, এবং কোন পরিস্থিতিতে তার সিদ্ধান্তকে বিশ্বাস করা যায় না। আমি মনে করি, এই দ্বিতীয় ধরনের জ্ঞানই একটি জাতিকে প্রযুক্তির ভোক্তা থেকে প্রযুক্তির উৎপাদকের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। এই জ্ঞানের ভিত্তি নিয়েই আমি আজ চারটি স্তরের কথা বলতে চাই।

প্রথমেই রয়েছে প্রোগ্রামিং দক্ষতা। এই দক্ষতা গড়ে উঠতে পারে পাইথন, আর, সি++ কিংবা জাভাস্ক্রিপ্টের মধ্যে যেকোনো একটি বা একাধিক ভাষার উপর ভিত্তি করে। এখানে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা ভাঙা দরকার। সবগুলো প্রোগ্রামিং ভাষা একজনকেই শিখতে হবে, এমনটা কখনোই নয়; বরং একটি ভাষার উপর গভীরভাবে জোর দিয়েই যে কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জ্ঞানচর্চা এবং বিভিন্ন ফাংশনের সৃষ্টি ও প্রয়োগ শিখে নিতে পারেন। এই ভাষাগুলো সাধারণত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রোগ্রাম লিখতে, সেটি পরীক্ষা করতে এবং বাস্তবে প্রয়োগ করতে ব্যবহৃত হয়। প্রোগ্রামিংয়ের পাশাপাশি সমান জরুরি হলো গণিতের শক্ত ভিত্তি, বিশেষ করে বীজগণিত, ক্যালকুলাস, সম্ভাব্যতা ও পরিসংখ্যান। কারণ এগুলো ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এলগোরিদম ও মডেল তৈরি করা কিংবা তার ফলাফল সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয় না।

সম্ভাব্যতার কথা যেহেতু এলো, এখানে ছোট্ট করে বিষয়টি বলে রাখা উচিত। সম্ভাব্যতা হলো গণিত ও পরিসংখ্যানের এমন একটি শাখা, যা কোনো ঘটনা ঘটার সম্ভাবনার একটি সংখ্যাগত বর্ণনা দেয়। এই সংখ্যাটি সবসময় ০ এবং ১’-এর মধ্যে থাকে, এবং সংখ্যাটি যত বড় হবে ঘটনাটি ঘটার সম্ভাবনা তত বেশি। অনেক ক্ষেত্রে এটি শতাংশ আকারেও প্রকাশ করা হয়, যার পরিধি ০ থেকে ১০০ শতাংশ। সবচেয়ে সহজ উদাহরণটি হলো একটি নিরপেক্ষ মুদ্রা উপরে ছুড়ে মারা। যেহেতু মুদ্রাটি নিরপেক্ষ, সেহেতু ‘হেড’ পড়ার সম্ভাব্যতা এবং ‘টেইল’ পড়ার সম্ভাব্যতা সমান, অর্থাৎ প্রত্যেকটি ১/২ বা ৫০ শতাংশ। 

যাহোক, এই আপাত সরল ধারণাটির উপরেই দাঁড়িয়ে আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিটি পূর্বাভাস, আবহাওয়ার আগাম বার্তা থেকে শুরু করে রোগ নির্ণয় কিংবা ফসলের রোগ শনাক্তকরণ পর্যন্ত। একজন তরুণ যখন বোঝেন যে যন্ত্রটি তাঁকে নিশ্চয়তা দিচ্ছে না, বরং সম্ভাবনার হিসাব দিচ্ছে, তখনই তিনি যন্ত্রের উত্তরকে যথাযথ সন্দেহ ও বিচারবুদ্ধি দিয়ে গ্রহণ করতে শেখেন।

দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে মেশিন লার্নিং, অর্থাৎ যন্ত্রের শেখার পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত সুপারভাইজড লার্নিং, যেখানে সঠিক উত্তর আগে থেকে জানিয়ে দিয়ে যন্ত্রকে শেখানো হয়; আনসুপারভাইজড লার্নিং, যেখানে যন্ত্র নিজেই ডেটার ভিতরের লুকানো ধরন বা প্যাটার্ন খুঁজে বের করে; রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং, যেখানে যন্ত্র চেষ্টা ও ভুলের মধ্য দিয়ে পুরস্কার ও শাস্তির ভিত্তিতে শিখতে থাকে; এবং নিউরাল নেটওয়ার্ক, যা মানুষের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের সংযোগের আদলে তৈরি একটি গাণিতিক কাঠামো। আমার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে আমি বলতে পারি, আমাদের তরুণ প্রজন্ম যদি এই বিষয়গুলোর উপর যথেষ্ট সময় ব্যয় করে, তাহলে তারা উপকৃত না হয়ে পারেই না।

তৃতীয় স্তরটি হলো ডেটা, এবং আমি মনে করি আমাদের দেশে এটিই সবচেয়ে অবহেলিত স্তর। আজকের জ্ঞানবিজ্ঞানের পৃথিবী দাঁড়িয়ে আছে বিগ ডেটার ওপরে, আর আমাদের ব্যবসার জগৎ দিন দিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভরতার দিকে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ধাবিত হচ্ছে। বিগ ডেটা বলতে বোঝায় কাঠামোগত, অকাঠামোগত ও আধা-কাঠামোগত তথ্যের এমন এক বৃহৎ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সংগ্রহ, যা আয়তন, গতি ও বৈচিত্র্যের দিক থেকে এতটাই বিশাল ও জটিল যে সাধারণ ডেটা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি দিয়ে তা সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ বা বিশ্লেষণ করা যায় না। এযুগের বিজ্ঞানীরা বিগ ডেটাকে সংজ্ঞায়িত করতে ইংরেজিতে ছয়টি ‘ভি’ ব্যবহার করে থাকেন, সেগুলো হলো ভলিয়াম (পরিমাণ), ভ্যারাইটি (বৈচিত্র্য), ভেলোসিটি (গতিশীলতা), ভ্যারিয়েবিলিটি (পরিবর্তনশীলতা), ভেরাসিটি (সত্যতা) ও ভ্যালু (মান)।

আসুন এগুলো একটু খুলে দেখি। পরিমাণ বোঝাতে বলা যায়, ডেটার হিসাব আজ আর গিগাবাইটে সীমাবদ্ধ নয়, তা জেটাবাইট ও এক্সাবাইট ছাড়িয়ে গেছে; উদাহরণস্বরূপ, এই মুহূর্তে প্রতি মিনিটে শুধু ইউটিউবেই সারা বিশ্ব মিলে বিপুল পরিমাণ ভিডিও আপলোড হচ্ছে। বৈচিত্র্য বোঝায় উৎসের ধরনকে, কারণ আজকের বেশিরভাগ ডেটাই অকাঠামোগত, যেমন অডিও ফাইল, ভিডিও, ছবি কিংবা টেক্সট, যেগুলোর কোনো বাঁধা নিয়ম নেই এবং সেই কারণেই সেগুলোকে ম্যাপ করা কঠিন। গতিশীলতা বোঝায় সেই ডেটা কত দ্রুত প্রক্রিয়াজাত ও ব্যবহারযোগ্য করা যাচ্ছে। পরিবর্তনশীলতা বৈচিত্র্য থেকে আলাদা; এটি এমন ডেটার ধরনকে বোঝায় যা ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে থাকে, এবং সেই পরিবর্তন ডেটার গুণগত মানের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। সত্যতা প্রসঙ্গে একটি কথা মনে রাখা জরুরি, ভুল বা অবিশ্বাস্য ডেটা দিয়ে যত উন্নত এলগোরিদমই চালানো হোক, ফলাফল ভুলই হবে। আর সবশেষে মান, অর্থাৎ সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা হলে সেই ডেটা ব্যবহারকারীর জন্য প্রকৃত মূল্য তৈরি করতে পারছে কি না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই প্রজন্মের একজন নাগরিকের ডেটা সম্পর্কে এই ধারণাগুলো না থাকলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জ্ঞান কোনোভাবেই সম্পূর্ণ হতে পারে না।

তাত্ত্বিক ধারণার সাথে সাথে প্রয়োজন হাতে-কলমে তিনটি দক্ষতা। প্রথমটি ডেটা সংগ্রহ, অর্থাৎ নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি অনুসরণ করে তথ্য সংগ্রহ ও পরিমাপ করা, যেখানে সততা ও নির্ভুলতাই মূল শর্ত। দ্বিতীয়টি ডেটা পরিষ্কারকরণ, অর্থাৎ একটি ডেটাসেটের ভেতরে থাকা ভুল, দূষিত, অসম্পূর্ণ কিংবা একই তথ্যের পুনরাবৃত্তিকে সংশোধন করা বা বাদ দেওয়া; একাধিক উৎস থেকে ডেটা একত্র করার সময় এই সমস্যা প্রায় অনিবার্য এবং ডেটা ভুল থাকলে এলগোরিদম কখনোই সঠিক বিশ্লেষণ দিতে পারে না। তৃতীয়টি ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন, অর্থাৎ চার্ট, গ্রাফ ও মানচিত্রের মতো উপকরণ ব্যবহার করে তথ্যের প্রবণতা ও ধরন এমনভাবে উপস্থাপন করা, যাতে প্রযুক্তির সাথে সরাসরি যুক্ত নন এমন একজন পাঠক বা ব্যবসায়ের মালিকও বিষয়টি বিভ্রান্তি ছাড়া বুঝতে পারেন। এর সাথে দরকার জুপিটার নোটবুক, টেনসরফ্লো, পাইটর্চ ও স্কিট-লার্নের মতো প্ল্যাটফর্মে কাজ করার সক্ষমতা, কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল তৈরি, ট্রেনিং ও টেস্টিং- এই ধরনের পরিবেশেই সম্পন্ন হয়।

চতুর্থ এবং শেষ স্তরটি প্রযুক্তিগত নয়, কিন্তু আমার বিচারে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ শুরু করার আগেই এই প্রজন্মের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিকতা, পক্ষপাতিত্ব ও এর সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে বিস্তৃত জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি। এর সাথে প্রয়োজন খাতভিত্তিক অন্তর্দৃষ্টি, কারণ কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা কিংবা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রকৃত সমস্যাটি না বুঝলে সেই সমস্যার জন্য কার্যকর সমাধান নকশা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য শিল্প ও ব্যবসা ক্ষেত্রের অংশীদারদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করাও এই স্তরেরই অংশ। আর জটিল ধারণাগুলোকে নতুনদের জন্য সহজ সরল করে ব্যাখ্যা করতে শেখা সমান জরুরি, কারণ যে জ্ঞান অন্যের কাছে হস্তান্তর করা যায় না, সেই জ্ঞান কখনো একটি জাতির সম্পদ হয়ে উঠতে পারে না।

এখানে অনেকের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি আশঙ্কা জাগতে পারে, এত বিষয় কি একজন তরুণের পক্ষে আয়ত্ত করা সম্ভব? আমার উত্তর হলো, তার প্রয়োজনই নেই। একটি প্রোগ্রামিং ভাষা, একটি খাতের গভীর বোঝাপড়া এবং ডেটার প্রতি সৎ দৃষ্টিভঙ্গি, এই তিনটি দিয়ে শুরু করলেই একজন তরুণ কাজে নেমে পড়তে পারেন; বাকিটা কাজের ভিতর দিয়েই ধীরে ধীরে আসতে থাকে। আরেকটি আশঙ্কা প্রায়ই শোনা যায় যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশন এলে মানুষের কাজ কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই প্রযুক্তি বরং নতুন ধরনের এবং উচ্চমানের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। আজ আমরা যেসব নতুন পেশার কথা বলতে পারি, তার মধ্যে রয়েছে ডেটা অ্যানালিস্ট, ডেটা ইঞ্জিনিয়ার, মেশিন লার্নিং ইঞ্জিনিয়ার, এআই প্রোডাক্ট ম্যানেজার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিকতা ও নিরীক্ষা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে দেশি ও বিদেশি বহু প্রতিষ্ঠান ডেটা স্থানান্তর করে তাদের সিস্টেম পুনর্গঠন করবে এবং বিদ্যমান ব্যবস্থাকে আরও স্মার্ট ও স্বায়ত্তশাসিত করে তুলবে, ফলে তখন এই দক্ষতার চাহিদা আজকের তুলনায় অনেক বেশি হবে।

এখন আসা যাক সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নে, এই জ্ঞানের ভিত্তি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কীভাবে সংযুক্ত করা যেতে পারে। আমি মনে করি কাজটি শুরু করতে হবে প্রাথমিক স্তর থেকেই। প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাধারণ ব্যবহারগুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেওয়া যেতে পারে, যেমন এই প্রযুক্তি প্রচলিত আইসিটিকে কীভাবে মানুষের অনুকরণীয় পর্যায়ে নিয়ে যায়, কেন তা প্রয়োজন, এর ভালো ও খারাপ দিকগুলো কী, এবং সমাজের প্রয়োজনে এটি কীভাবে কাজে লাগানো যায়। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা নৈতিকতার পাঠের সাথে সাথে বিদ্যালয়ের আইসিটি শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে ছোট পরিসরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত প্রকল্প তৈরি ও প্রয়োগের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা নিতে পারে। 

উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষাসহায়ক হিসেবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার এখন বহুল প্রচলিত; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ব্যবস্থা প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিজস্ব শেখার গতি ও ধরনের সাথে পাঠকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, যাতে কোনো শিশুই পিছিয়ে না থাকে। ইন্টারেক্টিভ লার্নিং টুলস কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক গেম ও অ্যাপ গণিত, বিজ্ঞান ও ভাষার মতো বিষয়গুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে, আর অনুবাদ ও ভয়েস রিকগনিশনের সহায়তায় শিক্ষার্থীরা ইংরেজির পাশাপাশি নিজের মাতৃভাষায়ও শিখতে পারে।

উচ্চশিক্ষার স্তরে আমার প্রস্তাবনা আরও স্পষ্ট। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা কেন্দ্র চালু করা এখন অত্যন্ত জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এই প্রযুক্তির গবেষণার জন্য সমৃদ্ধ তহবিল গঠন করতে হবে, শিক্ষার্থীদের পাঠক্রমে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সংযোজন করতে হবে, এবং দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষক ও গবেষকদের দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ব্যবস্থা করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সদয় ভূমিকা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রযুক্তি গবেষণার গতিও বাড়িয়ে দিতে পারে, কারণ ডেটা বিশ্লেষণ, নমুনা পর্যালোচনা ও উদ্ভাবনের কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টুলস ব্যবহার করা সম্ভব। ব্যবহারিক শিক্ষার ক্ষেত্রে এটি ল্যাব পরীক্ষাগুলোকে অনুকরণ করতে পারে, যা ব্যয়বহুল অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে কমিয়ে দেবে। এমনকি শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও আগ্রহ বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত সিস্টেম তাদের জন্য উপযুক্ত ক্যারিয়ারের পথ ও একাডেমিক প্রোগ্রামও সুপারিশ করতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতি মানুষের জ্ঞান অন্বেষণের আগ্রহ ক্রমবর্ধমান। সেই আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে সরকারি সহযোগিতায় স্বল্প পরিসরের কিছু কোর্স চালু করা এখন সময়ের দাবি, যেগুলো হতে পারে পাইথন, মেশিন লার্নিং, কম্পিউটার ভিশন, ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (এনএলপি) এবং জেনারেটিভ এআইয়ের (জেনএআই) মতো বিষয়ের উপর। আশার কথা হলো, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই উপলব্ধি ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে তাঁর প্রথম বিশেষ বক্তৃতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দক্ষতার গুরুত্বের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, আর ৩১ দফার ৩০তম দফায় তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ করে তোলার যে অঙ্গীকার রয়েছে, সেটিই এই রূপান্তরের চাবিকাঠি। আমি মনে করি এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো সেই অঙ্গীকারকে পাঠক্রম, তহবিল ও প্রশিক্ষণের একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়া।

স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আশির দশকেই অনুধাবন করেছিলেন যে, দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া কোনো জাতির প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাঁর সেই দূরদৃষ্টি ও পরিকল্পনার ফলেই হাজার হাজার বাংলাদেশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছিলেন, এবং সেই ধারাবাহিকতা আজও আমাদের অর্থনীতিকে ধরে রেখেছে। আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে সেই একই যুক্তি সমানভাবে প্রযোজ্য, কেবল দক্ষতার ধরনটি বদলে গেছে। সেদিন প্রয়োজন ছিল কায়িক ও কারিগরি দক্ষতার, আর আজ প্রয়োজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জ্ঞানভিত্তিক দক্ষতার।

বিএনপি মানেই বাংলাদেশের মা, মাটি, মানুষের সাথে সম্পর্কিত একটি অত্যাধুনিক রাজনৈতিক সংগঠন, আর মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রত্যয়ী তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফার রূপকল্প কোনো অলীক স্বপ্ন নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত রোডম্যাপ। আমাদের তরুণ প্রজন্মের হাতে যদি উপরে আলোচিত এই চারটি স্তরের ভিত্তি সঠিকভাবে তুলে দেওয়া যায়, তাহলে তারা কেবল চাকরির প্রার্থী হয়ে থাকবে না, বরং তারা হয়ে উঠবে আধুনিক প্রযুক্তির নির্মাতা এবং কর্মসংস্থানের সৃষ্টিকর্তা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঠিক জ্ঞান, রাষ্ট্রের সদিচ্ছা এবং আমাদের তরুণ প্রজন্মের অদম্য মেধা, এই তিনে মিলে আমরা গড়ে তুলব একটি স্বনির্ভর, টেকসই ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, যা অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। ভবিষ্যতে এই বিষয়ের আরও গভীর দিক নিয়ে আলোচনা করবো বলে আশা রাখছি। ধন্যবাদ সবাইকে।

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  ড. শাহ জে মিয়া   কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা   এআই শিক্ষা   তরুণ প্রজন্ম   এআই দক্ষতা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close