মাওলিদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (সা.) উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশ, মানুষকে খাবার খাওয়ানো, মিষ্টান্ন বিতরণ, দান-সদকা করা ও দরিদ্র-অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এসব কাজের মধ্যে কল্যাণ ও মানবিকতার দিক রয়েছে। বিশেষ করে এসব আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু যদি হয় আল্লাহর শুকরিয়া, রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতি ভালোবাসা ও মানুষের কল্যাণ, তাহলে তা একটি সুন্দর সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হতে পারে।
আনন্দ প্রকাশে আপত্তি কেন :
প্রশ্ন হলো নবীজির জন্ম ও আগমনকে স্মরণ করে আনন্দ প্রকাশের মধ্যে এত বিরোধিতা কেন? আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমতের কারণেই তারা আনন্দিত হোক। তারা যা সঞ্চয় করে, এটি তার চেয়ে উত্তম।’ (সূরা ইউনুস: ৫৮)। তিনি আরও বলেন, ‘আর তোমার প্রতিপালকের নিয়ামতের কথা প্রকাশ করো।’ (সূরা আদ-দুহা: ১১)। আর রাসূলুল্লাহ (সা.) যে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য রহমত ও হেদায়াতের বাহক—এটি কুরআনেরই ঘোষণা ‘আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭)।
অতএব মাওলিদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশ, মানুষকে খাওয়ানো, মিষ্টান্ন বিতরণ, দান-সদকা, দরুদ পাঠ ও সিরাত আলোচনা—এসবের ইতিবাচক দিককে সামনে আনা প্রয়োজন। আনন্দ প্রকাশের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা থাকতে পারে, কিন্তু আল্লাহর ফযল ও রহমতে আনন্দ প্রকাশের সাধারণ নীতিকে অস্বীকার করারও সুযোগ নেই।
সমগ্র মানবজাতির রাসূল :
তিনি শুধু কোনো একটি জাতি, গোষ্ঠী বা ভূখণ্ডের রাসূল নন; সমগ্র মানবজাতির রাসূল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, হে মানুষ! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল।’ (সূরা আল-আ'রাফ: ১৫৮)। তিনি আপনারও রাসূল, আমারও রাসূল। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।
তাহলে তাঁর জন্ম ও আগমনকে স্মরণ করে আনন্দ প্রকাশ করলেই এত বিরোধিতা কেন? কোনো আয়োজনের পদ্ধতি নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে—কেউ কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারেন, কেউ নাও করতে পারেন—কিন্তু নবীপ্রেমের অনুভূতিকে অপমান, গালি কিংবা বিদ্বেষের বিষয় বানিয়ে ফেলা কি যুক্তিসঙ্গত?
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহকে (সা.) সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘এ দিনেই আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনেই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।’ এটি মাওলিদুন্নবীর বর্তমান আয়োজনের সরাসরি বিধান নয়; কিন্তু এটি অন্তত দেখায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই তাঁর জন্মের দিনের কথা স্মরণ করেছেন এবং সেই দিনের সঙ্গে একটি ইবাদতকে সম্পর্কিত করেছেন। তাই তাঁর জন্মের কথা স্মরণ করাকে একেবারে অর্থহীন বা স্বভাবতই নিন্দনীয় বিষয় হিসেবে দেখার আগে বিষয়টি গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন।
নবীপ্রেম মানে আত্মত্যাগ :
নবীপ্রেম শুধু মুখের স্লোগান নয়; এটি আত্মত্যাগ, আনুগত্য, আদব ও সুন্নাহ অনুসরণের নাম। হযরত উমরের (রা.) বিখ্যাত ঘটনাটি এখানে বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি একসময় বলেছিলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর কাছে নিজের প্রাণ ছাড়া সবকিছুর চেয়ে অধিক প্রিয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বুঝিয়ে দেন যে নিজের প্রাণের চেয়েও তাঁকে অধিক প্রিয় করতে হবে। তখন হযরত উমর (রা.) স্বীকার করেন—এখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর নিজের প্রাণের চেয়েও অধিক প্রিয়। অর্থাৎ প্রকৃত প্রশ্ন হলো—আমি রাসূলুল্লাহকে (সা.) কতটা ভালোবাসি এবং তাঁর আদর্শের জন্য কতটা নিজের স্বার্থ ত্যাগ করতে প্রস্তুত?
সাহাবায়ে কেরামের জীবন নবীপ্রেমের সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা.) ভালোবাসাকে শুধু অনুষ্ঠান, স্লোগান কিংবা বাহ্যিক প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে রক্ত দিয়েছেন, কেউ পরিবার-পরিজন ছেড়ে হিজরত করেছেন, কেউ সম্পদ বিসর্জন দিয়েছেন, কেউ অসহনীয় কষ্ট সহ্য করেছেন। তাঁদের কাছে নবীপ্রেম ছিল আত্মত্যাগের নাম। তাই আজ আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা প্রয়োজন—আমরা নবীপ্রেমের নামে কী করছি, আর নবীপ্রেমের জন্য কী ত্যাগ করছি?
জুলুস : সরলতা, নাকি প্রদর্শন?
বর্তমানে মাওলিদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে জুলুস বা শোভাযাত্রা একটি জনপ্রিয় সামাজিক-ধর্মীয় আয়োজন। এর ইতিবাচক দিক অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মানুষ সম্মিলিতভাবে দরুদ পড়ে, নবীজির শানে নাত ও আলোচনা করে, সিরাত স্মরণ করে এবং ভালোবাসার প্রকাশ ঘটায়। তবে জুলুস যদি নবীপ্রেমের প্রকাশ হয়, তাহলে সেই জুলুসের প্রতিটি আচরণেও বিনয়, শৃঙ্খলা, সৌন্দর্য ও সুন্নাহর আদব প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
যেখানে শত শত মানুষ দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে নবীপ্রেমের স্লোগান দিচ্ছেন, সেখানে কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি যদি বিশেষ গাড়িবহর, নিরাপত্তা-বেষ্টনী কিংবা অতিরিক্ত ভিআইপি ব্যবস্থার মধ্যে অবস্থান করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এটি কি নবীপ্রেমের সরলতা, নাকি ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রদর্শনের সংস্কৃতি? এই প্রশ্ন কোনো ব্যক্তিকে অপমান করার জন্য নয়; বরং আমাদের সংস্কৃতির আত্মসমালোচনার জন্য।
রাসূলুল্লাহর (সা.) সাক্ষাতের জন্য সাহাবায়ে কেরাম বহু কষ্ট স্বীকার করেছেন। রৌদ্র, বৃষ্টি, পথের ক্লান্তি—কোনোটিই তাঁদের ভালোবাসাকে থামাতে পারেনি। তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা.) সান্নিধ্যকে আরাম-আয়েশ দিয়ে পরিমাপ করেননি। তাহলে আজ আমরা যদি নবীপ্রেমের একটি আয়োজন করি, সেখানে সামান্য পথ পায়ে হাঁটাকে কেন এত কঠিন মনে হবে?
তবে এটিও সত্য যে পায়ে হাঁটলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সত্যিকারের আশেক হয়ে যায় না; আবার গাড়িতে থাকলেই কেউ নবীপ্রেমহীন হয়ে যায় না। কারও বয়স, অসুস্থতা, দায়িত্ব, নিরাপত্তা কিংবা বাস্তব প্রয়োজন থাকতে পারে। তাই বাহ্যিক অবস্থান দেখে কারও ঈমান বা ভালোবাসার চূড়ান্ত বিচার করা উচিত নয়। কিন্তু কোনো সুস্থ-সক্ষম ব্যক্তি যদি শুধু নিজের মর্যাদা, আরাম, প্রভাব বা ভিআইপি পরিচয় প্রদর্শনের জন্য সাধারণ মানুষের কষ্টকে পাশ কাটিয়ে বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করেন, তাহলে সেটি নবীপ্রেমের চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও প্রদর্শনবাদ হিসেবে প্রশ্নের মুখে পড়তেই পারে। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি ভালোবাসা, বিনয় ও সম্মানের সঙ্গে মানুষের কাতারে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেন, তাঁর এই আচরণকে নবীপ্রেমের বিনয়ী ও আত্মত্যাগী প্রকাশ বলা যেতে পারে। তাই কাউকে "নকল আশেক" আখ্যা দেওয়ার চেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমাদের জুলুসে নবীজির আদর্শ কতটুকু আছে?
সংস্কারের প্রস্তাব :
মাওলিদুন্নবীর জুলুসকে আরও সুন্দর ও নবীপ্রেমের প্রকৃত চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে কিছু বিষয়ে আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। যেমন ভিআইপি সংস্কৃতির পরিবর্তে নেতৃত্বের ব্যক্তিদেরও যথাসম্ভব সাধারণ মানুষের সঙ্গে একই কাতারে থাকার সংস্কৃতি তৈরি করা দরকার; অপ্রয়োজনীয় গাড়িবহর ও ব্যক্তিগত প্রদর্শন কমিয়ে শৃঙ্খলিত পদযাত্রাকে উৎসাহিত করা যেতে পারে; জুলুসের সৌন্দর্য যেন শুধু ব্যানার, পোস্টার, গাড়ি ও সাউন্ড সিস্টেমে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং দরুদ, সিরাত, নৈতিকতা ও মানবসেবাকে কেন্দ্রীয় বিষয় করা প্রয়োজন; জুলুস শেষে দরিদ্র মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা সহায়তা কিংবা অন্যান্য মানবিক কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে; রাস্তা বন্ধ করে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি না করা এবং আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানোও নবীপ্রেমেরই অংশ।
প্রতিযোগিতা যদি করতেই হয়, তাহলে ‘কে কত বড়’ প্রদর্শনের পরিবর্তে ‘কে কত বেশি দরুদ, দান ও মানবসেবা করতে পারে’—এই প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত।
মতভেদ থাকুক, বিদ্বেষ নয় :
মাওলিদুন্নবীর পদ্ধতি, সময় ও আয়োজনের শরিয়তগত অবস্থান নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই ভিন্নমত পোষণকারী প্রত্যেক মুসলমানকে নবী-বিদ্বেষী বলা যেমন অন্যায়, তেমনি মাওলিদে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক মুসলমানকে বিদআতী বা পথভ্রষ্ট বলে আক্রমণ করাও অনুচিত। তবে একটি বিষয় সর্বজনস্বীকৃত—রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে রাসূলুল্লাহকে (সা.) ভালোবাসেন, তাঁর ভালোবাসা মানুষের প্রতি ঘৃণা, গালাগালি, বিদ্বেষ ও বিভাজনের কারণ হওয়া উচিত নয়। কেউ যদি মাওলিদ পালন না করেন, তিনি তাঁর দলিল ও মত অনুসরণ করতে পারেন; কিন্তু যারা এটি পালন করেন, তাঁদের প্রতি অশালীনতা, বিদ্বেষ কিংবা সামাজিক সংঘাত সৃষ্টি করাও কাম্য নয়। একইভাবে যারা মাওলিদ পালন করেন, তাঁদেরও মনে রাখতে হবে—মাওলিদুন্নবীর সবচেয়ে বড় দাবি হলো রাসূলুল্লাহর (সা.) চরিত্রকে জীবনে ধারণ করা।
যাকাত-মসজিদ-মাদরাসা প্রসঙ্গ : একটি সমান্তরাল প্রশ্ন
কুরআনে আল্লাহ যাকাতের খাত নির্ধারণ করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সদকাসমূহ ফকির, মিসকিন...’ (সূরা আত-তাওবা: ৬০)। এই আয়াতে সরাসরি ‘মসজিদ’ বা ‘মাদরাসা’ শব্দ উল্লেখ নেই। তবে মসজিদ-মাদ্রাসার অর্থসংগ্রহ, শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন, শিক্ষা কার্যক্রম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যয় নিয়ে ইসলামী ফিকহে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। সাধারণ দান, সদকা, ওয়াকফ ও যাকাতকে এক করে দেখা যাবে না; যাকাতের অর্থ কোথায় ব্যয় করা যাবে—এ বিষয়ে আলেমদের ফিকহি ব্যাখ্যাও রয়েছে।
তবু এখানে একটি বিষয় ভাবার আছে—আজ আমরা মসজিদ-মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগ করি, বেতন দিই, বই ছাপি, মাইক ব্যবহার করি, অনলাইনে কুরআন শিক্ষা দিই; এসবের বর্তমান কাঠামো রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগের হুবহু কাঠামো ছিল না। অতএব কোনো বিষয় শুধু ‘আগে ছিল না’—এই একটি যুক্তিতে শেষ করে দেওয়া যথেষ্ট নয়; বরং দেখতে হবে তার উদ্দেশ্য কী, প্রকৃতি কী এবং শরিয়তের কোনো মৌলিক নির্দেশের সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক কি না।
কিয়ামতের ময়দানে একটি প্রশ্ন :
একবার কিয়ামতের ময়দানের কথা ভাবুন। এটি কোনো শরিয়তি দলিল নয়; বরং আত্মজিজ্ঞাসার একটি চিত্র মাত্র। কিয়ামতের দিন আমরা রাসূলুল্লাহর (সা.) সামনে দাঁড়ালাম। তিনি যদি প্রশ্ন করেন, ‘আমি তোমার রাসূল ছিলাম। আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা কোথায় ছিল?’—আমরা কী উত্তর দেব? যদি প্রশ্ন করেন, ‘আমার জন্মের কথা স্মরণ করে কেউ আনন্দ করেছিল; তুমি কেন তাকে অপমান করেছিলে?’—আমরা কী বলব? যদি প্রশ্ন করেন, ‘আমার নামে দরুদ পড়ে কেউ দাঁড়িয়ে গিয়েছিল; তুমি কেন তাকে গালমন্দ করেছিলে?’—আমাদের উত্তর কী হবে?
আবার মিলাদ পালনকারী ব্যক্তিকেও প্রশ্ন করা হতে পারে—‘তুমি আমার জন্মের আনন্দ করেছিলে; কিন্তু আমার সুন্নাহ তোমার জীবনে কতটুকু ছিল?’ তখনও আমাদের জবাব দিতে হবে। সুতরাং আসল প্রশ্ন শুধু—মিলাদ করেছি কি করিনি? আসল প্রশ্ন—আমরা মুহাম্মদের (সা.) উম্মত হিসেবে কেমন মানুষ হয়েছি?
রাসূলুল্লাহর (সা.) নাম শুনে দাঁড়িয়ে দরুদ পড়া নিয়েও আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ এটিকে সম্মানের প্রকাশ হিসেবে গ্রহণ করেন, কেউ এটিকে নির্দিষ্ট সুন্নাহ মনে করেন না। কিন্তু যে দাঁড়াল তাকে গালি দেওয়া যেমন উচিত নয়, তেমনি যে দাঁড়াল না তাকে নবীপ্রেমহীন বলাও উচিত নয়। নবীপ্রেমের আসল পরীক্ষা হলো—আমরা তাঁর কথা মানি কি না, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করি কি না, মানুষের প্রতি দয়া করি কি না, অহংকার ত্যাগ করি কি না এবং অন্যের হক আদায় করি কি না। আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।’ (সূরা আলে ইমরান: ৩১)। অর্থাৎ ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো অনুসরণ।
মাওলিদুন্নবীর আনন্দ থাকুক। মানুষকে খাওয়ানো হোক। মিষ্টান্ন বিতরণ হোক। দান-সদকা হোক। দরুদ-সালাম হোক। সিরাত আলোচনা হোক। জুলুস হোক—শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যের সঙ্গে। কিন্তু তার সঙ্গে থাকুক মানুষের প্রতি ভালোবাসা, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, দরিদ্রের মুখে হাসি ফোটানো এবং রাসূলুল্লাহর (সা.) সুন্নাহ অনুসরণের অঙ্গীকার।
গাড়ি থাকতেই পারে, প্রয়োজন থাকতেই পারে; কিন্তু গাড়ি যেন মর্যাদার প্রতীক না হয়। জুলুসে নেতৃত্ব থাকুক; কিন্তু নেতৃত্ব যেন সাধারণ মানুষের কাতার থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়। ব্যানার থাকুক; কিন্তু ব্যানারের চেয়ে নবীজির আদর্শ বড় হোক। স্লোগান থাকুক; কিন্তু স্লোগানের চেয়ে চরিত্রের ভাষা শক্তিশালী হোক। আর আনন্দ থাকুক—কারণ আল্লাহর ফযল ও রহমতে আনন্দ করা মানুষের স্বাভাবিক ধর্মীয় অনুভূতি। কিন্তু সেই আনন্দ যেন আমাদেরকে রাসূলুল্লাহর (সা.) সরলতা, বিনয়, দয়া, আত্মত্যাগ ও মানবপ্রেম থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়।
মাওলিদুন্নবীর প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পাবে, যখন আমাদের মুখে থাকবে দরুদ, হাতে থাকবে দান, হৃদয়ে থাকবে ভালোবাসা, আচরণে থাকবে সুন্নাহ এবং জীবনে থাকবে রাসূলুল্লাহর (সা.) আদর্শ। কারণ নবীপ্রেম শুধু একটি দিনের অনুষ্ঠান নয়; নবীপ্রেম একটি জীবনব্যাপী অঙ্গীকার।
কেকে/এমএ