বাংলাদেশ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘মক্কা চুক্তি’তে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তবে এমন কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হলে প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে হুমায়ুন কবির বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে যদি কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তাহলে বাংলাদেশেরও তাতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়। বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের নেতৃত্ব, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এতে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।”
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রও জানিয়েছে, সৌদি আরব ঢাকাকে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে কখন এ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, সে বিষয়ে সূত্রটি বিস্তারিত জানায়নি।
চলতি মাসে সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান চুক্তিটি স্বাক্ষর করে। ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আদলে তৈরি এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
আঞ্চলিক উত্তেজনা ও মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে চুক্তিটি করা হয়েছে। তুরস্ক জানিয়েছে, ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর জন্যও এই জোটে যোগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরীক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, কোনো সামরিক জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির ওপর বড় ধরনের পরীক্ষা আসতে পারে। এতদিন প্রতিদ্বন্দ্বী ভূরাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রেখে বিনিয়োগ, রপ্তানি ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করেছে ঢাকা।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়া মনে করেন, সামরিক জোটে যোগ দিলে ভারতের পাশাপাশি চীন, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, “এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক সরাসরি নষ্ট হয়ে যাবে এমন নয়। তবে বাংলাদেশ কোনো একটি সামরিক জোটে যুক্ত হলে দেশটি কোন পক্ষের সঙ্গে অবস্থান করছে—এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।”
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন সমীকরণ
মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের আলোচনা এমন সময়ে সামনে এলো, যখন ভারতের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কও সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ চললেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন রয়েছে। শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়টিও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ঢাকার প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিষয়ে নয়াদিল্লির অবস্থানের দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ।
বিশ্লেষকদের ধারণা, পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করা কোনো নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশের যোগদানকে ভারত স্বাভাবিকভাবে নাও নিতে পারে। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু ভারতের প্রতিক্রিয়া নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়নের অধ্যাপক আসিফ শাহান বলেন, “বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দিলে ভারতসহ কয়েকটি দেশ অসন্তুষ্ট হতে পারে। তবে শুধু অন্য দেশের অসন্তুষ্টির আশঙ্কাকে সিদ্ধান্তের প্রধান ভিত্তি করা উচিত নয়।”
সূত্র: রয়টার্স
কেকে/সাশ