মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন, পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রকৌশলীদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করার দাবি জানিয়েছেন দেশের প্রকৌশলীরা। তারা বলেছেন, ‘মেধার পরিবর্তে জনতার চাপ ও প্রভাবনির্ভর ‘মবোক্রেসি’ কোনোভাবেই বাড়তে দেওয়া যাবে না। যোগ্যতা, দক্ষতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে প্রকৌশলীদের পদায়ন ও দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ বাড়াতে হবে।’
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) মিলনায়তনে ‘প্রকৌশলী অধিকার দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় প্রকৌশলী সম্মেলন-২০২৬-এ বক্তারা এসব কথা বলেন।
আইইবির সার্বিক সহযোগিতায় প্রকৌশলী সমাজের অধিকার, মর্যাদা, পেশাগত স্বাধীনতা ও ন্যায়সংগত দাবি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনে প্রকৌশলীরা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের সক্ষমতার বড় প্রমাণ হলো তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণে দেশীয় প্রকৌশলীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এটি প্রমাণ করে যে আমাদের প্রকৌশলীরা বড় ও জটিল জাতীয় প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষম। তাই তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে। মেধার যথাযথ মূল্যায়ন, প্রকৌশলীদের সুযোগ বৃদ্ধি এবং গবেষণাভিত্তিক উন্নয়ন- এই তিনটির সমন্বয়েই বাংলাদেশকে টেকসইভাবে উন্নতির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব ‘
সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মো. রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ ব্যক্তিদের উচ্চপর্যায়ে কাজ করার সুযোগ পাওয়াই একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, যারা বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করছেন, তাদের মেধা, যোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। একই সঙ্গে প্রকৌশলীদের চাকরির সুযোগও দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। এ অবস্থা পরিবর্তন করা জরুরি। একটি দেশকে উন্নত করতে হলে সেই দেশের প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের গুরুত্ব বাড়াতে হবে। চীন এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।’
‘একটি উন্নয়নশীল দেশ থেকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার পেছনে চীনের প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও গবেষণায় তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশকেও এগিয়ে নিতে হলে মেরিটোক্রেসি বা মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। মেধার পরিবর্তে মবোক্রেসি বা জনতার চাপ ও প্রভাবনির্ভর ব্যবস্থা বাড়তে দেওয়া যাবে না। যোগ্যতা, দক্ষতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে প্রকৌশলীদের যথাযথ পদ ও দায়িত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের সক্ষমতার বড় প্রমাণ হলো তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণে দেশীয় প্রকৌশলীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এটি প্রমাণ করে যে আমাদের প্রকৌশলীরা বড় ও জটিল জাতীয় প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষম। তাই তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে। বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে প্রকৌশলীদের মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি সেক্টরে গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ বাড়াতে হবে। মেধার যথাযথ মূল্যায়ন, প্রকৌশলীদের সুযোগ বৃদ্ধি এবং গবেষণাভিত্তিক উন্নয়ন-এই তিনটির সমন্বয়েই বাংলাদেশকে টেকসইভাবে উন্নতির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এ্যাবের আহ্বায়ক প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম তুহিন বলেন, ‘প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলন যারা গড়ে তুলেছেন এবং এই আন্দোলনের সঙ্গে যারা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। প্রকৌশলীদের ন্যায্য অধিকার, পেশাগত মর্যাদা ও বৈষম্য দূরীকরণের দাবিতে পরিচালিত এই আন্দোলনের সঙ্গে আমরা সম্পূর্ণভাবে একমত ও সহমত প্রকাশ করছি। বর্তমান বিশ্বে একটি দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে প্রকৌশলীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রকৌশলীদের মেধা, দক্ষতা ও পেশাগত যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। ফলে এসব দেশ দ্রুত শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির তেমন উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সমস্যা সমাধানে আমাদের সম্মিলিতভাবে বসে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই সমাধান বের করতে হবে। শুধু সমস্যা নিয়ে আলোচনা নয়, সমস্যার কারণ নির্ণয়, সম্ভাব্য সমাধান এবং বাস্তবায়নের জন্য সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে বিসিএস পরীক্ষায় প্রকৌশলীদের জন্য নির্ধারিত পদ দিন দিন কমে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশের প্রশাসন ও উন্নয়ন ব্যবস্থায় প্রকৌশলীদের দক্ষতা ও জ্ঞানকে কাজে লাগাতে বিসিএসে প্রকৌশলীদের উপযুক্ত পদ ও সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমন্বিত ও বাস্তবমুখী উন্নয়ন ভাবনা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের সমস্যা চিহ্নিত করে সম্মিলিত উদ্যোগে সমাধানের পথ বের করতে হবে। প্রকৌশলীদের মেধা, দক্ষতা ও নেতৃত্বকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে উন্নত, স্বনির্ভর ও প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’
সভাপতির বক্তব্যে প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও আইইবির প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম রিজু বলেন, ‘প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আজকের এই জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। গত এক বছরে প্রকৌশলীদের অধিকার আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি ও দাবি উত্থাপন করা হলেও প্রকৌশলী সমাজের প্রত্যাশিত অধিকার ও মর্যাদা এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই এই সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকৌশলীদের ন্যায্য অধিকার, পেশাগত মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।’
‘বর্তমান বিশ্ব শুধু প্রযুক্তির যুগে নেই, আমরা এখন উন্নত ও উচ্চপ্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছি। বিশেষ করে বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন, রোবটিক্স, বিগ ডাটা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ঘটছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকেও এসব প্রযুক্তি গ্রহণ ও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। তা না হলে একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা কঠিন হবে। দেশে বর্তমানে যেসব বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে, সেগুলোতে মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রকল্প পরিকল্পনা, নকশা, বাস্তবায়ন ও তদারকির প্রতিটি পর্যায়ে যোগ্য প্রকৌশলীদের সম্পৃক্ত করা হলে প্রকল্পের মান, সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, দেশের মেধাবী প্রকৌশলীরা যখন যথাযথ মূল্যায়ন, কর্মসংস্থান ও পেশাগত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, তখন তারা উন্নত সুযোগের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমান। এর ফলে বাংলাদেশ মেধা পাচারের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এই মেধা পাচার বন্ধ করতে হলে দেশে প্রকৌশলীদের জন্য যোগ্যতা ও মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থান, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।’
সম্মেলননে মূল প্রবন্ধে প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের সভাপতি প্রকৌশলী এম ওয়ালি উল্লাহ বলেন, ‘এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৌশলীদের পেশাগত অধিকার, মর্যাদা ও বৈষম্য দূরীকরণ। বাংলাদেশে সহকারী প্রকৌশলী পদে ৬৭ শতাংশ নিয়োগের বিধান থাকলেও বাস্তবে মাত্র ৩৩ শতাংশ নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। বাকি পদগুলো পদোন্নতি কিংবা অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে পূরণ করা হচ্ছে। এর ফলে মেধাবী ও যোগ্য প্রকৌশলীরা তাদের ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আরও উদ্বেগের বিষয় হলো একজন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার ১০ম গ্রেডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে আবেদন করার সুযোগ পাচ্ছেন না, অথচ অন্যান্য পদে আবেদন করতে পারছেন। এমন বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা প্রকৌশলীদের পেশাগত অধিকার ও মর্যাদার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। একই সঙ্গে বিসিএস পরীক্ষায় প্রকৌশলীদের জন্য নির্ধারিত পদ দিন দিন কমে যাচ্ছে, যা প্রকৌশলী সমাজের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। তাই প্রকৌশলীদের প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করে মেধা, যোগ্যতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি। দেশের উন্নয়নে প্রকৌশলীদের যথাযথ ভূমিকা নিশ্চিত করতে একটি বৈষম্যহীন ও মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।’
সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন আইইবির ভাইস-প্রেসিডেন্ট (একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক) প্রকৌশলী খান মনজুর মোরশেদ, ভাইস-প্রেসিডেন্ট (প্রশাসন ও অর্থ) প্রকৌশলী এটিএম. তানবীর-উল হাসান তমাল, সম্মানী সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান, আইইবি ঢাকা কেন্দ্রের সম্মানী সম্পাদক প্রকৌশলী কেএম. আসাদুজ্জামান, আইইবির ভাইস-চেয়ারম্যান (একাডেমিক ও এইচআরডি) প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন, কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য প্রকৌশলী রবিউল আলম উজ্জ্বল, চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. আরাফাত রহমান রানা, বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন, প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের মুখ্য সংগঠক প্রকৌশলী সাকিবুল হক লিপু।
সম্মেলন সঞ্চালনা করেন আইইবি সম্মানী সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) প্রকৌশলী মুহাম্মদ আহসানুল রাসেল।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আইইবির ভাইস-প্রেসিডেন্ট (এইচআরডি) প্রকৌশলী শেখ আল আমিন, ভাইস-প্রেসিডেন্ট (এসঅ্যান্ডব্লিউ) প্রকৌশলী নিয়াজ উদ্দিন ভূঁইয়া, সম্মানী সহকারী সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী সাব্বির আহমেদ ওসমানী, সম্মানী সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এইচআরডি) প্রকৌশলী নূর আমিন লালন, আইইবির ঢাকা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন তালুকদার প্রমুখ।
কেকে/এমএ