দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি কোনোভাবেই হচ্ছে না। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সহিংসতার মতো অপরাধ ঘটছে। এতে জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ও নেওয়া পদক্ষেপ নিয়েও। বিশেষ করে রাজধানীতে ছিনতাই এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
একাধিক বড় ঘটনার পরও ছিনতাই বন্ধ হচ্ছে না। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় ছিনতাইকারীর হেঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে এক নারী নিহত হয়েছেন। তিনি বগুড়ার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। এ ধরনের ঘটনায় রাজধানীতে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়ছে। প্রতিনিয়ত আতঙ্ক নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে নগরবাসীকে।
রাজধানীতে বিশেষ করে মধ্যরাত ও ভোরে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা টাকা-পয়সা, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী হারাচ্ছেন। বড় ধরনের ঘটনায় থানায় মামলা হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন বা টাকা-পয়সা হারানোর ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থা না থাকা অন্যতম কারণ। অনেক ঘটনায় অপরাধীরা গ্রেপ্তার হলেও বিচার ও শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছে না। নানা প্রক্রিয়ায় তারা দ্রুত জামিনে বের হয়ে আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি সামাজিকভাবেও প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে।
ছিনতাইকারীর হেঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে শিক্ষিকার মৃত্যু :
ছিনতাইকারীর হেঁচকা টানে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় শনিবার সকালে রিকশা থেকে পড়ে নিহত হয়েছেন রনজিনা পারভীন (৫৫)। তিনি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা।
পুলিশ জানায়, ফার্মগেট এলাকার ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসক দেখাতে শুক্রবার রাতে বগুড়া থেকে ঢাকায় আসেন রনজিনা পারভীন। ভোরে গাবতলী বাস টার্মিনালে নেমে রিকশায় করে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন তিনি।
পথে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে করে আসা ছিনতাইকারীরা রিকশার পেছন থেকে তার ব্যাগ ধরে টান দেয়। এতে রিকশা থেকে সড়কে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান রনজিনা। পরে তাকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং তাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধারে কাজ চলছে।
মেডিকেল সার্ভিস অফিসার সোহেলির মৃত্যু :
গত ৭ জুন একইভাবে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে প্রাণ হারান এসকেএফ ওষুধ কোম্পানির মেডিকেল সার্ভিস অফিসার সোহেলি ইসলামের (৪২)।
পারিবারিক এক অনুষ্ঠান শেষে মেয়েকে নিয়ে দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন সোহেলি। ভোরে গাবতলী বাস টার্মিনালে নেমে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডের বাসায় যাচ্ছিলেন তিনি।
পথে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে মোটরসাইকেলে করে আসা দুই ছিনতাইকারী তার হাতে প্যাঁচানো ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে টান দেয়। এতে চলন্ত অটোরিকশা থেকে রাস্তায় পড়ে মাথার পেছনে গুরুতর আঘাত পান তিনি। একইসঙ্গে তার ডান হাতও ভেঙে যায়।
স্থানীয়দের সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়ে মাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে চার দিন একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ১১ জুন ভোরে মারা যান সোহেলি ইসলাম।
সড়কে ছিটকে পড়ে নিহত হন গৃহিণী মুক্তা :
চলতি বছরের ১৯ মার্চ উত্তরায় মেট্রো স্টেশনের কাছে ছিনতাইকারীর হেঁচকা টানে সড়কে ছিটকে পড়ে নিহত হন গৃহিণী মুক্তা আক্তার (২১)। ঈদের কেনাকাটা করতে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। অটোরিকশায় যাওয়ার সময় প্রাইভেটকারে করে আসা ছিনতাইকারীরা তার হাতে থাকা ব্যাগ ধরে টান দেয়। এতে অটোরিকশা থেকে পড়ে মাথায় আঘাত পান মুক্তা। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই দিনই তার মৃত্যু হয়।
রাজধানীতে সক্রিয় ১,৩৮৭ ছিনতাইকারী :
ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে বর্তমানে ১ হাজার ৩৮৭ ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিনতাইকারী রয়েছে ওয়ারী বিভাগে, ৩০৮ জন। সবচেয়ে কম মিরপুর বিভাগে, ৫৩ জন।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে রমনা বিভাগে ১৫২, লালবাগে ১৫৯, মতিঝিলে ১৬৮, তেজগাঁওয়ে ২৪০, গুলশানে ৬৭ এবং উত্তরা বিভাগে ২৪০ জন ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। এসব ছিনতাইকারীর ৮০ শতাংশই একাধিক মামলার আসামি বলে জানা গেছে।
ওয়ারী বিভাগে ছিনতাই ও ছিনতাইকারী বাড়ার বিষয়ে উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী বলেন, ওয়ারী বিভাগের আওতায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ডেমরা এক্সপ্রেসওয়ের একটি অংশ রয়েছে। মহাসড়কে যানজট হলে ছিনতাইকারীরা গাড়ির জানালা দিয়ে যাত্রীদের মোবাইল ফোন টেনে নেয়। আবার ঢাকার বাইরে থেকে আসা অনেক যাত্রী ভোরবেলা রাজধানীতে নামেন। তখনও তারা ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন।
তিনি বলেন, এসব ঘটনায় পুলিশ চাইলেও রাস্তার মাঝখানে টহল দিতে পারে না। এ ছাড়া ওই এলাকায় ভাসমান মানুষের বসবাসও বেশি। তবে ছিনতাই প্রতিরোধে টহল ও ব্লকেড জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি সাদা পোশাকে গ্রেপ্তার অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে।
ছিনতাইয়ে বাড়ছে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার :
অতীতে দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ছিনতাই করা হলেও বর্তমানে এ ধরনের অপরাধে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারও দেখা যাচ্ছে। এতে ছিনতাইয়ের সময় ভুক্তভোগীদের জীবন আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
গত ৭ জুন বিকেলে মতিঝিলের শাপলা চত্বর এলাকায় লোকমান (৪৫) নামে এক মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীকে গুলি করে তার সঙ্গে থাকা ১৭ হাজার ডলার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ছিনতাইকারীরা ওই ব্যবসায়ীর পায়ে ও হাতে তিনটি গুলি করে।
মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে :
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, রাজধানী ঢাকায় চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মামলা গ্রহণ ও অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, এর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার গৃহীত পদক্ষেপের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির একটি বড় ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা অপরাধীরা কাজে লাগাচ্ছে।
ড. তৌহিদুল হক আরও বলেন, এসব অপরাধে এখন পেশাদার অপরাধী চক্র সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছে। অনেক অপরাধী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তাদের হাতে দেশীয় ও প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকে এবং তাদের একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত। ছিনতাইয়ের সময় তারা শুধু সম্পদ লুটেই ক্ষান্ত হয় না, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে হত্যা বা গুরুতর আহতও করে।
তার মতে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিচারব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে বাস্তবতাভিত্তিক সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে ছিনতাইকারী ও চোর চক্রের মূল হোতা, পৃষ্ঠপোষক এবং সংগঠিত গ্যাংগুলোর নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় শুধু মাঠপর্যায়ের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে ছিনতাই নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন নগরবাসীর :
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাস টার্মিনাল, হাসপাতাল এলাকা ও ভোররাতের নির্জন সড়কগুলোতে ছিনতাইয়ের ঘটনা নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে চিকিৎসা, চাকরি কিংবা জরুরি প্রয়োজনে ভোরে রাজধানীতে আসা মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন।
একদিকে সক্রিয় ছিনতাইকারীর বড় একটি তালিকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে রয়েছে, অন্যদিকে একই চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার তথ্যও রয়েছে। তারপরও তাদের অনেকেই বারবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, শুধু ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার করাই কি যথেষ্ট? নাকি তাদের পেছনে থাকা মূল হোতা, পৃষ্ঠপোষক ও সংগঠিত চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনাই এখন সবচেয়ে জরুরি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ছিনতাই প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি, দৃশ্যমান পুলিশি টহল, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি অপরাধীদের পুনর্বাসন ও মাদকনির্ভর অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় ছিনতাইয়ের আতঙ্ক আরও বিস্তৃত হবে, আর নগরবাসীর অনিরাপদ জীবন আরও দীর্ঘ হবে।
কেকে/ এমএস